অভাবের সংসারে রবি ঠাকুরের জন্য চাদর আর পার্থ-গৌরী ঘোষের কর্ণ-কুন্তী সংবাদ

রবি ঠাকুরের চাদর অন্যরকম, তুলে রাখা। তার বাবার হিসেবের খাতায় সে চাদরের দাম লেখা থাকে না।

Biswajit Ray
৪ মিনিট
অভাবের সংসারে রবি ঠাকুরের জন্য চাদর আর পার্থ-গৌরী ঘোষের কর্ণ-কুন্তী সংবাদ

তাদের বাড়িতে চাদর ছিল খানচারেক, ভালো চাদর ছিল একটাই। সেই চাদরখানা থাকত ছোট আলমারির ওপরের তাকে– থাকত, কিন্তু বিছানায় পাতা হত না। তাদের বাড়িতে বিশেষ কোনও অতিথি এলে সেই সুন্দর উজ্জ্বল হলুদ-সাদা ডোরা চাদরখানি পেতে দেওয়া হবে, এমন কথা বলত মা। সেই বিশেষ অতিথি কে? তাদের বাড়িতে কোনও আত্মীয়স্বজন যে আসতেন না, তা নয়, রাত্রিযাপন যে করতেন না, তা নয়। কিন্তু তাঁরা কেউ মায়ের কাছে বিশেষ অতিথি হয়ে উঠতে পারেননি। তাই সে চাদর কেনার পর থেকেই স্পর্শহারা, অনাহত। জিজ্ঞেস করেছিল সে, কারা এলে পাতা হবে সে চাদর? মা জবাব দিতে পারেনি, কিংবা দিতে চায়নি, অথবা ভেবে উঠতে পারেনি কোনও বিশেষ অতিথির নাম। তবে মনে হত তার, যদি কোনও দিন বড়মাসিরা আসে তাদের বাড়ি, তাহলে পাতা হবে। বড়মাসিরা থাকে কলকাতায়। নিউ মার্কেটের ওপরে বড়মেসোর থাকার জায়গা। সেখানে তারা ছুটি কাটাতে যায়– শীতের, গরমের। শীতের ছুটি কাটিয়ে যখন ফেরে, তখন তার সঙ্গে থাকে কতরকম কিছু– নিউ মার্কেটের সুপারিন্টেনডেন্ট বড়মেসো। বড়দিনে সেজে ওঠে চারপাশ– সেই সাজের বহর দেখেইনি তার পুরুলিয়া।

পুরুলিয়া অবশ্য তাকে একদিন রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছিল। শিখিয়েছিল রূপম। তাদের বাড়ির উল্টোদিকে থাকে সে। সকালে আসে তার কাছে। দু'জনে মিলে ট্রাঙ্কে বসে পা-দোলায় আর পাকানো রুটি খায়। সেই রূপমের বাড়ি একদিন গিয়েছিল সে। সেদিন ২৫ বৈশাখ। রূপম সহজ পাঠের রবীন্দ্রনাথের সামনে নমস্কারের ভঙ্গি করে বলে, আজ যে-কোনও একটা লেখা বলে মিষ্টি খেতে হয়। সে খানিকটা বলে ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’, তারপর রূপমের সঙ্গে গদাই সেনের গরম রসগোল্লা খায়। পুরুলিয়া শহর জানে গদাইয়ের রসগোল্লা কলকাতাও বানাতে পারে না।

তবে মিষ্টির থেকে নোনতা খেতেই তার ভালো লাগে বেশি। তাই ২৫ বৈশাখের রসগোল্লা তাকে আরেক ২৫ বৈশাখের লুচি-আলুর দমের দিকে নিয়ে যায়। তখন তাদের বাড়িতে কেনা হয়েছে একটা টেপ-রেকর্ডার। মা পুরুলিয়াকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তাই টেপ-রেকর্ডার কেনা হয়েছিল কলকাতা থেকে। ঘিয়ে সাদা সেই টেপ-রেকর্ডারের জন্য ছোট একটা তোয়ালে এনেছিল মা। প্রতি মাসের মাইনে রুমালে বেঁধে বাড়ি নিয়ে আসত বাবা। বাবার মাইনে তখন একটা রুমালের বাঁধনেই যেত ধরে। টেপ-রেকর্ডার ঢাকা দেওয়ার তোয়ালে বাবার রুমালের থেকে বড়, যদিও তা কেনা হয়েছিল রুমাল-বাঁধা টাকার নিত্য খরচের পর যা বেঁচে থাকে, তারই একটা অংশে। চারটে ক্যাসেট ছিল তাদের বাড়ি। একটা হেমন্তের রবীন্দ্রসংগীতের, একটা সব্যসাচীর আবৃত্তির, একটা অনুপ জলোটার ভজনের আর একটা পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষের আবৃত্তির। সেখানেই সে প্রথম শুনেছিল কর্ণ-কুন্তী সংবাদ। তারপর মাঝে মাঝে সে আর তার মা কর্ণ-কুন্তী সংবাদ বলত সঞ্চয়িতা দেখে। মা কুন্তী আর সে কর্ণ। মা যখন কুন্তী হত, তখন বকত না, মারত না। নইলে সন্ধেবেলা লণ্ঠনের কাঁপা আলোয় ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে তার কিছু কানম'লা ছিল নিত্যকর্মপদ্ধতি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাহিত্যে বারবার মেয়েদের জিতিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতায় নারীদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। 'সাধারণ মেয়ে'-র মালতী শরৎবাবুর গল্পের মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চেয়েছেন নরেশ সেনের অবহেলাকে।

পুরুলিয়ার রাসমেলা থেকে সেবার কিনেছিল সে রবীন্দ্রনাথের একটা মূর্তি। মা খুশি হয়ে দিয়েছিল কিনে। মায়ের ইচ্ছে ছিল খুব শান্তিনিকেতনে পড়ার। সে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি। কী করে হবে? দাদু মারা গিয়েছিল, দিদিমা মায়েদের পাঁচ বোনকে নিয়ে বিধবা হয়েছিল। পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মায়ের বড়মামা। সে দায়িত্বের ওপর তো আর ভার চাপানো যায় না– তাই মায়ের শান্তিনিকেতনের ইচ্ছের কথা দিদিমা কোনওদিন তার বড়োভাইকে বলেনি। মায়ের মামাতো বোন অবশ্য শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়েছিল– সে পড়া শেষ হয়নি। মা তাই খালি ভাবত, যদি সুযোগ পেত তাহলে শান্তিনিকেতনে ঠিক ভালো কিছু করত। সে ভালোর কথা ভাবতে ভাবতে গ্র্যাজুয়েট মায়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বাবার সঙ্গে, বাবার ছিল হিসেবের খাতা আর ক্রিকেটের ধারাবিবরণী, ফুটবলেরও। পুরুলিয়ার দিন-রাতে মার্ফি রেডিও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাবা ঢুকে যেত না-যেতে পারা খেলার মাঠে। রেডিওর ভেতর খুলে যেত ময়দান আর ইডেনের রাস্তা।

রাসমেলার রবীন্দ্রনাথ যে মায়ের সেই না-যেতে পারা শান্তিনিকেতন, তা সে বুঝতে পারল পরের বৈশাখে। যখন সে বলল রূপমের বাড়ি না গিয়ে নিজের বাড়িতেই রবিঠাকুরের প্রসাদ খেতে চায়, তখন মা খুশি হল খুব। তারপর যা হল, সে এক আশ্চর্য রূপকথা। সে দেখল সেই যে হলুদ-সাদা চাদর, যা স্পর্শহীন অনাহত, তা বের করে আনছে মা। তারপর যত্ন করে বিছিয়ে দিচ্ছে টেবিলের ওপর। সেই চাদরের ওপর বসছেন রবীন্দ্রনাথ। আর চাদর বড় বলে টেবিলের তলা অবধি ঢেকে তৈরি হচ্ছে একটা চমৎকার তাঁবুর মতো ঘর। সে মনের আনন্দে ঢুকে পড়ল সেই চাদরঢাকা টেবিলের তলার ঘরে। হাতে তার সঞ্চয়িতা। আর সে পড়ে পড়ে নিজের ইচ্ছেমতো রবীন্দ্রনাথের মূর্তিকে শোনাতে লাগল রবি ঠাকুরের কবিতা।

আর মা? মা চলল রান্নাঘরে। রবি ঠাকুর এসেছেন। খেতে দিতে হবে না! লুচি আর সাদা আলুর তরকারি। লুচিগুলো নিটোল ফুলকো-ফুলকো। মা উনুন-তাতে রবি ঠাকুরের জন্য লুচি ভাজতে বসল। মায়ের মুখে সেই বৈশাখে মুক্তোর মতো ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম।

তারা যখন কলকাতা যেত, তখন মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে থাকত একখানা চাদরের মোট, যা কিছু ধরত না সুটকেসে, তা বেঁধে নেওয়া হত চাদরের মোটে। সেই মোট বাবা তুলত ট্রেনে। ট্রেনের ফাঁক-ফাঁক কাঠের বেঞ্চি। তার তলায় বসে মোটের কলকাতা যাত্রা। পুরুলিয়া থেকে কলকাতার পথে প্রথম প্রথম স্টেশনগুলোতে বাঁধানো প্ল্যাটফর্ম নেই। তবে ঘণ্টা বাজানোর লোক আছে। ঘণ্টা বাজলে তবে হেলতে-দুলতে ট্রেন চলে, আর দোলে চাদরের মোট।

দেখতে দেখতে তার মনে হত, যাকে তারা প্রতিদিনের কাজে লাগায়, বেঁধে-ছেঁদে মাল বওয়ার কাজে ব্যবহার করে, তা দরকারি, কিন্তু সে চাদর রবি ঠাকুরের নয়। রবি ঠাকুরের চাদর অন্যরকম, তুলে রাখা। তার বাবার হিসেবের খাতায় সে চাদরের দাম লেখা থাকে না। মা রবি ঠাকুরের চাদর কিনেছিল মায়েরই জমানো হাত খরচের টাকায়– সে টাকাও বাবার রুমালের, কিন্তু তা দিয়ে ঠিক কী কেনা হবে, তা নির্দিষ্ট ছিল না।

তবে মা বুঝেছিল, তাদের একটা চাদর লাগবে‌।

অভাবের সংসারে লাগবে কর্ণ-কুন্তী সংবাদ, আর লাগবে রবি ঠাকুরের চাদর।

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?