মাংস মদিরা সহযোগে ‘বর্ধমান স্ট্যু’, আজও যখন তখন ফিরে যাওয়া যায় ঔপনিবেশিক ভারতে

Burdwan Stew: পাখির টুকরো মাংস, ছাগল বা ভেড়ার সেদ্ধ মাংস দিয়েও অনেক সময় এই স্ট্যু তৈরি করা হতো। রান্নার জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল রুপোর সসপ্যান।

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
মাংস মদিরা সহযোগে ‘বর্ধমান স্ট্যু’, আজও যখন তখন ফিরে যাওয়া যায় ঔপনিবেশিক ভারতে

বর্ধমান বলতেই সবার প্রথমে আমাদের মনে আসে মিহিদানা আর সীতাভোগের কথা। তাই তো শহরের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড়-মাঝারি দোকানগুলিতেও কখনও খরিদ্দারের অভাব হয় না। কিন্তু আজ সেসব থাক, একেবারে ভিন্ন স্বাদের একটি স্ট্যু-এর কথা বলতে চাই, যার নামকরণ করা হয়েছিল শহর বর্ধমানের নাম অনুসারে। এই স্ট্যু মূলত ছিল প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে তৈরি এক আইরিশ খাবার। বর্ধমান স্ট্যুয়ের নামকরণ সম্পর্কে সঠিক কোনও তথ্য না জানা গেলেও, এনাবেল লয়েড তাঁর বই, ‘Picnic Crumbs’ এ অনুমান করেছেন, কলকাতা থেকে ৬৭ মাইল দূরে অবস্থিত এই বর্ধমান শহরটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের জেলা সদর। এখানে যে সমস্ত রাজকর্মচারী এবং সৈন্যরা থাকতেন, তাঁদের মধ্যেই প্রথম দিকে এই বর্ধমান স্ট্যুয়ের জনপ্রিয়তা অধিক ছিল। পরবর্তী কালে তাঁরা যখন কাজের সূত্রে কলকাতা কিংবা কলকাতা সংলগ্ন এলাকায় যান, তাঁদের মাধ্যমেই স্ট্যুটির পরিচিতি ঘটতে থাকে ‘বর্ধমান স্ট্যু’ হিসাবে এবং ক্রমেই তা জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যায়।

এই পদটি মূলত ইউরোপিয়ানদের কাছে জনপ্রিয় খাদ্য হয়ে উঠেছিল, অবশ্য স্ট্যুটির জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর্যাপ্ত কারণও ছিল। ভিনদেশের ইউরোপিয়ানদের খাদ্যাভ্যাস ছিল এ দেশীয়দের থেকে একেবারেই আলাদা। স্ট্যু জাতীয় খাবার হওয়ার কারণে তা সহজেই গরম করে নেওয়া যেত। শোনা যায়, সেই সময়ে অনেকেই নাকি সামান্য স্পিরিট ল্যাম্পের আঁচেও তা গরম করে নিতেন। এছাড়াও এই স্ট্যু যে কোনও প্রতিকূল অবস্থাতেও অতি সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যেত।

এই স্ট্যু কবে আবিষ্কার হয়েছিল, তার কোনও সঠিক সময় জানা যায় না, তবে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন ঔপনিবেশিক সাহিত্যে এই স্ট্যুয়ের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও কলকাতার বিভিন্ন সোস্যাইটিতে, খাবারের তালিকা থেকে এই স্ট্যুয়ের কথা জানতে পারা যায়। স্যার চার্লস ডি অইলি, একজন ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারি এবং কবি, তাঁর কবিতা ‘Tom Raw, The Griffing’ (1928) তে রাইটার্সের এক জাঁকজমকপূর্ণ টিফিন হিসাবে এই খাবারের কথা উল্লেখ করেছেন। অয়াল্টারকে ফার্মিংগার নামে একজন যাজক এবং ঐতিহাসিক ‘Thacker’s Guide to Calcutta’ (1906) বইতে লালবাজারে হারমোনিক হাউসের নানান খাবার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে, এই স্ট্যুয়ের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তিনি আরও জানিয়েছেন, তৎকালীন সময়ে একটি রুপোর পাত্রে এই বর্ধমান স্ট্যু পরিবেশন করা হত। খ্রিস্টান আইসোবেল জন্সটোন, বর্ধমান স্ট্যুর সঙ্গে ‘ইংলিশ ডেভিল’ বা ‘ফ্রেঞ্চ সালমে’ জাতীয় খাবারের তুলনা করেছেন।

স্ট্যু রান্নার উপাদান

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিপ্লব থেকে গুণ্ডামি, যে পথে এগিয়েছে বাংলার 'জ্বালিয়ে দাও-পুড়িয়ে দাও' আন্দোলন

Political Vandalism: এই জ্বালিয়ে দেওয়ার ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কাল থেকেই বর্তমান। যা একেবারে সাম্প্রতিককালে পাশের দেশ শ্রীলঙ্কায় দেখা গিয়েছে।

এবার জেনে নেওয়া যাক, এককালীন বিখ্যাত এই স্ট্যু রান্না করতে কী কী উপাদান ব্যবহৃত হত। যদিও এই স্ট্যুয়ের নির্দিষ্ট রন্ধন পদ্ধতি বা উপাদান সম্পর্কে কোনও হদিশ মেলেনি, তবুও বর্ধমান স্ট্যুয়ের প্রথমদিকের যে রেসিপি পাওয়া যায় তাতে সাধারণ কিছু উপাদানেরই উল্লেখ রয়েছে, যেমন- কয়েক চামচ মদিরা, আঙ্কোভি এসেন্স, ময়দা, বাটার, পেঁয়াজ এবং গোলমরিচ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা মতো তা নিজের রূপ বদলেছে, কারণ পরের দিকের বর্ণনাগুলিতে আরও কিছু উপাদানের উল্লেখ পাওয়া গেছে। মিসেস ডাল্গার্ন, ১৮২৯ সালে প্রকাশিত ‘The Practice of Cookery’ বইতে আরও বেশ কিছু উপাদানের কথা বলেছেন। তাঁর রেসিপিতে এই স্ট্যুয়ের জন্য পূর্বের উপাদানগুলির সঙ্গে মাশরুম, লেবুর রস, ভিনিগার, হোয়াইট ওয়াইন, মশলা এবং সস ইত্যাদি সংযোজিত হয়েছে। আবার পাখির টুকরো মাংস, ছাগল বা ভেড়ার সেদ্ধ মাংস দিয়েও অনেক সময় এই স্ট্যু তৈরি করা হতো। রান্নার জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল রুপোর সসপ্যান। বলা হত, স্ট্যুয়ের স্বাদ সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিল রুপোর সসপ্যানের উপরেই। সেই সময় দাঁড়িয়েও বর্ধমান স্ট্যু একটি ফিউশন জাতীয় খাবার হিসাবে মর্যাদা লাভের দাবি রাখে।

রন্ধন পদ্ধতি

প্রথমেই পাখির মাংস সেদ্ধ করে নিতে হত। তারপর সেই সেদ্ধ করা মাংস, টুকরো করে কেটে স্ট্যু’র পাত্রে রাখা হত। তাঁর সঙ্গে মেশানো হত- তিন টেবিল চামচ আঙ্কোভি এসেন্স, তিন টেবিল চামচ মদিরা, জল, ময়দা, মাখন, টুকরো পেঁয়াজ এবং স্বাদের জন্য গোলমরিচ। পেঁয়াজ নরম হয়ে যাওয়া পর্যন্ত হালকা আঁচে তা রান্না করা হত এবং সবশেষে স্ট্যুটি পরিবেশন করা হত লেবুর আচার বা রস সহযোগে। ভেড়া বা ছাগলের মাংস দিয়ে বর্ধমান স্ট্যু বানানোর সময় এই একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হত।

উনিশ শতকের পরে ইউরোপিয়ানরা আরও ভিন্ন স্বাদের স্ট্যুয়ের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করতে থাকলে, বর্ধমান স্ট্যু তার নিজের জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে এবং বলা চলে ক্রমে তার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায়। আসলে ব্রিটিশ পুরুষ এবং মহিলাদের কাছে ভারত ছিল একটি দূরের দেশ, কেবল দূরের দেশ বললে হয়তো ভুল হবে। ভারতের কোনও কিছুর সঙ্গেই ইউরোপের বিশেষ সাদৃশ্য ছিল না। ইউরোপে থাকাকালীন তাঁরা যে সমস্ত সুবিধাগুলি পেতেন, তা ভারতে ছিল না বললেই চলে আর সেখান থেকেই সম্ভবত জন্মলাভ করেছিল এই বর্ধমান স্ট্যু, যার একদিকে ছিল পশ্চিমের খাদ্যাভ্যাসের ছোঁয়া আবার অন্য দিকে ছিল প্রাচ্যের নানান মশলার সমাহার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাজার জেদে রোলস রয়েস হলো ময়লা ফেলার গাড়ি! ক্ষমা চেয়েছিলেন সাহেবরা

Rolls Royce Limousin: শব্দহীন ইঞ্জিন, ঋজু স্বাস্থ্য নিয়ে চলেছে কলকাতার রোলস রয়েস।

তথ্যসূত্র

১. www.theoldfoodie.com

২. Scroll.in

৩. www.getbengal.com

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।