রণক্ষেত্রে যেমন করে দিন কাটছে ইজরায়েলের বাসিন্দা ও অভিবাসীদের

Israel Palestine Conflict: রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়াদের প্রাণ যাওয়াটাই দস্তুর। আগেও সেই লড়াইয়ে প্রাণ গিয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ বাসিন্দার। সাম্প্রতিক এই লড়াইয়ে ফের সবচেয়ে বড় বলি তাঁরাই।

Sohini Das
৩ মিনিট
রণক্ষেত্রে যেমন করে দিন কাটছে ইজরায়েলের বাসিন্দা ও অভিবাসীদের

তখনও ভালো করে ঘুম ভাঙেনি শহরটার। সকাল হতে না হতে ফের বেজে উঠল সাইরেন। ততক্ষণে বাসিন্দা থেকে অভিবাসী, সকলেই জানেন, সাইরেন বাজলে কোথায় গিয়ে মাথা গুঁজতে হয়। প্রাণপনে সেদিকে ছুট লাগাচ্ছেন বাসিন্দারা। আতঙ্কে সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। ৭ তারিখ সকাল সাতটা থেকে ধেয়ে আসতে থাকে শহরটার দিকে একের পর এক রকেট। যাকে আটকাতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে সমস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ব্যর্থ হয়েছে আয়রন ডোম। তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেশের এদিক-ওদিক দিয়ে ঢুকতে শুরু করে হামাস জঙ্গিরা। নির্বিচারে চালাতে থাকে গুলি। পথে জমতে থাকে লাশ। তার পরেও যারা হামাসদের গুলি বোমা বা অপহরণের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে, তাঁদের জন্য এখন প্রতিটা সকাল এখন নতুন লড়াই। বেঁচে থাকার লড়াই।

ঘুমচোখেই সেদিন দৌড়তে শুরু করেছিলেন তাঁরা আশ্রয়গুলির দিকে। আদৌ আপনি বাঁচবেন না যে কোনও মুহূর্তে আপনাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে চলে যাবে কোনও রকেট বা ধেয়ে আসা গুলি, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আপনার অবস্থানের উপরে। কোথায় থাকেন আপনি! ইজরায়েল-গাজা সীমান্তের যত কাছে আপনি, আপনার মৃত্যুভয় তত বেশি। তত রকেট ধেয়ে আসার ভয়। যে কোনও সময় হামাস জঙ্গিদের দল এসে যে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে না বা পণবন্দি করে রাখবে না, গুলিতে বুক চিরে দেবে না, সেই নিশ্চয়তা ঠিক ততটাই কম।

ইজরায়েলের ওয়েইজমান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে কাজ করেন ভারতের বাসিন্দা রাহুল (নাম পরিবর্তিত)। থাকেন রেহভট এলাকায়। গাজা সীমান্ত থেকে যার দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার। ক্ষণে ক্ষণে সাইরেন বেজে উঠছে। এ সাইরেনের শব্দই যেন মৃত্যুভয়কে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। প্রতিটা সাইরেন বেজে বেজে যেন বলে চলেছে, হাতে সময় নেই। প্রাণ রাখতে হলে ছুটতে হবে, প্রাণপন ছুটতে হবে। তখনও কি জানতেন রাহুলরা যে আর কিছুক্ষণের মধ্যে সেই এলাকাটাই রূপ নেবে ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্রের। বিস্ফোরণের ধোঁয়ার ঢাকবে আকাশ। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে মৃতদেহের ভিড়। কোনও মতে টিকে গিয়েছেন রাহুল, আর রাহুলের মতো জনাকয়েক ভাগ্যবান। কিন্তু সেই ভাগ্য কতক্ষণ সঙ্গ দেবে বলা কঠিন। ইতিমধ্যেই ইজরায়েলে মৃতের সংখ্যা আটশো ছাড়িয়েছে। আর সে কথা তো বলছে সরকারি হিসেব। বেসরকারি হিসেবে সেই মৃত্য়ুর সংখ্যা যে কত, তা বলা কঠিন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বন্ধ বিদ্যুৎ, জল, নির্বিচারে মরছে শিশুরা! প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের পাল্টা হামলার ফল কী?

Israel Palestine War : এর আগে যত হামলা হয়েছে, তাতে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী নিয়মিত একটি কৌশল ব্যবহার করত। একে ইজরায়েল বলে ‘রুফ নকিং’।

শনিবারের শান্ত সকালের বুক চিরে নেমে এসেছিল রকেট। রাহুল যেখানে থাকেন, তার চেয়ে এক কিলোমিটারও নয় জায়গাটা। মুহূর্তে উড়ে যায় একটা গাড়ি। অল্পের জন্য প্রাণ যায়নি কারওর। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাহুল কাজ করেন, তাকে এখন দেখে কলেজ ভাবতে কষ্ট হয়। এই মৃত্যুর উপত্যকা দেখে শিউড়ে উঠছেন বাসিন্দারা।

এখনও পর্যন্ত খাবারদাবার, প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যাচ্ছে ইজরায়েলে। কিন্তু কতদিন! সকলেই জানে, দু'দেশের যুদ্ধ মানেই খাবার-দাবার শস্যে টান, ক্রমে দুর্ভীক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আর সেদিকেই ক্রমশ হাঁটছে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফে সতর্ক করা হয়েছে, এই যুদ্ধে খাদ্যসমস্যার মুখে পড়তে পারে দেশ। শনিবার প্যালেস্টাইন থেকে ধেয়ে আসা আঘাতের প্রত্যুত্তরে অস্ত্র শানিয়েছে ইজরায়েলও। ইতিমধ্যেই গাজায় আকাশপথে হামলা করেছে নেতানিয়াহুর সেনা। এদিকে হামাস সেনা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেথেছে, ইজরায়েলের দিক থেকে একটাও রকেট প্যালেস্টাইনের দিকে গেলে সমস্ত বন্দিদের ধরে ধরে হত্যা করবে তারা। বন্দি হত্যা কি করেনি তারা! একাধিক ভিডিও, ছবিতে দেখা যাচ্ছে লাশের পাহাড়। রাস্তায় কাগজের খোলার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মৃতদেহ। পাশে হামাস সেনার উল্লাস।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নকল বাসিন্দা সাজিয়ে সীমান্তে হত্যার মহড়া! যে ভাবে তিলে তিলে ইজরায়েলে হামলার ছক কষে হামাস

Israel-Palestine conflict: অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর রকেট দিয়ে হামলা চালানো হলে একসঙ্গে এতগুলো লক্ষ্যবস্তুকে আটকাতে পারবে না আয়রন ডোম। সে কারণেই আঁটঘাট বেঁধেই ৫ হাজার রকেট নিয়ে হামলা চালানো হয় আকাশপথে।

আশার কথা একটাই, ইজরায়েল তার ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্র ফেরৎ পেয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আর কোনও নতুন করে অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা নেই। তবে হামাস যেভাবে শনিবার ঢুকেছিল ইজরায়েলে, তাতে পুরোপুরি নিশ্চিন্তও হতে পারছে না দেশের বাসিন্দারা। ফলে এখনও তাঁরা ভয়ঙ্কর রকমের আতঙ্কিত। ভয়াবহ যুদ্ধের ভয়, প্রাণ যাওয়ার ভয়, গৃহহীন হওয়ার ভয়, শরণার্থী হয়ে যাওয়ার ভয়, সমস্ত রকম ত্রাস সব দিক থেকে চেপে ধরেছে তাঁদের।

এদিকে, সময় যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে ইজরায়েলের তরফে প্যালেস্টাইনে আঘাত হানার সম্ভাবনা। জানা গিয়েছে, গাজা উপত্যকায় টানা অভিযান চালাতে পারে ইজরায়েলি সেনা। এদিকে, ইজরায়েল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু অভিবাসীরা। পড়াশোনার জন্যে, কেউ চাকরিবাকরির কারণে সেখানে থাকেন। বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপদে পড়েছেন তাঁরাও। সেইসব অভিবাসীদের মধ্যে রয়েছে রাহুলের মতোই বহু ভারতীয়ই। ইতিমধ্যেই ভারতীয় দূতাবাসের তরফে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কীভাবে তাঁদের নিরাপদে দেশে ফেরানো যায়, শুরু হয়েছে সেই চেষ্টাও।

ভূখণ্ডের এই লড়াই বহুদিনের। আগেও সেই লড়াইয়ে প্রাণ গিয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ বাসিন্দার। সাম্প্রতিক এই লড়াইয়ে ফের সবচেয়ে বড় বলি তাঁরাই। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়াদের প্রাণ যাওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু কতদিন! কতদিন কোলাটেরাল ড্যামেজের নামে চলবে এই ধ্বংসলীলা। যারা রাষ্ট্রের প্রধান, তাঁদের শরীরে এইসব যুদ্ধের আঁচটুকু লাগে না। মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে খামোখা মরে যায় আম আদমিরা। ভূখণ্ড পাল্টায়, যুদ্ধের কারণ বদলায়, রাষ্ট্রনেতা পাল্টায়। কিন্তু মরার জন্য সফট টার্গেট-রা কিন্তু পাল্টায় না কোনও খানেই। আর এই বীজসত্য জেনেই অস্ত্র তুলে নেন দেশের মাথারা। কারণ তারা জানেন, বড় বড় যুদ্ধে এমন সব ছোটখাটো বলিদান দিতেই হয়। ওই যাকে বলে কোলাটেরিয়াল ড্যামেজ আর কী!

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।