প্রকাণ্ড ডানা, অপার্থিব সৌন্দর্য! মহাকাশে কীভাবে লুকিয়ে দানবাকৃতি মহাজাগতিক প্রজাপতি?

Butterfly Nebula: তারাদের মৃত্যু যে এত রঙিন হয়, তা না দেখলে আন্দাজ করা শক্ত।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
প্রকাণ্ড ডানা, অপার্থিব সৌন্দর্য! মহাকাশে কীভাবে লুকিয়ে দানবাকৃতি মহাজাগতিক প্রজাপতি?

দুপুরে বা বিকেলে বাগানে প্রজাপতির আনাগোনা দেখতে পছন্দ করেন না, এরকম বেরসিক লোক খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। প্রজাপতির ডানায় তো রং বেরঙের খেলা। আচ্ছা, আমরা যে প্রজাপতিদের দেখি, তাদের ডানার দৈর্ঘ্য কত বলুন তো? ওই মেরেকেটে ১০ সেন্টিমিটার। ডানাগুলো যদি দৈর্ঘ্যে আরও একটু বড় হতো, তাহলে কী মজাই না হতো! আরও রঙ, আরও সৌন্দর্য! কেন এমন হলো না? খুব একটা হতাশ হওয়ার অবশ্য কারণ নেই। এই একই ধরনের প্রজাপতি মহাশূন্যেও দেখা যায়। তাদের ডানা বিশাল বড়, প্রায় তিন আলোকবর্ষের সমান বা তার চেয়েও হয়তো বড়। আমাদের থেকে এই প্রজাপতিরা প্রায় ৩ হাজার ৩৯২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীমহলে তা অবশ্য NGC 6302 নামে পরিচিত। মহাশূন্যের প্রজাপতি! এমনও আবার হয় নাকি? হ্যাঁ! হয়, এদের পোশাকি নাম 'বাটারফ্লাই নেবুলা' অর্থাৎ 'প্রজাপতি নীহারিকা'। ২০০৯ এবং ২০২০ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সেইসব মনোরম দৃশ্য। এই 'প্রজাপতি নীহারিকার’ সৌন্দর্যে বিভোর মহাকাশপ্রেমীরা।

নেবুলা কী? ল্যাটিন শব্দ ‘নেবুলা’-র অর্থ ‘কুয়াশা' বা 'মেঘ’। বিজ্ঞানীমহলে যদিও এরা নীহারিকা নামেই বেশি পরিচিত। সাধারণত ধুলো, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও আয়নিত গ্যাসের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে নীহারিকা বলে। স্বীয় ভাগ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়াও এর ভিতরে খুবই অল্প পরিমাণে কার্বন, নাইট্রোজেন, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন প্রভৃতি উপাদান পাওয়া যায়। মহাশূন্যের এই সমস্ত আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম বা ইন্টার গ্যালাক্টিক মিডিয়ামেই নীহারিকাদের আবাস। সোজা কথায় বললে, তারাদের মাঝের যে ফাঁকা জায়গা, সেখানেই এদের বসতি। প্রজাপতি নীহারিকার বাইরে তেমনই মেঘের আচ্ছাদন রয়েছে, যেখানে রং-বেরঙের খেলা চলছে অবিরত। আর তাতেই সুন্দরতম হয়ে উঠেছে মহাকাশের এই বাসিন্দা। প্রজাপতির মতো দেখতে বলে এদের নাম হয়েছে ‘বাটারফ্লাই নেবুলা’ বা 'প্রজাপতি নীহারিকা'।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাশূন্যে বিলীনও হয়ে যেতে পারেন সুনীতারা! কেন জানেন?

Sunita Williams: প্রাক্তন মার্কিন সামরিক স্পেস সিস্টেম কমান্ডার রুডি রিলডফি জানাচ্ছেন, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত মহাকাশযানে সুনীতাদের ফেরানোর ব্যবস্থা করার ক্ষেত্র যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

সাধারণত কোনও নক্ষত্রের জ্বালানি যখন তলানিতে এসে ঠেকে, অর্থাৎ সে অন্তিম সময়ে এসে পৌঁছয়, তখন তার ভিতরের কণাগুলি একে অপরকে প্রবলভাবে টানতে থাকে। ক্রমাগত এ টানের দরুন নক্ষত্রগুলো সংকুচিত হতে হতে একসময় হঠাৎ করে ফেটে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সুপারনোভা’। সে এক রঙিন ব্যপার! তারাদের মৃত্যু যে এত রঙিন হয়, তা না দেখলে আন্দাজ করা শক্ত। এই বিস্ফোরণের ফলে ধুলো, গ্যাস ও প্রচুর পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, যা চারপাশের গ্যাসীয় পদার্থগুলিকে আয়নিত করে তোলে। সেজন্য সুপারনোভার ফলে বর্ণময় ঔজ্জ্বল্যের সৃষ্টি হয়। বিস্ফোরণের ফলে উদ্ভুত উপাদানগুলো আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিকর্ষজ সঙ্কোচনের কারণে কাছে আসতে থাকে। এর পোশাকি নাম 'মহাকর্ষীয় সংবন্ধন' বা 'গ্রাভিটেশনাল কোলাপ্স'। এর ফলে ধীরে ধীরে আন্তঃনাক্ষত্রিক উপাদানগুলি জোট বাঁধতে থাকে। একসময়ে গিয়ে সুপারনোভার ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম হয় নীহারিকার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাবিশ্ব মোটা হচ্ছে! এর বয়স কত? যেভাবে মেপেছিলেন এই বিজ্ঞানী

Hubble's law: হলভর্তি দর্শকের সামনে হাবল প্রমাণ করেন, আমাদের চেনা শাশ্বত মহাবিশ্ব আর আগের মতো চিরন্তন নয়, এ সতত পরিবর্তনশীল!

বাটারফ্লাই নেবুলাগুলো মূলত প্ল্যানেটারি নেবুলা ধরনের। আকারের জন্য এদেরকে বাইপোলার বা দ্বিপদী নেবুলাও বলে। সাধারণত দুইটি পাশাপাশি অবস্থিত নক্ষত্রের (অর্থাৎ বাইনারি নক্ষত্রতন্ত্রের ক্ষেত্রে) জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে, এদের কেন্দ্রগুলি একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ফলে বিপরীত দিকে ধাবমান দু'টি স্রোত বা জেট বেরিয়ে আসে। তাদেরকে ঘিরে থাকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাস ও ধূলিকণার মিশ্রণ। তার থেকেই সৃষ্টি হয় প্রজাপতির মতো বর্ণময় মহাজাগতিক ডানা। ১৮৩২ সালে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ স্যার উইলিয়াম হার্শেল সর্বপ্রথম এই 'বাটারফ্লাই নেবুলা' আবিষ্কার করেন। কেবল সৌন্দর্যের জন্যই নয়, আন্তঃনাক্ষত্রিক বিবর্তনের অজস্র রহস্যের জন্যও এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে খুবই চর্চিত মহাজাগতিক বস্তু।

এছাড়াও মহাকাশে হরেক রকমের নীহারিকা দেখতে পাওয়া যায়, যাদেরকে বিভিন্ন ফুল, পোকামাকড়, বা প্রাণীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে নামকরণ করা হয়। যেমন, যেসব নীহারিকারা বিড়ালের চোখের মতো দেখতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীমহল তাদের চেনে 'ক্যাটস আই নেবুলা' নামে, আবার একটু প্যাঁচালো কাঁকড়ার মতো দেখতে নেবুলারও হদিশ পাওয়া গেছে, যার নাম বিজ্ঞানীরা রেখেছেন 'ক্র্যাব নেবুলা'। এছাড়াও আছে 'এস্কিমো নীহারিকা', দেখতে গ্রিনল্যান্ডের বরফবাসী এস্কিমোদের মতো। আবার এক টুকরো লেবুর পাতলা স্লাইসের মতো দেখতে নেবুলার নাম 'লেমন স্লাইস নীহারিকা'।

এই মায়াবী মহাজাগতিক বস্তুর পরতে পরতে রহস্য লুকিয়ে আছে, যার সন্ধানে সেই প্রাচীনকালে গ্রিক জ্যোতির্বিদ ক্লডিয়াস টলেমি থেকে আধুনিককালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। গত দশক থেকে এমন হরেক রকমের বর্ণময় ছবি আমাদের উপহার দিয়ে যাচ্ছে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। এই নিবন্ধটি লিখতে লিখতেই, হাবলের শক্তিশালী ক্যামেরা হয়তো তাক করে আছে আরও একগুচ্ছ মহাকাশ সুন্দরীদের দিকে!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।