কামদুনি গণধর্ষণে ন্যায়বিচার পেল নির্যাতিতার পরিবার?

Kamduni gang rape and murder: কামদুনি গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রায় দশ বছর পর সেই মামলায় রায় শোনাল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে সেই বিচার সন্তুষ্ট করতে পারল নির্যাতিতার পরিবারকে।

Sohini Das
৩ মিনিট
কামদুনি গণধর্ষণে ন্যায়বিচার পেল নির্যাতিতার পরিবার?

কামদুনি, শব্দটার সঙ্গেই যেন আজও জড়িয়ে একটা ভয়, আতঙ্ক আর লজ্জার স্মৃতি। ২০১৩ সালে কামদুনির সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা, যা নাড়িয়ে দিয়েছিল রাজ্য-রাজনীতিকে। প্রায় দশ বছর পর সেই মামলায় রায় শোনাল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে সেই বিচার সন্তুষ্ট করতে পারল নির্যাতিতার পরিবারকে। গুরু পাপে লঘু দণ্ড দিয়েই কি রেহাই দিল হাইকোর্ট! মকুব করা হল মৃত্য়ুদণ্ডও। আপাতত সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার।

২০১৩ সালে কলেজ থেকে ফেরার সময়ে তরুণীকে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন দুষ্কৃতি। পরিত্যক্ত একটি কারখানায় নিয়ে গিয়ে চলে অকথ্য অত্যাচার, গণধর্ষণ। ধর্ষণের প্রমাণ লোপাট করতে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল তরুণীর দুই পা। তরুণীর নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে গিয়েছিল। শেষমেশ গলা কেটে খুন করার পর নির্মমভাবে লাশ ফেলে আসা হয় মাঠে। ঘটনার বীভৎসতায় শিউড়ে উঠেছিল গোটা বাংলা। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল কামদুনি। চলে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর। শেষপর্যন্ত নামাতে হয়েছিল আধাসেনা।

কামদুনির সেই ঘটনার প্রথম চার্জশিটে নাম ছিল মোট ৬ জনের। তদন্তভার উঠেছিল সিআইডির হাতে। অভিযুক্ত সন্দেহে গ্রেফতার হয় আনসার আলি, সইফুল আলি, আমিনুর আলি, ভুট্টো মোল্লা, এনামুল মোল্লা, আমিন আলি, গোপাল নস্কর, ভোলানাথ নস্কর। মামলা চলাকালীন মৃত্যু হয় একজনের। সেই ঘটনার প্রাথমিক রায় বেরোতে বেরোতেই কেটে গিয়েছিল ৩ বছর। ২০১৬ সালে ২৯ জানুয়ারি কামদুনি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেছিল বারাসাত জেলা আদালত। ৩১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর সাজা শোনানো হয় ছ'জনকে। ৩ জনকে যাবজ্জীবন এবং ৩ জনকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছিল। বেকসুর খালাস হয়েছিলেন রফিকুল গাজি ও নূর আলি। দোষীরা এই রায়ের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টে গিয়েছিল দোষীরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কাশ্মীর থেকে মণিপুর, ক্ষমতার হাতিয়ার যখন 'ধর্ষণ'

Manipur Violence: কাশ্মীর থেকে দিল্লি, মণিপুর থেকে উত্তরপ্রদেশে, ছবিটা কিন্তু একই। প্রতিটা দাঙ্গা, প্রতিটা সাম্প্রদায়িক অশান্তি শেষে তাই এমন ধর্ষিত, ক্ষতবিক্ষত দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে রাস্তাঘাটময়।

সেই কামদুনি মামলায় দশ বছর পর রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মামলাটি বিচারাধীন ছিল বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চে। সেখানে নিম্ন আদালতের ফাঁসির সাজা রদ করে সইফুল আলি ও আনসার আলির আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আমিন আলি হাইকোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস পেয়েছে। একইসঙ্গে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত শেখ ইনামুল ইসলাম, আমিনূর ইসলাম, ভোলানাথ নস্করও ১০ হাজার টাকার বন্ডের বিনিময়ে বেকসুর খালাস পায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৩০০ জনেরও বেশি কিশোরীকে ধর্ষণ, খুন! এখনও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সিরিয়াল কিলার

Pedro Lopez Monster of the Andes : এখনও অবধি ৩০০-র কাছাকাছি খুন করেছে সে। এবং এই মুহূর্তে, ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে, পেদ্রো লোপেজ কারাগার থেকে একেবারে মুক্ত।

এমন চরম এবং গুরুতর অপরাধের পরেও কেন ছাড় পেয়ে গেল অপরাধীরা। কেন লঘু শাস্তি দিয়েই দায় ঝাড়ল হাইকোর্ট, প্রশ্ন তুলেছে নির্যাতিতার পরিজনেরা। স্বভাবতই হাইকোর্টের এই রায়ে খুশি নন নির্যাতিতার পরিবার এবং দুই বন্ধু মৌসুমী ও টুম্পা কয়াল। কামদুনির ঘটনার পরে কার্যত প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন ওই দুই কন্যা। রায়ঘোষণার পরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দুই বান্ধবী। মৌসুমী বলে ওঠেন, "টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে রাজ্য সরকারের উকিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের বিচার দিতে পারলেন না।" এদিন রায়ের পর আদালত চত্বরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে মৃতার ভাই। আরেক বান্ধবী টুম্পা জানিয়েছেন, তাঁরা অনেক আশা নিয়ে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দোষীরা শাস্তি পাবেন। তবে তেমন কিছুই হয়নি। হাইকোর্ট থেকে কার্যত খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে কামদুনি নির্যাতিতার পরিবারকে।

এই মামলায় হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তদের অনেকেই সাত থেকে দশ বছর ধরে সংশোধনাগারে রয়েছে। সে কারণেই মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্তদের যাবজ্জীবন ও বাকিদের রেহাই দেওয়া হয়েছে। আর সেই রায় নিয়ে ক্ষুব্ধ নির্যাতিতার স্বজন-বন্ধুবান্ধব। দেশ জুড়ে, রাজ্য জুড়ে যে ভাবে একের পর এক ধর্ষণকাণ্ড ঘটছে, সেখানে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশা করেছিলেন তাঁরা। তবে সেই আশায় জল ঢেলেছে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের রায়ে অবশ্য খুশি নয় রাজ্য সরকারও। রাজ্যের তরফে গোটা বিষয়টি দেখছে সিআইডি। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে বিশেষ একটি দল। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিআইজি স্তরের এক অফিসার। রায় শোনার পরেই সেই দলের তরফে দুই আধিকারিক মৌসুমীর বাড়িতে আসেন। তবে সেই সাক্ষাৎ নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মৌসুমী। জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের কথা বলতেই বাড়িতে সিআইডির লোক পাঠিয়ে দেওয়া হল। দশ বছর আগে যদি সিআইডি আসত, তাহলে অভিযুক্তরা এভাবে ছাড়া পেত না। সব মিলিয়ে দশ বছর পরেও কামদুনির ঘটনায় সুবিচার তো দূরের, স্বস্তিটুকু পেল না নির্যাতিতার পরিবার। মৌসুমীদের কথায় স্পষ্ট, এই রায়ের পর তাঁদের আস্থা উঠেছে রাজ্য সরকারের থেকে। এর আগেও একাধিক বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরাগভঞ্জন হয়েছেন মৌসুমীরা। এমনকী রাগের বশে মৌসুমীদের একবার 'মাওবাদী' পর্যন্ত বলে বসেছিলেন মমতা। মধ্যিখানে আবার বিজেপি শিবিরে যোগ দেওয়ারও গুঞ্জন উঠেছিল তাঁদের ঘিরে। হাইকোর্টের এই রায় কি সেই দূরত্বকেই স্পষ্ট করল ফের! এমনই একগুচ্ছ প্রশ্ন আপাতত ঘুরছে হাওয়ায়।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।