বুদ্ধদা আদর্শ কমিউনিস্ট ছিলেন

Buddhadeb Bhattacharya: ব্যক্তিগত ভাবে রাজনীতির পাশাপাশি কবিতাচর্চা, সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, ভালো গান, ভালো চলচ্চিত্র, এমনকী দুনিয়াজোড়া সাহিত্যের খবর রাখতেন। আবার রাজনীতির ক্ষেত্রেও নানান প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতেন, প্রশ্নের সম্মুখীন হতে ভালোবাসতেন

Md Salim
৪ মিনিট
বুদ্ধদা আদর্শ কমিউনিস্ট ছিলেন

বুদ্ধদাকে প্রথম দেখি যুবনেতা হিসেবে। তখন আমরা ছাত্র। কিন্তু তখন থেকেই তাঁর ভাবনা-চিন্তা, কথাবার্তা, বক্তৃতা-লেখনী , তাঁর সংস্কৃতিবোধ, তাঁর পরিমার্জিত রুচি-পরিশীলিত ব্যবহার আমাদের প্রজন্মকে টানত। শুধু তা-ই নয়, আমরা সেসময় নিজেদেরকে ওঁর মতো করে সাজিয়ে তোলারও কম চেষ্টা করিনি। সেটা ষাটের দশকের শেষ কিংবা সত্তরের শুরু। সময়টা উত্তাল। সেসময় যুবনেতা হিসেবে দেখেছি বুদ্ধদাকে। যথেষ্ট কম বয়সেই বামফ্রন্ট সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন তিনি। রাজ্যে সংস্কৃতির চর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের চেষ্টার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে কীভাবে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সৃজনশীলতার মধ্যে টেনে নিয়ে আসা যায়, এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কীভাবে উৎসাহ তৈরি করা যায়, সেই চেষ্টা সর্বদা করে গিয়েছেন।

ব্যক্তিগত ভাবে রাজনীতির পাশাপাশি কবিতাচর্চা, সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, ভালো গান, ভালো চলচ্চিত্র, এমনকী দুনিয়াজোড়া সাহিত্যের খবর রাখতেন। আবার রাজনীতির ক্ষেত্রেও নানান প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতেন, প্রশ্নের সম্মুখীন হতে ভালোবাসতেন। নিজে প্রশ্ন করতেন, অন্যের প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন সবসময়। নবজাগরণের উত্তরসাধক হিসেবে যে সবকিছুকেই প্রশ্ন করা যায়, কোনও কিছুই প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়, এই ভাবনায় বিশ্বাস করতেন খুব। বুদ্ধদার সম্পর্কে যেটা না বললেই নয়, তিনি সর্বোপরি একজন গণতান্ত্রিক ছিলেন, ভাবনায়, চেতনায়। অনেকেই বহু সময় প্রশ্ন করেছেন, কেন প্রশাসক হিসেবে কড়া মনোভাব নিলেন না তিনি? আসলে ওই উগ্রতাটা একেবারেই ছিল না তাঁর মধ্যে। সাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, হয় কেউ সাম্প্রদায়িক কিংবা অসাম্প্রদায়িক। বুদ্ধদার ক্ষেত্রে বলা যায়, তিনি ছিলেন 'অ্যাগ্রেসিভ সেক্যুলার'। কোনও রকম হীনমন্যতা যেমন ছিল না ওঁর মধ্যে, তেমনই ছিল না কোনও রকম অযৌক্তিক অন্ধবিশ্বাস।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নিঃশব্দে যে যায় লাল পতাকা মুড়ে... বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যা শিখিয়ে গেলেন বাংলাকে

Buddhadeb Bhattacharjee Death: বুদ্ধদেব প্রকাশ্য সভায় নিজের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, গুলি চালানোর ওই ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী।

সবসময় দেখেছি, তাঁর মধ্যে এই একটা বোধটা কাজ করত যে শহুরে বাঙালি মধ্যবিত্ত অংশের কাছে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্র এবং সুযোগ— দুই-ই রয়েছে। কিন্তু যাঁরা আদিবাসী, তফসিলি, রাজবংশী কিংবা সংখ্যালঘু, অথবা যারা পিছিয়ে পড়া বা প্রান্তিক মানুষ, তাঁদের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো কীভাবে গড়ে তোলা যায়, তাঁদের সংস্কৃতি, তাঁদের ধারা, তাঁদের গান, তাঁদের যে লোকসংস্কৃতি বা লোকশিল্পগুলি, সেগুলি যাতে বিলুপ্ত না হয়ে যায়, সেগুলিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবনাচিন্তা করতেন। কীভাবে তাঁদেরকে আরও বেশি করে উৎসাহ দেওয়া যায়, তাঁদের সংস্কৃতির চর্চা করা যায়, তা নিয়ে সদাসচেষ্ট থাকতে দেখেছি তাঁকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি...

Buddhadeb Bhattacharjee: আসলে নিজস্ব আদর্শ, নিজস্ব জীবনধর্মে আজীবন অটল ছিলেন বুদ্ধবাবু। সেখান থেকে নড়ানো গেল না তাঁকে আজও।

না, এটা যে শুধুই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ছিল, তা নয়। একই ভাবে প্রশাসক হিসেবে রাজ্যের কীভাবে উন্নয়ন হবে, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কীভাবে আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য কারিগরী প্রশিক্ষন শিক্ষা, বৃত্তিশিক্ষা, পেশাশিক্ষার উপরে জোর দিতেন। গোটা বিশ্ব ও দেশের শিল্পসম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শুধুমাত্র আমাদের এখানে শিল্প গড়ে তোলাটাই যে উদ্দেশ্য ছিল এমন নয়। এমনকী শিল্পের উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা বা বিনিয়োগ নিয়ে আসাও নয়, সেই সব ক্ষেত্রে যাতে আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়েরা কাজ করতে পারে, সেই কাজ করার মতো উপযুক্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাঁরা, সেগুলিও ছিল বুদ্ধদার যথেষ্ট মাথাব্যথার বিষয়ে। আমি তখন রাজ্যের কারিগরী শিক্ষামন্ত্রকের দায়িত্বে। নিজে দেখেছি কীভাবে তিনি প্রতিনিয়ত উৎসাহ জুগিয়েছেন এই সব দিকগুলিতে । সানশাইন ইন্ডাস্ট্রি, নতুন টেকনোলজি, তার উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে সেগুলিতে কাজ করতে পারে, মাথা তুলে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াতে পারে, অথচ তাঁদের পা যেন থাকে শক্ত মাটির উপরে, সেই চেষ্টা করে গিয়েছেন সর্বদা। অর্থাৎ তাঁদের যে স্বকীয়তা, বাঙালিয়ানা বা ট্র্যাডিশনাল ওয়ে অব লাইফ রয়েছে, সেই জায়গা থেকে তাঁরা যাতে বিচ্যুত না হয়, সেদিকেও জোর দিতে চাইতেন তিনি।

তাঁর সঙ্গে আমার রাজনীতির সম্পর্ক, সহকর্মীর সম্পর্ক যেমন ছিল, তার বাইরেও একটা ব্যক্তিগত স্তরে পারিবারিক সম্পর্কও তাঁর সঙ্গে আমার ছিল। বুদ্ধদার সঙ্গে একেবারে দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল আমার, এটা বললে বোধহয় এতটুকু অতিশয়োক্তি করা হয় না। শুধু ওঁর সঙ্গে নয়, মীরা ভট্টাচার্য ছিলেন নিজের বৌদির মতোই। সেই ব্যক্তিগত স্তরের সম্পর্ককে অনেকেই রাজনীতির ময়দানে গুলিয়ে ফেলতেন। অনেকেই মনে করতেন, রাজনৈতিক ভাবেও ঘনিষ্ঠ আমরা। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, নীতিগত ভাবে পরস্পরের অবস্থানের প্রতি একটা সম্মান আমাদের দু'জনেরই ছিল। তবে সত্যিই আমি অনেকটা ভালোবাসা, অনেকটা স্নেহ ওঁর কাছ থেকে। তাঁর আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলাম। অনেক ব্যাপারেই আমার উপর নির্ভর করতেন বুদ্ধদা। বহু ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে ঘনিষ্ঠজনের কাছেও প্রশ্ন করে বসেছেন,

সেলিম কী বলছে এ ব্যাপারে? ও যদি বলে থাকে, তাহলে ঠিক আছে।

সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের চলে যাওয়া রাজ্যের, দেশের, সর্বোপরি রাজনীতির ক্ষতি তো বটেই। এরকম নিষ্কলঙ্ক, নিষ্পাপ চরিত্র সত্যিই আজকের রাজনীতিতে বিরল। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, সেটাই সব সময়ে আচরণের মধ্যেও ধারণ করেছেন। কোনও রকমের হিপোক্রেসি দেখিনি কখনও ওঁর চরিত্রে। স্পষ্টবাদী ছিলেন। ক্ষমতা দেখেছেন, জয়-পরাজয়— উভয়ই দেখেছেন ব্যক্তিগত কেরিয়ারে, তবে কোনও কিছুতেই তেমনভাবে বিচলিত হতে দেখিনি তাঁকে। পাশাপাশি একটা কথা না বললেই নয়, শত ঝড়ঝাপটা, সমালোচনা, বিতর্ক কোনও কিছুর সামনেই আপস করেননি কখনও, এমনকী কোনও কিছুতেই নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করতেও দেখিনি তাঁকে কোনওদিন। পাম অ্যাভিনিউয়ের ওই চারশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটটাই ছিল তাঁর আজীবনের ঠিকানা। যেমন সাদামাটা জীবনে বিশ্বাসী ছিলেন, শেষ জীবন পর্যন্ত তেমনটাই থেকে গেলেন। একজন আদর্শ কমিউনিস্টের ঠিক যেমন হওয়া উচিত, একেবারে তেমনটাই।

লিখেছেন
Md Salim
Md Salim
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।