লীলাবতী, কালো বিড়াল আর জামাইষষ্ঠীর হাট

অরণ্যষষ্ঠীর গপ্পের চেয়ে ঢের বেশি কাব্যময় এই জামাইষষ্ঠীর হাটফেরতা বাজারের থলে।

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
লীলাবতী, কালো বিড়াল আর জামাইষষ্ঠীর হাট

কই গো? আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম সব পাকল? না পাকবেনি! এই জষ্টির গরমে খাঁজা কাঁঠালখানা পেকে একেবেরে টুসটুস কচ্চে গো! মেয়ে-জামাই আসবে বলি জাঁক দে রেকেছিলুম, তা দেখি কিনা দারুণ পাকা পেকেচে। তা ওর মায়ে বলল, গাচের আমে হবেনি, ও তো এমনি আম! তুমি হাটের তে ভালো দেকে এক দুই কেজি হিমসাগর নে আসো দেকি! তাই চলেছি আর কী। এইসব হাটুরে কথা এ-পথ ধরে চলেছে ওই আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে, মদনাতলার হাটের দিকে। এই গাঁয়ে হাট বসে মঙ্গল আর শনি।

তা বললে বিশ্বেস যাবি নে, আজ হাটে একেবারে লোক উবজে পড়েছে। তা পড়বেনি কেন বলো! জামাইষষ্ঠী বলি কতা, এ কি দুগ্গাপুজোর চে কম হলো! দুগ্গাপুজোয় মেয়ে আসে বাপের বাড়ি, তা সেকেনে মহাদেবের না এলেও ক্ষেতি নাই। কিন্তু এ বাপু তোমরা অরণ্যষষ্ঠী বলো আর যাই বলো, ওই জামাই না এলে এ পুজো অন্দকার। জামাইরে খুশি কত্তে তাই চেষ্টার কসুর কোরোনি বাপ। এসব কইতে কইতে হাটুরে মানুষ চলেছে ওই, ওই যে আঁকাবাঁকা পথ! ও পথ ধরে চলতে চলতে এসব ছেঁদো গপ্প করতে হয় বইকি।

মেয়ের মায়ে কয়ে দিছে, মেয়ের বাপে তাই মনে মনে ফর্দ মিলিয়ে থলে ফাঁক করে হাট কত্তে চলেছে ওই। ফলপাকুড় কেনা হলি 'পর বেছে বেছে বেলডাঙার লঙ্কা কিনতি হবে, বালির পটল কিনতি হবে, 'ঝর্ণা ঘি' কিনতি হবে। তা কেনার কি শেষ আছে রে বাপু! ভাতের পাতে একটু ঘি না দিলি কি চলে! পেরথম পাতে তেতো দিতি হবে, তার গায়ে গায়ে ভাজা মুকির ডাল, ভাজা, একটা মাখো মাখো তরকারি, তা ধরো চিংড়ি দে পটল কি এঁচোড়! তাপ্পর ধরো, একখান মাছের তরকারি, মাংস, চান্নি, দই, মিষ্টি। আবার তা বাদে সকালের জলখাবার আচে। হুজ্জুত কম না! দেশ-গাঁয়ে চাইলেই কি আর এটা-সেটা মেলে? এ তোমার কলকেতা শহর নয় বাপু, যে চাইলেই তোমার কোলের কাছে কোলে মার্কেট উবজে হাজির হয়ে যাবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চড়া রোদ্দুরে ছাতা মাথায় ফসল তোলার মরশুম আর বিকেলের মুড়ি-মিঠাই

এমন রোদ্দুর কেউ হাতছাড়া করে না গাঁয়ে-গঞ্জে। কেউ পায়ে ঠেলে-ঠেলে সেদ্ধ ধান রোদ খাওয়াচ্ছে, কেউ আবার কুলো ভরে ভরে কাঁঠালের বীজ শুকুতে দেচ্ছে।

তা গেলবারেই তো, জামাইষষ্ঠীর দিনে রাসুর দোকানে ছাগল কাটা হলো। তা সেকেন তে কেনা হলো খানিক। জামাইরা খেতে বসে বলল, এ মাংস খাওয়া যাচ্ছেনি মোটে। এ ছাগলে কেমন দুধে গন্ধ। এবারে তাই মুরগিই হবে। একটা মাংস ধরে না দিলি কি আর মান থাকে? মেয়ের মায়ে তো বলেই খালাস! বাপেই জানে এ বাজারে হাট কত্তি কী ঝক্কি! তা হাট করলিই তো আর জোগাড়ের শেষ নাই! বরণডালার খেজুর ছড়া, করমচা- সব জোগাড় করাই কি সহজ! সেই দেশ-গাঁ কি আর আচে যে, হাত বাড়ালেই তুমি ফলটা, পাকুড়টা হাতের কাচে প্যে যাবে! তবু, জোগাড় না করে উপায় নেই গো! বচ্ছরকার দিনে, মা ষষ্ঠীর কৃপেয় সব ভালো থাক বাছারা, এইটুকুই না চাওয়া! সায়বেনের ছোটো বউয়ের গপ্প শুনেচিস তো! অমন নোলা মেয়েমানুষের হতে নেই কো। পেরসাদের খাবার খেয়ে বলে কিনা কালো বিড়েলে খেয়েচে! আর সেই সপ্তগেরামের রানি! তিনি তো আবার ষষ্ঠীর দিনে ভাত দে মাছপোড়া খেতি লেগেচিলেন! তা ধম্মে সইবে কেন! মা ষষ্ঠীর কানে সে খবর কি যায়নি ভেবেচিস! লীলেবতি সবই দ্যাকেন যে!

এসব তোরা বিশ্বেস যাবি নে, তো যাস নে। ছেলেপুলা নিয়ে ঘর কত্তি গেলে এসব পালতে হয়, জানলু?

ঠাক্‌মার এসব কিস্‌সায় এ-বাড়ির কারও কিছু এসে যায় না, বুড়ি তাও গজর গজর করতিই আচে। ছেলে কয়, ও মা! খানিক চুপ যাও না! বুড়ি তাই চুবড়ি হাতে ওদিকপানে হাঁটা লাগায়। বুড়ির এই এক নেশা, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে এটা-সেটায় চুবড়ি ভরে তুলবে। দুটো কুড়িয়ে পাওয়া আম, পাঁচটা খেজুর, গুটিকয় কাজুবাদামের রাঙা টুকটুকে ফল- এই হলো বুড়ির সাধন ধন। বুড়ির ছেলে, বউ, নাতি-পুতিদের সেসব দেখার ফুরসত নেই বাপু।

অরণ্যষষ্ঠীর গপ্পের চেয়ে ঢের বেশি কাব্যময় এই জামাইষষ্ঠীর হাটফেরতা বাজারের থলে। থলে উপুড় করে মেয়ের মায়ে ফর্দ মেলাতি বসেচে। বাপে হাতপাকাখানা নাড়তি নাড়তি বলতেছে, তোমার মাছ, মাংস ক'খান কাল বিহানবেলায় এনে দেব, জানলে? তা ওদের আসতি তো সেই আটটা বাজবিই! মিষ্টি ক'খান দিতি হবে তাই কও। জামাইরে কি পাঁচখান মিষ্টি না দিলি হয়! তা সেজজামাই এবারে আসতি পারবে না, তাও বড় আর মেজোরে তো থাল ধরি দিতি হবে! তারাও তো শাউরিরে একখান কাপড় দেবে নিয্যস। এইটুকুন না করলি মান থাকে না কো। মেয়েও কি তোমার চায় না, তার সোয়ামিরে বাপে, মায়ে যত্ন করি ভাত বেড়ে দিক, ডাল বেড়ে দিক? চায় তো! বড় মেয়ে তো বলেই দেছে, বাবা তোমার জামাই কিন্তু দিশি মুরগি ভালবাসে। এবারে মেয়ের বাপে তাই বলাইরে বলেই রখেচে, একখান বড় দেখে মোরগ ধরে রাখিস বাপ। বিকেল বিকেল মোরগখান নে আসতে হবে আজই। সে মোরগ লম্বা পা ফেলে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে চাইবে আর দড়ির টানে কেমন আটকা পড়বে! ওহ্‌, কাল কুসির মায়েরে বলবে 'খন ভালো করে চুইঝাল দে মোরগের গরগরে ঝোল রানতে। কুসির মায়ে যদি না পারে 'খন, তো বাপে নিজেই রানবে। পুরুষমানুষ কিছু পারুক না পারুক, মাংস রানতে ওস্তাদ। সে তোমাদের মতো গিন্নিবান্নিদের বলে বলে গোল দেবে।

তা কুসির মায়ে এসব শুনে খানিক বড় বড় নিঃশ্বেস ফেলে আর আলু-পটল ধুয়ে ধুয়ে জল ঝরতি দেয়। এমনিতেই ষষ্ঠীর উপোস করে শরীর আর দেয় না, তবু জামাইরা খাবে, মেয়েরা খাবে, না রানলেও চলে না। কুসির ঠাক্‌মার আর কী! পাকা আম আর দুব্বোর আঁটি হাতপাখায় বেঁধে সক্কাল সক্কাল বিষ্টুদের পুকুরে তিনটে ডুব দে আসবেন 'খন। তারপর সারাদিন পাখার বাতাস। এই তো বুড়ির জেবন! ওই যে আসছেন তিনি। এসেই বকর বকর শুরু করবে এখন। বলবে, বউ জানলি, বাছাদের কখনও কসনি যেন– দূর হ্‌, মরে যা, বিদেয় হ। জানলি বউ? জানলি? পাড়ার বাচ্চাগুলোও হয়েছে এখন। বুড়িরে ঘিরে ধরেছে ওই। বুড়ির চুবড়ি ধরে টানাটানি করতি লেগেচে। কেউ বলচে, ঠাক্‌মা আম দে না। কেউ বলচে ক'খান খেজুর পেয়েচিস ঠাকমা? এ যেন কী হাসির কতা! বুড়ি ফোকলা দাঁতে হেসেই খুন। চুবড়িতে হাত ভরে ঠারেঠোরে বুড়ি যা পাচ্চে বিলোচ্ছে, আর খুনখুন করে হাসচে কত! ছেলের দল বুড়িরে ছেঁকে ধরেছে। এখন আর কী ছাড়বে! বুড়ি এখন গাছের তলে বসে বসে গপ্পগাছা করবে। কাজ কী আর বুড়ির! তা বাপু গপ্প কি আর গাছে ফলে! বুড়ির গপ্পে তাই ভিড় করে আসে লীলেবতি, কালো বিড়েল আর নীল মাছিদের ঝাঁক।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।