পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে গণধর্ষণ, বিলকিস বানো মামলার নেপথ্যে যে ভয়াবহ ইতিহাস

Bilkis Bano Case: বিলকিস তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সেই অবস্থায় ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় কাস্তে, তলোয়ার, লাঠি নিয়ে ২০-৩০ জনের দল তাঁদের উপর চড়াও হয়। গণধর্ষণের শিকার হন বিলকিস।

সম্প্রতি বিলকিস বানো গণধর্ষণ কাণ্ড আরও একবার আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। গণধর্ষণকাণ্ডে ধৃত এগারোজন অপরাধীকে ২০২২ সালে মুক্তি দেয় গুজরাট সরকার। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট একে বেআইনি সিদ্ধান্ত বলে ঘোষণা করেছে। কী হয়েছিল ২০০২ সালে? কোন ঘটনার ভিত্তিতে সাজা হয়েছিল দোষীদের? আসুন, আরেকবার দেখে নেওয়া যাক─

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০২: গোধরা ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়ার পরের দিনই সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয়। বিলকিসের পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসে।

৩ মার্চ, ২০০২: বিলকিস তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সেই অবস্থায় ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় কাস্তে, তলোয়ার, লাঠি নিয়ে ২০-৩০ জনের দল তাঁদের উপর চড়াও হয়। গণধর্ষণের শিকার হন বিলকিস। বিলকিসের চোখের সামনে পরিবারের ১৪ জনকে খুন করে উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীদের একটি দল। খুন করা হয় বিলকিসের শিশু সন্তানকেও।

৪ মার্চ, ২০০২: বিলকিসকে লিমখেড়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ দায়ের করা হয়। কিন্তু এফআইআর-এ তাঁর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাটি লেখে না পুলিশ। গ্রামের বারোজনকে চিহ্নিত করেন বিলকিস। বাদ দেওয়া হয় সেই তথ্যও।

৫ মার্চ, ২০০২: এরপর বিলকিসকে গোধরা রিলিফ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাঁচমহলের তৎকালীন কালেক্টর জয়ন্তী রবির নির্দেশে বিলকিসের সম্পূর্ণ জবানবন্দী নথিবদ্ধ করেন এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। কেশরপুরের জঙ্গল থেকে সাতটি দেহ উদ্ধৃত হয়।

৬ নভেম্বর, ২০০২: পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট 'এ' পেশ করে। তাতে বলে হয়, ঘটনাটি সত্যি, কিন্তু অপরাধীদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। মামলা বন্ধ করার জন্য আবেদন করে তারা। যদিও আদালত এই রিপোর্ট গ্রহন করে না, এবং তদন্ত জারি রাখার নির্দেশ দেয়।

২০০৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে আবার একই রিপোর্ট পেশ করে মামলা বন্ধের আর্জি জানায় পুলিশ। এ'বার সেই আবেদনে সম্মত হয় আদালত।

আরও পড়ুন: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, বিলকিসের ধর্ষকদের ফিরতেই হবে জেলে! কেন?

২০০৩-এর এপ্রিল মাসে বিলকিস সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেন, রিপোর্ট 'এ' খারিজ করে যেন সিবিআই তদন্ত হয়। সে'বছর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন মঞ্জুর করে। পরের বছর পয়লা জানুয়ারি সিবিআই ডিএসপি কেএন সিন্‌হা গুজরাট পুলিশের কাছ থেকে তদন্তের ভার নিজের হাতে নেন।

২০০৪-এর ১-২ ফেব্রুয়ারি, উদ্ধৃত দেহগুলির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় সিবিআই। ১০৯টি হাড় পাওয়া যায়, কিন্তু কোনও করোটি পাওয়া যায়নি। বোম্বে হাইকোর্ট তার রায়ে লিখেছিল, “মনে হচ্ছে কোনও এক সময় মাথাগুলি কেটে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।"

২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল, সিবিআই কুড়ি জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে। তার মধ্যে ছয়জন পুলিশ অফিসার সহ দুই জন ডাক্তারের নাম ছিল। এরা ২০০২ সালের ৫ মার্চ প্রাপ্ত দেহগুলির ময়নাতদন্ত করেছিল। অগাস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্ট মামলার শুনানি গুজরাট থেকে মুম্বইয়ে নিয়ে আসে। এবং একজন বিশেষ সরকারি উকিল নিয়োগের নির্দেশ দেয় কেন্দ্র সরকারকে।

২০০৮-এর ২১ জানুয়ারি, বৃহত্তর মুম্বইয়ের বিশেষ বিচারপতি মামলার রায় দেন। খুন ও ধর্ষণের অপরাধে ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। বেকসুর খালাস পায় সাতজন। মামলা চলাকালীন মারা যায় দুই অভিযুক্ত।

২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত আদালতে আবেদন দাখিল করে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই। সিবিআই যশবন্তভাই চতুরভাই নাই, গোবিন্দভাই নাই এবং শৈলেশ চিমনলাল ভট্টের মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করে। আটজন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করার বিরুদ্ধেও আবেদন করে তারা।

২০১৬ সালে বোম্বে উচ্চ আদালর আবেদনের শুনানি শুরু করে।

২০১৭-র মে মাসে বোম্বে উচ্চ আলাদত ১১ জন অপরাধীর যাবজ্জীবনের সাজাই বহাল রাখে। পাঁচজন পুলিশ অফিসার সহ যে দুইজন ডাক্তারকে খালাস করা হয়েছিল তাদেরও দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। জরিমানাসহ কারাদণ্ডের শাস্তি হয় তাদের।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে চারজন পুলিশ ও দুই ডাক্তারের আবেদন খারিজ করে সর্বোচ্চ আদালত। একজন কোনও আবেদন করেননি।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল, সুপ্রিম কোর্ট বিলকিস বানোকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, বিলকিস বানোকে একটি সরকারি চাকরি দিতে হবে, তাঁর পছন্দের জায়গায় সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা দিতে হবে। ১৭ বছর পরে আবার ২০১৯ সালে ভোট দেন বিলকিস। সেদিনই গুজরাটের রাজ্য সরকারের তরফে আদালতকে জানানো হয়, এই মামলায় অভিযুক্ত তিন পুলিশ আধিকারিকের পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আইপিএস অফিসার আরএস ভাগোরাকে পদচ্যুত করে হয়েছে। ৩০ মে, ভাগোরার অবসরের একদিন আগে, তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বরখাস্ত করে।

২০২২-এর মে মাসে অপরাধী রাধেশ্যাম শাহ আবেদন করেন গুজরাট উচ্চ আদালতের ২০১৯ সালের একটি রায়ের বিরুদ্ধে। মহারাষ্ট্রের সরকারের তদারকিতে এই আবেদনের সুষ্ঠু বিচার হবে বলে জানায় আদালত।

২০২২-এর ১৩ মে, বিচারপতি অজয় রাস্তোগী ও বিক্রম নাথের একটি বেঞ্চ গুজরাট সরকারকে নির্দেশ দেয়, দু'মাসের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে দোষীদের। ১৫ অগাস্ট, স্বাধীনতা দিবসের দিন, মুক্তি পায় বিলকিস বানোর ধর্ষকেরা। গুজরাট সরকার মুক্তি দেয় তাদের।

২০২২-এর সেপ্টেম্বরে আবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন বিলকিস বানো।

২০২৪-এর ৮ জানুয়ারি, সুপ্রিম কোর্ট গুজরাট সরকারের দোষীদের খালাস করার সিদ্ধান্তকে খারিজ করেছে। ফের জেলে ফিরতে হবে তাদের।

More Articles