নববর্ষে মিড ডে মিলে ফ্রায়েড রাইস-চিকেন! বছরের অন্যদিন ধুঁকতে থাকা শিশুদের কী জোটে আসলে?

Poila Boishakh Mid day Meal: সারা বছর সবজি তো দূর অস্ত, খিচুড়িতে সামান্য আলুও থাকে না। পোস্ত নয়, সয়াবিনও নয়, আলুর ঝোল দিয়ে খেতে বসিয়ে দেওয়া হয় বাচ্চাদের।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
নববর্ষে মিড ডে মিলে ফ্রায়েড রাইস-চিকেন! বছরের অন্যদিন ধুঁকতে থাকা শিশুদের কী জোটে আসলে?

একদিন কম্বল বিতরণ, একদিন অকাল বিরিয়ানি, একদিন ক্রিসমাস কেকগুচ্ছ। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এস্মস্ত কাজ করেই থাকে। পরের দিন ওই কম্বলের, ওই বিরিয়ানি খাওয়া মানুষটির, ওই কেক পাওয়া শিশুটির কী খাওয়া জুটল, কী আশ্রয় জুটল তার খোঁজ রাখে না কেউই। সারা বছর কোনওমতে ভাত ডাল খেয়ে বাঁচা মানুষকে একদিনের উৎসব দেওয়ার মধ্যে দায়িত্ব পালন নেই, আছে কেবল সেবার আড়ালে স্বার্থসিদ্ধিই। এই প্রশ্ন নতুন করে উঠছে তৃণমূল সরকারের এক সিদ্ধান্তে। পয়লা বৈশাখে মিড ডে মিলে, স্কুলের শিশুদের 'ভালোমন্দ' খাওয়ানোর নির্দেশিকা দিয়েছিল শিক্ষা দফতর। সোমবার প্রধান শিক্ষকদের স্কুলে স্কুলে বাচ্চাদের মিড-ডে-মিলে পোলাও, ডিমের কারি বা চিকেন কষার মতো ভালো মেনু করার নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার।

রবিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। রবিবার স্কুল ছুটি, তাই নতুন বাংলাবর্ষের প্রথম কর্ম দিবসেই রাজ্যের সমস্ত স্কুলে মিড ডে মিলে পড়ুয়াদের স্পেশাল মেনু খাওয়ানোর নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল জেলা আধিকারিকদের দফতর থেকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই যা নির্দেশিকা আসে তার সবটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন হয় না। জেলা অনুযায়ী, স্কুল অনুযায়ী মেনু বদলেছে। সরকার বলছে, বাঙালির বড় উৎসব নববর্ষের পয়লা দিন সকলেই বাড়িতে ভালো খান, নতুন পোশাক পরেন। তাই স্কুলের পড়ুয়াদেরও সরকারের তরফে ভালো খাওয়ানো হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অপুষ্টিতে ভুগে মরছে লাখো লাখো শিশু, এই ভারত চেয়েছিলেন নেতাজি?

Malnutrition in India: নেতাজি থাকলে দেশ বদলে যেত কী না, দেশে ঘৃণার চাষ আদৌ সম্ভব হতো কী না, দেশের বাচ্চারা না খেতে পেয়ে কাতরাতো কী না সেই তর্ক দেওয়ালে ঘা খেয়ে ফিরে আসে।

খাওয়ানো তো হবেই! শিয়রে লোকসভা ভোটও। বাকি সারাটা বছর সরকারি স্কুলগুলিতে মিডি-ডে-মিলে যাই জুটুক না কেন, সারাবছর যতই মিড-ডে-মিলের চাল-ডিম চুরি যাক না কেন একদিনের 'চ্যারিটি' দিয়ে ভোটের আগে সরকারের জনকল্যাণকে প্রচারের সুযোগ কোন শাসকই বা ছাড়ে। মূল শহরের স্কুলগুলির কথা যদি বাদও থাকে, প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলিতে মিড-ডে-মিলে কী দেওয়া হয়? তার আগে জানা যাক, মিড-ডে-মিলে বাচ্চা প্রতি বরাদ্দ কত টাকা?

মিড ডে মিল প্রকল কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলে চালায়। খরচের কেন্দ্র রাজ্য অনুপাত হচ্ছে ৬০ঃ৪০। মিড-ডে মিলে প্রাথমিকে পড়ুয়া পিছু বরাদ্দ হচ্ছে ৫ তাকা ৪৫ পয়সা। এই টাকার মধ্যে কেন্দ্র দেয় ৩ টাকা ২৭ পয়সা আর রাজ্য দেয় বাকি ২ টাকা ১৮ পয়সা। উচ্চপ্রাথমিকের ক্ষেত্রে এই মোট বরাদ্দ ৮ টাকা ১৭ পয়সা। এই বাজারে কোন সবজি, কোন ডাল, কোন ডিম এই টাকায় হয়? এই হিসেব শুনে শিশুও গড়াগড়ি দেবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মিডডে মিলে মাংস বাদ, শিশুর পাতে নেই দুধটুকুও! কোন পথে আসছে দেশে 'অচ্ছে দিন'?

Midday Meals: শুধুমাত্র যে প্রোটিনেরই উৎস দুধ, তা তো নয়। একই সঙ্গে ক্যালশিয়াম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি ১২, রাইবোফ্লাভিন, পটাসিয়াম, ফসফরাস, সেলেনিয়ামের মতো একগুচ্ছ উপাদান রয়েছে দুধে। যা শিশু বিকাশের জন্য় ভীষণ ভাবে প্রয়োজনীয়।

কোনও প্রাথমিক স্কুলে ১০০ জন পড়ুয়া থাকলে রোজ মিড-ডে মিল খাওয়াতে কম করে ৮০০ গ্রাম ডাল লাগে। দাম ১০০ টাকার বেশি। আনাজপাতি পেজ ৪ কিলো। ঋতুভেদে যার খরচ কম করে ১৫০ টাকা। ৫-৬ কেজি আলু কিনতেই ১২০ টাকার বেশি লাগে। এর উপর তেল-মশলা-হলুদ-নুন, আদা-রসুনে খরচ প্রায় ১০০ টাকা। গ্যাসও খরচ হয় ১৫০-১৬০ টাকার। সরকার থেকে রন্ধনকর্মীর খরচ মাসে মাত্র ১৫০০ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলে প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ৬০০ টাকা।

সরকার বলেছে নববর্ষ উপলক্ষ্যে কলকাতা জেলার ক্ষেত্রে স্পেশাল মেনুতে থাকবে ফ্রায়েড রাইস, ডিমের কারি, আলুর দম, সঙ্গে রসগোল্লা। বাকি জেলাগুলির ক্ষেত্রে ডিমের কারি বা চিকেন। এই স্পেশ্যাল মেনুর খরচ জোগাবে কে? সারা রাজ্যে এক কোটিরও বেশি পড়ুয়া আছে প্রাথমিকে। আধিকারিকরা বলছেন অতিরিক্ত যে খরচ হবে তা ‘মিসলেনিয়াস ম্যানেজমেন্ট ইভোলিউশন কস্ট’-এ স্কুলগুলিকে দিয়ে দেওয়া হবে। বাস্তব বলছে, এখনও এমন বহু স্কুল রয়েছে যেখানে শিক্ষকরা নিজেদের বেতন থেকে টাকা দিয়ে পড়ুয়াদের একদিন একটু ভালো খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সরকারের একদিনের এই এলাহি খাওনদাওনের পর বছরের বাকিদিন শিশুরা প্রকৃত পুষ্টি পাচ্ছে কিনা তা কে দেখবে খতিয়ে?

সরকারের নির্দেশিকা আছে, সপ্তাহের প্রথম দিন মিড-ডে-মিলে সবজি দেওয়া খিচুড়ি ও চাটনি খাওয়ানো হবে। এছাড়াও ভাত, মুসুর ডাল, সোয়াবিন ও আলুর তরকারিও থাকবে। দ্বিতীয় দিনে ভাত, মুসুর ডাল ও মরশুমি সবজি। তৃতীয় দিনে ভাত, ডিম ও আলুর কারি। চতুর্থ দিনে ভাত, মুসুর ডাল, পোস্ত। পঞ্চম দিনে ভাত, মুসুর ডাল, সোয়াবিন আলুর তরকারি এবং ষষ্ঠ দিনে ভাত, মুসুর ডাল, ডিম সেদ্ধ। এছাড়া, স্পেশ্যাল মেনু হিসেবে বিভিন্ন স্কুল নিজেদের উদ্যোগে মাসে অন্তত একদিন মাছ ও মাংস খাওয়াবে বাচ্চাদের।

৫ টাকা ৪৫ পয়সায় পোস্ত, মুসুর ডাল! রাজ্যের গ্রাম তথা প্রান্তিক এলাকার স্কুলগুলিতে গেলে মিড-ডে-মিলের প্রকৃত চেহারা স্পষ্ট হয়ে যাবে। সবজি তো দূর অস্ত, খিচুড়িতে সামান্য আলুও থাকে না। পোস্ত নয়, সয়াবিনও নয়, আলুর ঝোল দিয়ে খেতে বসিয়ে দেওয়া হয় বাচ্চাদের। মুসুর ডালে ডাল নয়, হলুদ গোলা জল থাকে। তাতে একজন বাড়ন্ত শিশু কী পুষ্টি পায় এই আলোচনা গ্লানি বাড়াবে আরও। সরকার একদিন পোলাও-চিকেন খাইয়ে ভোট পেতে পারে ঠিকই, তবে 'চ্যারিটি'-র নামে আসলে কোটি কোটি শিশুকে ঠকানো তাতে বন্ধ হয়ে যায় না।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।