আষাঢ়ের মেঘ আর সরষে বাটা দিয়ে খয়রার ঝাল

আষাঢ়ের মেঘের ছায়ায় এখন সকালগুলো নরম। ভোর ভোর তেতেপুড়ে ওঠার পালা ফুরিয়েছে। এখন কেবল শান্ত, সবুজ নীরবতায় ডুবে যাওয়ার আয়োজন। এমন ভোরে ওই দূর থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান। সেই আজান পিছনে ফেলে মানুষ বীজতলা কাদা করে, বিছন রোদে মেলে দেয়, কেউ বা আবার কুলোয় করে বীজধানে পাছুড়ি দেয়। কী আশ্চজ্যি দেখো! আকাশের জল দু'-ফোঁটা পড়তে পেরেছে কি পারেনি, চারিদিক কেমন নরম হয়ে উঠেছে। ঘরে ঘরে এখন চাষের কথা। উনোনের কাঠকুটা শুকনো পাতা, দড়িদড়ায় বেঁধে, বুস্তায় ভরে সক্কলে দেখো কেমন তুলে রেখেছে ওই! সংসারের নিয়মই এই গো। যারে রাখো সেই থাকে। বর্ষার দিনে উনোন ধরানো কি সহজ গো? না না, সে আরেক ঝক্কি! শাউড়ি তো তাই ওই বারেন্দার একধারে আরেকখান তোলা উনোনের ব্যবস্থা করেছেন। তোলা উনোন মানে গ্যাসের চুলা। দরকারে-অদরকারে ওই চুলা ধরিয়ে রঙ চা হয়, খোকার সুজি জ্বাল দেওয়া হয়। তা বাদে ওই গ্যাস-চুলা কাঁথা-কানি দিয়ে ঢেকেঢুকেই রাখা থাকে একটেড়ে। মানষের জেবনে আর ভাঁড়ার ঘর কোথায় বলো!

চৈকির নিচে, তক্তাপোষের তলে পেলাস্টিকের ডেরামভরে চাল, মুড়ি, আটা সুজি ভরে ভরে রেখে দেছে দ্যাখো ওই। গেল হাটে সেই সেবারে পাইকারি রেটে আলু কিনে নেছে বড় ব্যাটায়। বাইরের ঘরের তক্তাপোষের তলে সে আলু কেমন নিশ্চিন্দি হয়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে দ্যাখো। এই আম-কাঁঠালের দিনে মানুষ আলুটা-মুলোটা কম খায়। সকাল সকাল এই মেঘের সকালে শরীর একেকদিন ম্যাজম্যাজ করতে লাগে। মায়ে তখন বাসি ভাতে মরিচ আর রসুন-পোড়া তেল দে মেখে দেয়। বড় ব্যাটার বউ অল্প করে খানিক কালোজিরা বেটে দেয়, পুঁটির শুঁটকি পুড়িয়ে দেয় ঘুঁটের আঁচে। ব্যাটায় বসে বসে এক সানকি ভাত ওই দিয়েই খেয়ে নেয়। তা খাবে না কেন! মাঠের কাজে খাটনি কত বলো! ভাতের তুল্য কিছু নাই, কিছু নাই। মাইনষের জেবনে ওই তিনবেলায় ভাতটুকুই সার গো, আর আছেই বা কী!

ম্যাজম্যাজে শরীর নিয়ে বড় ব্যাটায় চলে যাচ্ছে ওই। মেজ আর ছোটও যাবে এখন। তবে তাদের অত ভাতের খিদা নেই। সে খাবে এখন মুড়ি দিয়ে গোটা মুসুরিসেদ্ধ। সকাল সকাল এ সংসারের ঊনকোটি কাজে এত কি খেয়াল থাকে বাপু! তা মেজখুড়ি তো বলছিল, মেজ ব্যাটার বিয়ে দাও, খানিক শরীরের সুখ করো, হাত জুড়োক তোমার। মেয়েও দেখাশোনা চলছে। তা সে দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। দানের বাসনে ক'খান বগি থালা চেয়ে নেবে এখন। এসব ভাবে মেজ ব্যাটার মায়ে। ভাবতে ভাবতে বেলা গড়িয়ে যায়।

আরও পড়ুন: না-গঙ্গার দেশে ভাতের পাতে মেঘের ছায়া

সাইকেলের ঘন্টি বাজিয়ে কলকেতা শওরের মতো এখানেও মাছ বিক্কিরি করতে আসে, সওজি বিক্কিরি করতে আসে আজকাল। তা সস্তা দেখে খানিক খয়রা মাছ কেনা হয়েছে আজ। এই ছোট ছোট মাছ, তা দু'ফোঁটা জল পড়তে পারেনি গায়ে তেল জমতে শুরু করে দেছে। বউ বসেছে মাছ কুটতে। ছাই আর বঁটি নিয়ে ওই কলতলার ওধারে। মায়ে চলেছে খানিক শাক তুলতে। মজাপুকুরের পাড় জুড়ে গিমে শাক ভরে আছে ওই। বুড়ি এখন কোঁচড় ভরে গিমে শাক তুলবে। বড় ব্যাটার জ্বরমুখে খানিক তেতো খেলে স্বাদ খুলবে। এসব ভাবতে ভাবতে শাক তুলে ফিরছিল বুড়ি। ও মা, এর মধ্যি আবার ঘ্যাটকোল মাথা তুলল কবে? বুড়ি খানিক ঘ্যাটকোল তুলে কোঁচড়ে বাঁধল তাই। ঘরে ফিরতে ফিরতে একবার এদিক-সেদিক দেখে নিল, নাহ, এখনও পাতাল ফোঁড় ওঠেনি। বউমায় যা রান্ধে! আহা! এই বয়সেও বুড়ির নোলা কমেনি। লোকে এমন করে নিন্দে করে এদিক-সেদিকে। বুড়ি এসব শুনেও শোনে না। জেবন যখন দেছেন ভগবান, তখন সে জেবন ভোগ করবোনি! কই আমার ব্যাটা, আমার বউ তো কিছু বলে না! তোদের এত জ্বালা কীসের?

কই গো বউ, মাছ কোটা হলো? এমন তেল টুসটুসে খয়রার ঝাল খেতে মন যায় বুড়ির। বুড়ির বউ জানে সেসব। বলে, সরষেবাটায় খয়রার ঝাল করি মা? বলে, আর উত্তরের অপেক্ষা করে না বউ। শিল পেতে সরষে বাটে। দু'-একখানা মোটা মোটা বুলেট মরিচও ওতে পিষে নেয় বউ। আহা, এমন মরিচের গন্ধে বর্ষার সকালে বুড়ির জেবন ভরে ওঠে। জেবনের ধর্মই তো এই, সে তো ভরেই উঠতে চায় নদী-নালা, খাল-বিলের মতো। বুড়ো যদ্দিন বেঁচে ছিল, এমন মেঘের দিনে খ্যাপলা জাল হাতে এদিক-সেদিক চলে যেত। মাছ না হলি বুড়োর হবেই না! খলসে, ল্যাটা, শোল, শাল যেদিন যা পাবে। সেদিন তো আর নেই! ব্যাটারা এখন খ্যাপলা জাল দে মাছ ধরতে যাবে না মোটেও। তোলা জলে চানের মতো এখন তাই সাইকেলে সাইকেলে মাছের বেসাতি। এসব ভাবলে মানুষের দুস্কু হয় না! বলো তোমরা?

বুড়ো কেমন ড্যাংড্যাং করে সগ্গে চলে গেল বুড়িরে ফেলে। তা সগ্গে কে আর খয়রার ঝাল রেঁধে দেয় বুড়োরে। এসব ভাবলে খানিক দুঃখ বেড়ে যায় বুড়ির। বুড়ি তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বুড়োর কথা ভাবে। বউ বলে, খানিক চা খাবেন মা? মা মাথা নেড়ে সাড়া দেয়। ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে রেখে রং চা ফুটিয়ে নেয় বউ। ফুঁ দিতে দিতে বুড়ি চা খায়। খাওয়া হলে খিড়কির পুকুরে দুটো ডুব দিয়ে আসে। ব্যাটারা সব খেলে পর বুড়ি খাবে, কিছুতেই আগে খাবে না সে। বুড়ি আর বুড়ির বউ খেতে বসেছে ওই। ওদের পিঠের ওপারে মেঘের ছায়া পড়েছে দ্যাখো কেমন।

গিমে শাকের বাটিচচ্চড়ি, ঘ্যাটকোল পাতা বাটা আর খয়রার ঝাল, এই তো আজকের রান্না। কড়কড়া স্বর্ণ চালের ভাতে টুকুনখানিক ঘ্যাটকোল বাটা মেখে নিয়েছে বুড়ি। নাক টানতে টানতে গরাস তুলছে এক মনে। খয়রার ঝালে ফালি ফালি করে মরিচ দেছে বউ। বুড়ি মাছের একদিক ভেঙে মাছ মেখে নিতে নিতে কাপড়ের খুঁট দে চোখ মুচছে কেবল। পাতের একধারে টুকুনখানিক মাছ রেখে দেছে বুড়ি। বুড়োরে আর কে আর সগ্গে মাছ রেঁধে দেয় বলো! নুয়ে পড়া পিঠে খয়রার ঝাল দে ভাত খাচ্ছে বুড়ি। দাওয়ার পাশটিতে পয়লা আষাঢ়ের মেঘ নামছে নরম হয়ে। ইস্, মল্লিনাথের সঙ্গে আমাদের বুড়ির যদি দেখা হয়ে যেত! নাহ্, সে তো হওয়ার নয়! তার চেয়ে বুড়ি বরং ভাত খাক মরিচ ডলে ডলে।

More Articles

;