গাছ চেরাই নয়! জানেন, চেনের করাত প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল সন্তানের জন্ম দিতে!

Chainsaw for Child Birth: খানিকটা পেনসিল ছোলার মতো করেই, করাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রোণী অঞ্চল কেটে ফেলতেন ডাক্তাররা।

inscript
৩ মিনিট
গাছ চেরাই নয়! জানেন, চেনের করাত প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল সন্তানের জন্ম দিতে!

নিমেষে বড় বড় গাছ কেটে দু'ফাঁক করে দেয় করাত। যন্ত্রচালিত করাত দিয়ে শক্ত কাঠের গুঁড়ি সহজেই চেরাই হয়ে যায় কারখানাতেও। তবে এই অস্ত্রের বা যন্ত্রের জন্ম কিন্তু গাছ কাটার জন্য নয়। এর প্রাথমিক ব্যবহার জানলে চোখ কপালে উঠবে! গাছেরা নয়, মানুষের জন্যই প্রথম তৈরি হয় চেনের করাত। তবে মানুষ কাটার জন্য না, মানুষকে কোনও শাস্তি দিতেও না। মানুষের জন্ম দিতে প্রথম এই জাতীয় করাতের ব্যবহার! যৌনাঙ্গ থেকে সন্তানকে বের করে আনতেই তৈরি হয়েছিল এই করাত। শুনতে ভয়ানক হলেও, প্রাচীন কালে ঠিক এতখানিই বীভৎস ছিল সন্তান জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি!

চেইনশ বা চেনের করার মূলত সন্তান জন্মদানে সাহায্য করার উপকরণ হিসাবেই তৈরি হয়েছিল। এখন সি-সেকশন করা হয় বটে, তবে আগে সিম্ফিজিওটমি নামে পরিচিত একটি অস্ত্রোপচার ছিল। ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ সেই পদ্ধতি। এই প্রাচীন অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে বাম এবং ডান পেলভিক হাড়ের মধ্যকার তরুণাস্থি কেটে ফেলা হতো, এভাবে পেলভিস বা শ্রোণী অঞ্চলকে প্রশস্ত করা হতো এবং প্রসব ঘটানো হতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টয়লেট পেপার নয়, এক সময়ে ভুট্টাই ছিল মানুষের শৌচাগারের অন্যতম সঙ্গী

Before Toilet Paper: মার্কিনরা নাকি নিজেকে পরিষ্কার রাখার অন্যতর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করত শুকনো ভুট্টার কাণ্ডকে।

কীভাবে সি-সেকশন হতো আগে?

সন্তানের জন্ম দেওয়া আজও সহজ নয়। নানারকমের ঝুঁকি তাতে থাকেই। তবে যত উন্নত হয়েছে অস্ত্রোপচার ও ওষুধপত্র, তত প্রাণ বেঁচেছে জন্মদাত্রীদের। তবে যখন নাইট্রাস অক্সাইড, স্যানিটেশন এবং মরফিনের ব্যবস্থা ছিল না কোনও, পেট চিরে অস্ত্রোপচার ছিল সাংঘাতিক কষ্টের। সফল সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশনের প্রথম লিখিত রেকর্ডটি মেলে ১৫০০-র দশকের সুইজারল্যান্ডে। নিজের স্ত্রীর অপারেশন করেছিলেন এক ব্যক্তি। পেশায় তিনি গরুদের কাস্ট্রেটর! সেই সময়ের খুব সামান্য পাওয়া তথ্য বলে, মা এবং শিশু দু'জনেই বেঁচেছিল। শিশুটি ৭৭ বছর বয়স অবধি বেঁচেও ছিলেন।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সি-সেকশনের ঘটনাটি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। ওয়েস্টার্ন জার্নাল অব মেডিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সের ১৮৩০ সালের সংস্করণে, ডাঃ জন এল রিচমন্ড ঝড়ের সময় এক সন্তানের জন্মের ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। অনেক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করে প্রসব না হওয়ায় চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, ওই মহিলার জীবন গুরুতর বিপদের মুখে রয়েছে। চিকিৎসক প্রচণ্ড ঝুঁকি মাথায় খুব সাধারণ কিছু যন্ত্র নিয়েই সেইদিন রাত্রি প্রায় ১ টা নাগাদ সিজারিয়ান সেকশন শুরু করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যৌনতার খেলনা নয়, উন্মাদনার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো 'রেক্টাল ডাইলেটর'?

Rectal Dilator: রেক্টাল ডাইলেটরের প্যাকেটে বড় বড় করে উল্লেখ করা রইত, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ৮ বছরের কম বয়সের কারও এসব ব্যবহার করা উচিত নয়।

আঁকাবাঁকা কাঁচি নিয়েই চিকিৎসক মায়ের পেট কেটে ফেলেন এবং সন্তান বের করার চেষ্টা করেন। যেহেতু সন্তানের আকার বেশ বড় ছিল এবং মা-ও ছিলেন স্থূলকায় ফলে যতটা সহজে কাজটা হবে ভেবেছিলেন ততটা হলো না মোটেও। অভাবনীয় যন্ত্রণা পেতে থাকলেন ওই মহিলা। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, হয় মা বাঁচবেন না হয় সন্তান! চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিলেন, মা ছাড়া সন্তানের চেয়ে নিঃসন্তান মা কম কষ্ট পাবেন। তাই মাকে বাঁচানোর এবং ভ্রূণটিকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অ্যান্টিসেপটিক এবং অ্যানেস্থেশিয়ার আগে সি-সেকশন ছিল এমনই তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ। তাই খুব একটা অস্ত্রোপচার হতোও না তখন।

কেন চেইনশ তৈরি হয়েছিল?

১৫৯৭ থেকে সি-সেকশন তুলনামূলক নিরাপদ হয়ে উঠল। এর আগে সিম্ফিজিওটমি নামে পরিচিত একটি অস্ত্রোপচার ছিল। এই পদ্ধতিতে পিউবিক সিম্ফিসিস অর্থাৎ ভালভার উপরে তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি জয়েন্ট কেটে ফেলা হতো পেলভিসকে প্রশস্ত করতে এবং প্রসবকে সহজ করতে। প্রবল ঝুঁকি ছিল এতেও। অপারেশনে যত কম সময় লাগবে, রোগীর মারাত্মক সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা তত কম। অনেকক্ষণ ধরে যদি অস্ত্রোপচার চলে তাহলে মুশকিল রোগীকে বাঁচানো।

১৮ শতকের শেষের দিকে, দুই স্কটিশ ডাক্তার, জন আইটকেন এবং জেমস জেফ্রে এই অস্ত্রোপচারের কাজটি আরও দ্রুত এবং দক্ষআবে করার জন্য চেনের করাত বিষয়টি ব্যবহারের কথা ভাবেন প্রথম। বিশ্বের প্রথম চেইনশ ছিল এমন একটি করাত যাতে হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওই ধারালো দাঁতগুলি দিয়ে চেরাই করা হতো। খানিকটা পেনসিল ছোলার মতো করেই, করাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রোণী অঞ্চল কেটে ফেলতেন ডাক্তাররা। বোঝাই যাচ্ছে, সামান্য এদিক-ওদিক হলেই কী মর্মান্তিক হতে পারত পরিণতি। পরবর্তীতে নষ্ট হয়ে যাওয়া অস্থিসন্ধি অপসারণের জন্য ব্যবহার হতো এই করাত। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত এই অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল চিকিৎসা ক্ষেত্রে। তারপর থেকে আর মানুষের দেহ চিরে সন্তানের জন্ম দিতে এই ভয়াবহ করাত ব্যবহার করতেন না চিকিৎসকেরা। মানুষের দেহ থেকে সোজা গাছ চেরাইতে প্রয়োগ হতে থাকল চেইন করাত।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।