মাথার দাম ৪০ লক্ষ! মাওবাদী কমান্ডার হিডমার নাগাল পেতে কেন মরিয়া নিরাপত্তাবাহিনী?

Sukma Maoist Commander Madvi Hidma: দক্ষিণ সুকমা জেলার পুর্ভাতি গ্রামের আদিবাসী সন্তান মাদভি হিডমা আঠারো-উনিশ বছর বয়সেই মাওবাদীদের সঙ্গে জুড়ে যান।

inscript
৪ মিনিট
মাথার দাম ৪০ লক্ষ! মাওবাদী কমান্ডার হিডমার নাগাল পেতে কেন মরিয়া নিরাপত্তাবাহিনী?

ছত্তিশগড়ের সুকমায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নকশাল নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। কিছুদিন আগে বিজাপুর জেলাতেও একটি এনকাউন্টারে তিনজন নকশাল নিহত হন। বছরের গোড়াতেই বাস্তার জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে এনকাউন্টারে পাঁচজন নকশাল নিহত হন। এই ঘটনার পরেই বিজাপুর জেলায় নকশালরা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ব্যবহার করে নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়ি উড়িয়ে দেয়। আটজন ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড (ডিআরজি) কর্মী এবং একজন চালক নিহত হন। ছত্তিশগড়কে মাওবাদীমুক্ত করতে এমন আক্রমণ ও পাল্টা হামলা নতুন নয়। পুলিশ বলছে, মাওবাদীদের দলে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) লাগানোয় একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মহেশ কোরসা। মাওবাদীদের একাধিক হামলায় তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহে একটি এনকাউন্টারে তিনি মারা গেছেন বলে খবর। তাহলে কি মহেশ কোরসাকে হারিয়ে দুর্বল হলো ছত্তিশগড়ের মাওবাদী ব্যাটেলিয়ান? না। কারণ এই সমস্ত ভয়ানক হামলার মূল মাথা এখনও অধরাই।

সাল ২০২১। ছত্তিশগড়ে ভয়াবহ গেরিলা হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ২২জন সদস্য নিহত হন। এর আগে, এরপরে বাস্তার জুড়ে মাওবাদীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও বহুজনই। সরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে বাস্তার এক আতঙ্কেরই নাম! এই অঞ্চল মাওবাদীদের গড়। বহু মাওবাদী নেতাকেই পুলিশ গ্রেফতার করেছে, নির্যাতন করেছে। তবু অধরা রয়ে গেছেন একজন। এই ভয়াবহ আক্রমণগুলির নীল নকশা আঁকেন তিনিই। মাওবাদী কমান্ডার হিডমা, মাদভি হিডমা। ২০১০ সালে দান্তেওয়াড়ায় যে হামলাতে ৭৬জন সিআরপিএফ সদস্য নিহত হন কিংবা ২০১৩ সালে ঝিরামঘাটিতে যে হামলায় ছত্তিশগড়ের প্রায় পুরো কংগ্রেস নেতৃত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সেই দুই হামলাতেও হিডমা নিজে আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। হিসেব বলছে, এখন তার বয়স ৫৫। আদিবাসী কমান্ডার হিডমা গত দু'দশকে এই অঞ্চলে প্রায় তিরিশের কাছাকাছি বড় হামলায় যুক্ত ছিলেন। তবু তাঁর নাগাল মেলে না।

হিডমাকে ধরতে পারার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণাও হয়েছে। কখনও হিডমার মাথার দাম ৭ লক্ষ, কখনও ৪০ লক্ষ! তবু, হিডমাকে পাওয়া যায়নি। পিপলস লিবারেশেন গেরিলা আর্মির এক নম্বর ব্যাটেলিয়নের কমান্ডার মাদভি হিডমা বা 'হিডমালু'-কে ধরতে যে সমস্ত ফাঁদ পাতা হয়েছে, দেখা গেছে তাতে আখেরে প্রাণ গিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মীদেরই। ভুল তথ্য ছড়িয়ে একাধিকবার নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করে পালিয়ে গেছেন হিডমালু। অনেকে এমনও মনে করেন যে, হিডমালু আসলে একটি 'মিথ'! এই নামে কেউ নেই, কেউ ছিলও না! তবে মাদভি হিডমাকে ঘিরে ছত্তিশগড়ে প্রচলিত এমন সব জনশ্রুতির সবটাই যে বিশ্বাসযোগ্য, তা নয়।

পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীবাহিনীর কাছে হিডমা নিষ্ঠুরতার অন্য নাম। জানা যায়, ১৮০ থেকে ২৫০জন বিশ্বাসী ও অনুগত নকশাল গেরিলার সুরক্ষা বলয় হিডমাকে সব সময় ঘিরে থাকে। এই দলের মধ্যে বহু মহিলাও আছেন। বলা হয়, হিডমা সাধারণত সব বড় হামলাই চালান জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে। এই সময় গভীর জঙ্গলে গাছের পাতা ঝরে যায় এবং আড়াল থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি নজর করা ও সেনাকর্মীদের নিশানা করা অনেক সহজ হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বহু সরকারের ঘুম উড়িয়ে এখন নিজেই চিরঘুমে, কে এই মাওবাদী নেতা সন্দীপ

গত কয়েক বছরে সংগঠনের সঙ্গে সন্দীপের মতভেদের খবরও উঠে আসছিল।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ সুকমা জেলার পুর্ভাতি গ্রামের আদিবাসী সন্তান মাদভি হিডমা আঠারো-উনিশ বছর বয়সেই মাওবাদীদের সঙ্গে জুড়ে যান। ২০০৪ চার সালে একটি বড় হামলায় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রথম নজরে আসেন। কেন হিডমাকে ধরা কঠিন? হিডমা দেখতে কেমন, জানেই না ভারতের রক্ষীবাহিনীর নেতৃত্ব! তাদের কাছে হিডমার কোনও সাম্প্রতিক ছবিও নেই। কেবল স্থানীয় বাসিন্দা এবং হিডমার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের স্মৃতি থেকে আঁকা স্কেচ থেকে হিডমালুর উচ্চতা এবং আকার সম্পর্কে অনুমান রয়েছে। AK-47 হাতে হিডমার একটি ছবি এবং একটি ক্লোজ শট রয়েছে ঠিকই, তবে সেটি হিডমার ছোটবেলার।

হিডমা ছিলেন রাভুলা শ্রীনিবাস ওরফে রামান্নার ঘনিষ্ঠ। এই শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে ১৯৮৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাস্তারে ১৫০ জনেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মীকে হত্যার অভিযোগ ছিল। ২০১৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। রামান্নার মৃত্যুর পর, হিডমাকে সিপিআই (মাওবাদী) সংগঠনের কার্যকলাপের, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়। দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটির (ডিকেএসজেডসি) প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন হিডমা।

হিডমাকে গ্রেফতার করাকে আরও কঠিন করে তোলে তাঁর চারপাশে ৫ কিলোমিটার জুড়ে থাকা নিরাপত্তা বলয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে হিডমার নেটওয়ার্ক প্রবল শক্তিশালী। হিডমা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং জঙ্গল সম্পর্কে জানেন। উপরন্তু বহু-স্তরীয় নিরাপত্তা বলয় রয়েছে তাঁর যার কমান্ডোরা সকলেই খুব সুপ্রশিক্ষিত এবং আধুনিক অস্ত্র, গ্রেনেড মজুত আছে তাঁদের কাছে। সমস্ত গ্রামেই হিডমার বিশ্বস্ত মানুষ আছেন যারা নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে তাঁর সহযোগীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেন। হিডমা নিজে সাধারণত গ্রামে আসেন না। হিডমা জঙ্গল যুদ্ধে প্রশিক্ষিত। হিডমা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর নাম সিপিআই (মাওবাদী) সাধারণ সম্পাদক বাসভরাজু এবং অন্যান্যদের মতো কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের থেকেও বেশিই শোনা যায়।

সুকমা, বিজাউর এবং দান্তেওয়াড়ার জঙ্গলের অনেক জায়গায় ফোন নেটওয়ার্কের অভাবকে হিডমা দুর্দান্তভাবে ব্যবহার করেন। পুলিশের দাবি, একবার তাঁরা হিডমার কাছাকাছি এসেছিলেন। ২০১৭ সালের জুন মাসে। ভেজ্জি এবং বুরকাপালে পরপর দু'টি বড় হামলায় ৩৮ জন জওয়ান নিহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনী তখন অপারেশন প্রহার নামে একটি বিশাল যৌথ অভিযান শুরু করে। পুলিশ দাবি করেছে, তখন প্রায় ১৮জন মাওবাদী নিহত হন। হিডমা নাকি তখন গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। তখন এমনটাও রটে যায় যে হিডমা মারা গিয়েছেন। সুকমাতে চলমান অভিযানে হিডমাকে ধরার জন্য আবারও মরিয়া হয়ে পড়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। সমস্ত বলয় দিয়েই হিডমাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা চলছে। এবারও কি ফাঁকি দেবেন হিডমালু? আপাতত নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটিই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।