নেতাজি-বিবেকানন্দ থেকে উত্তমকুমার, সকলেরই পছন্দের হোটেল || মুছে গেল একশো বছরের ইতিহাস

‘ডি লা গ্র্যান্ডি মেফেস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক’- এই উল্লাসধ্বনির সঙ্গে আপামর বাঙালি পাঠক পরিচিত। বিকেল নামলেই চাটুজ্জেদের রোয়াকে আড্ডা জমায় টেনিদা, প্যালা, ক্যবালা আর হাবুল। সেখান থেকেই কখনও-সখনও প্যালারামের প্রতি ফরমায়েশ আসে ‘চাচার হোটেল’ থেকে গোটাকয়েক ফাউল কাটলেট নিয়ে আসার। প্যালা ব্যাজার মুখেই তাদের দলের ‘লিডার’ টেনিদার আদেশ পালন করে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা’ সিরিজের নানা গল্পে এমন চিত্রই ধরা পড়ে। একসময় পটলডাঙার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিল ‘চাচার হোটেল’-এর নাম। বিধান সরণির এই দোকানের সামনে দিয়ে বিকেলবেলা গেলেই পাওয়া যেত ফিশ ফ্রাই আর শিককাবাবের গন্ধ। কিন্তু গত ১১ মে শতাব্দীপ্রাচীন এই দোকানের যাত্রাপথ গেল থেমে। পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেল টেনিদা-বর্ণিত সেই ‘গ্রেট চাচা’জ হোটেল।’ কেমন ছিল সেই হোটেলের ইতিহাস? দেখে নেওয়া যাক।

 


১৮৭৫ সালে গোঁসাইদাস পাত্র নামে এক ব্যক্তি উত্তর কলকাতায় বিবেকানন্দর বাড়ির ঠিক পাশে খানিকটা জমি কেনেন। ইতিপূর্বে সেই জমির ওপর ‘চাচা’ নামে এক ব্যক্তির চায়ের দোকান ছিল। ‘চাচা’-র ভালো নাম কেউ জানতেন না। দীর্ঘদিন সেখানে চা বিক্রি করার ফলে এলাকাবাসীর কাছে ‘চাচা’ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। গোঁসাইদাস সেই ‘চাচার চায়ের দোকান’-এর জমি কিনে তার ওপর একটা হোটেল তৈরি করলেন। গোড়ায় সেই হোটেলের কোনও নাম ছিল না। কিন্তু স্থানীয় মানুষজন চাচার নামেই সেই হোটেলের নাম রাখলেন ‘চাচার হোটেল’।

 

 

প্রথমদিকে ‘চাচার হোটেল’-এর মেনুতে ছিল শুধু ফিশ ফ্রাই, ফাউল কাটলেট এবং শিককাবাব। তখন কলকাতায় মুরগির প্রচলন বিশেষ ছিল না। লোকে পাঁঠার মাংসই বেশি খেত। সেই কারণে চাচার হোটেলের কাবাবও তৈরি হত পাঁঠার মাংস দিয়ে। এর পাশাপাশি সেই দোকানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফাউল কাটলেট। এমন জিনিস কলকাতার মানুষ এর আগে খায়নি। ‘চাচার হোটেল’-এর রাঁধুনিদের হাত ধরেই কলকাতায় তার আবির্ভাব ঘটে। কালে কালে এই ফাউল কাটলেটের দৌলতেই ‘চাচার হোটেল'-এর নাম সারা কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ল। বিকেল হতেই রমরমিয়ে ফাউল কাটলেটের বিক্রি শুরু হত সেখানে। মাঝে মধ্যে শিককাবাবের টানে হাজির হতেন খোদ সুভাষচন্দ্র বসু। আরও আগে ‘চাচার হোটেল’-এর নিয়মিত খরিদ্দার ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে স্বামী বিবেকানন্দ।

 

আরও পড়ুন: বাচ্চারা কাঁপত সেই ‘ভূত’ দেখে! কলকাতায় চালু ছিল এইসব আজব খেলা


গোঁসাইদাসের মৃত্যুর পর হোটেলের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর পুত্র রামদাস পাত্রর ওপর। ‘চাচার হোটেল’-এর তখন স্বর্ণযুগ চলছে। মাঝেমধ্যেই শুটিংয়ের পর সেখানে এসে পড়েন ছবি বিশ্বাস বা উত্তম কুমার। বিধানচন্দ্র রায়ও আসতেন কখনও-সখনও। ‘চাচার হোটেল’-এর ‘চিকেন ক্লিয়ার স্যুপ’ তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। পরবর্তীকালে রামদাসের পুত্র প্রদ্যুতকুমার পাত্রর দৌলতে ‘চাচার হোটেল’-এর মেনুতেও আরও কিছু খাবার যুক্ত হল। যদিও, হোটেলের আমুল পরিবর্তন ঘটল তাঁর দুই পুত্র গৌতম এবং অনুজের হাত ধরে।

 



গৌতম এবং অনুজ বুঝেছিলেন, শুধু ফাউল কাটলেট আর ফিশ ফ্রাই বিক্রি করে আজকের বাজারে বেশিদিন ব্যবসা চালানো যাবে না। হাল আমলের হোটেল-রেস্তোরাঁর সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে মেনুতে কিছু বদল ঘটাতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শুরু হল ‘চাচা’জ কেটারিং সার্ভিস। বিয়ে থেকে জন্মদিন, নানা অনুষ্ঠানে এই কেটারিং সার্ভিসের দৌলতে পৌঁছে যেত ‘চাচার হোটেল’-এর সুস্বাদু খাবারদাবার। এছাড়াও গৌতম এবং অনুজ বেশ কিছু থাই এবং চিনা রাঁধুনিকে নিয়ে এলেন তাঁদের দোকানে। তারপর থেকে ‘চাচার হোটেল’ ফাউল কাটলেট এবং ফিশ ফ্রাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চিনা বা থাই খাবারের জন্যেও বিখ্যাত হয়ে উঠল। ২০০৭ সালে ‘চাচার হোটেল’ পাকাপাকিভাবে ঠিকানা বদল করে উঠে এল উল্টোদিকের রাস্তায়। বিবেকানন্দর বাড়ির উল্টোদিকে তৈরি হল তাদের নতুন দোকান।

 


নতুন যুগের ‘মাল্টিকুইজিন’ রেস্তোরাঁর পাশাপাশি চাচার হোটেলের ব্যবসাও চলছিল পুরোদমে, কিন্তু ২০১৮ সালে মৃত্যু হল অনুজবাবুর স্ত্রীর। তাঁর দাদা গৌতমকুমার পাত্রও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনুজবাবুর পুত্র চাকরির সূত্রে বিদেশে থাকেন। বাপ-ঠাকুরদার ব্যবসার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই। সব দিক বিবেচনা করেই অনুজবাবু এবং গৌতমবাবু ‘চাচার হোটেল’ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এক সাক্ষাৎকারে অনুজবাবু জানিয়েছেন, "হোটেল বন্ধ করে দিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমাদের কত আবেগ জড়িয়ে আছে এই হোটেলের সঙ্গে। কিন্তু এছাড়া তো উপায় নেই। আমাদের অবর্তমানে ব্যবসার দেখাশোনা করবে কে?"

 


শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বিধান সরণি দিয়ে যাওয়ার সময়ে ‘চাচার হোটেল’-এর রসুইঘরের সেই ব্যস্ততা চোখে পড়বে না। একশো বছরের পুরনো এই দোকানের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত কলকাতা থেকে ফাউল কাটলেট নামক খাবারটাই লুপ্ত হয়ে যাবে। তবু, যতদিন বাঙালির জীবনে টেনিদা থাকবে, ততদিন গল্পকথার মতো ‘চাচার হোটেল’-ও থেকে যাবে।

More Articles

;