স্মরণকালের ভয়ালতম বন্যার কবলে বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ মানুষ, দায় কার

তারিখটা ছিল ১৫ জুন। ওই দিন দুপুরবেলা হঠাৎই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করল। ভারী বর্ষণ চলছিলই পুরো মরশুম জুড়ে। সেদিন দুপুরে আচমকাই পাহাড়ি ঢল নেমে আসতে শুরু করল জলস্রোত, আর তা আছড়ে পড়ল বাংলাদেশের মিনি লন্ডন খ্যাত সিলেট-এ । এক পলকেই যেন বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল গোটা একটা বিভাগ ।
মুহুর্তে তলিয়ে গেল সেখানকার প্রায় ৮০ ভাগ ঘর বাড়ি, স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা ও দফতর। বিগত কয়েক দশকের ইতিহাসে সব থেকে ভয়াবহ বন্যায় কার্যত বন্দি হলো লক্ষ লক্ষ মানুষ। খাবার-পানীয়-মাথার ছাদ রাতারাতি যেন সব উধাওএর পরে কেটে গিয়েছে এক সপ্তাহেরও বেশি সময়। কিন্তু বাস্তুহারা মানুষগুলোরর মনজুড়ে এখনও আতঙ্ক। কান পাতলেই শোনা যাবে হাহাকার।

চলতি বছরেই গত দুই মাসে তিন দফায় স্মরণকালের ভয়াল বন্যা দেখল বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সিলেটবাসী । এ বছরের এপ্রিলে প্রথম দফায় সিলেটের নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোতে অসময়ে বন্যা দেখা দেয় । এক মাস পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে, দ্বিতীয় দফায় বিগত ১৮ বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় । সর্বশেষ একই বছরের জুনে বাংলাদেশের বহু বছরের বন্যার রেকর্ড ভেঙে দিয়ে তৃতীয় দফার ভয়ঙ্কর বন্যাটি আঘাত হানে ।

এই বছরের বন্যায় বাংলাদেশের সিলেট সুনামগঞ্জ হবিগঞ্জ রংপুর সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের কমপক্ষে ১৭টি জেলার অন্তত দেড় কোটি লোক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব থেকে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ এইদুটি জেলা। প্রশাসনের হিসেবে এই দুই জেলায় ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ জলবন্দি হয়ে আছেন। বন্যায় প্লাবিত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে জেলাগুলোর অধিকাংশ সড়ক, রেল ও বিমান পথ। বন্যাকবলিত লাখো মানুষের জীবিকা নির্বাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের (২২ জুন) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী গত ৩৬ দিনে (১৭মে থেকে ২১ জুন) বন্যাজনিত নানা দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে । বেসামাল বন্যাপরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট ও সুনামগঞ্জ পরিদর্শনকরেছেন ।

এই বন্যায় আসাম-মেঘালয়ের ভূমিকা কতটা?

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। ভারতের চেরাপুঞ্জি সীমান্ত যেখানে শেষ সেখান থেকেই শুরু বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলা । যার ফলে চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির জল সরাসরি বাংলাদেশে এসে পড়ে, ক্রমে মেঘনা বা যমুনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়।

বাংলাদেশের নদী গবেষকদের মতে, এবারের আকস্মিক বন্যার পিছনে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের বন্যা ও অতিবৃষ্টি একটি প্রধান কারণ। বাংলাদেশ বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, “ভারতের চেরাপুঞ্জিতে গত কদিন সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে এবং এই অতিবৃষ্টির কারণেই ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ ও অন্যান্য অঞ্চলেএবছর ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের পরিচালক এ কে এমসাইফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ক'দিন ধরে চেরাপুঞ্জিতে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, এখনো বৃষ্টি হচ্ছে, এরকম ধারাবাহিক বৃষ্টি সব শেষ হয়েছিল ১৯৯৫ সালে।” তাঁর ভাষ্যমতে খুব কমই এরকম বৃষ্টি হতে দেখা গিয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ত্বকী সিদ্দিকী সদ্য ভারত সফর সেরে ফিরেছেন। তিনি আবার বলছিলেন, “আমি যে জায়গাগুলো ঘুরে আসছি এবং মেঘালয়ের এলাকাগুলোতে এখন যে পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছে এই জলটা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে গিয়ে পড়ছে যার ফলে সিলেট বন্যায় ভাসছে । এই অবস্থার জন্য আসলে কাকে দোষ দেয়া যায় এটা বলা যাচ্ছে না। এখানে কারোরই দোষ নাই পুরোটা প্রকৃতির উপর নির্ভর করছে।”

ভারতের আসামে বন্যা নিয়ে ত্বকী সিদ্দিকী বললেন, “আমি আসাম শিলিগুড়ির লোকাল লোকজনের সাথে হিন্দিতে কথা বলে যা বুঝেছি এত বৃষ্টি ওরাও নাকি অনেক বছরে দেখে নাই এবং ওদের যে ড্রেনেজ সিস্টেম ছিল ওটাও বলতে গেলে উপচে পড়া অবস্থা”।

আসলে এই বছর ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বন্যা । ভারতের গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ মোতাবেক বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে সেখানকার বেশ কয়েক লাখ লোক জলবন্দি হয়ে আছেন এবং বন্যার কবলে পড়ে এপর্যন্ত বহু লোক মারাও গিয়েছেন ।

বাংলাদেশের ব্যর্থতা কতটা?

বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মতে এবছর এরকম ভাবে বন্যা হওয়ার পিছনে ভারতের সাথে যুক্ত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আরও কিছু কারণ রয়েছে । গবেষকরা আরও বলছেন অতীতের বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান নদীগুলোর অবস্থাগত অনেক পার্থক্য রয়েছে।

‌অসম ও মেঘালয়ের অতিবৃষ্টির জল প্রতি বছরই বাংলাদেশের হাওর ও নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যায়। আর এই অতিরিক্ত জলের সঙ্গে মেঘালয়ের পাহাড়গুলো থেকে বেয়ে আসা পলি ও পাথরের চাপে বাংলাদেশের হাওর ও নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে জলধারণ ক্ষমতা আগের মতো নেই। ফলে অতিরিক্ত জল নদীর উপরে প্রবাহিত হয়ে ভাঁটি অঞ্চলগুলোতে বন্যা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের নদী গবেষকরা জল বাহন ক্ষমতা নষ্টের জন্য ভারত অংশে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনকে দায়ী করছেন।

নদীগুলোর তলদেশ ময়লা আবর্জনায় ভরে যাওয়া এবং ঠিকমত ড্রেজিং না হওয়াকে পানি ভরাটের আরও একটি কারণ বলছেন বাংলাদেশের গবেষকরা। গাছ গাছালি কেটে ফেলে অপরিকল্পিতভাবে পর্যাপ্ত পরিমানে বাড়িঘর তৈরির ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে বাংলাদেশের গবেষকরা ধারণা করছেন ।'

আরও পড়ুন-নদীর অতলে তলিয়ে গেছে একের পর এক মন্দির, পুরুলিয়ার যে ইতিহাস চলে গেছে আড়ালে

সিলেট ও সুনামগঞ্জ-সহ বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা ঘাট উন্নয়ন, হাওরে বিভিন্ন জায়গায় পকেট আকারে রাস্তা নির্মাণ ও বেপরোয়া নগরায়ণ হাওরে পানি চলাচলে মূল বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । ফলে জল অপসারণে ব্যাঘাত ঘটায় বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে অঞ্চলগুলো । এ বছরের জানুয়ারিতে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন যাতে হাওরে এখন থেকে এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক করা হয়।

বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন সিলেট, সুনামগঞ্জ ও অন্যান্য বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর অধিকাংশ জনপদে শহর রক্ষা বাঁধ না থাকার কারনে নদী বা হাওরের পানি বাড়ার সাথে সাথেই খুব সহজে শহরে ঢুকে পড়ে বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে ।

বাংলাদেশ বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের পরিচালক এ কে এমসাইফুল ইসলাম জানাচ্ছেন, ''হাওরের অনেক এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি করা হয়নি। সেটা করা না হলে বাড়িঘর উঁচু করে তৈরি করতে হবে, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। সেটাও করা হয়নি। ফলে যখনই এভাবে আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে সেটার ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশিই হচ্ছে।''

কিন্তু এবার বাংলাদেশে যেভাবে আকস্মিকভাবে বৃষ্টি বৃদ্ধির রেকর্ড ভেঙে বন্যাপরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এরকম পরিস্থিতিতে বন্যা ঠেকানো খুব কঠিন বলে বলছেন এই বিশেষজ্ঞরা।


বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অঙ্ক

বিশ্বজলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগেরঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে ভুমিকম্প, সুনামি ও বন্যার মতোপ্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-এ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমদিকে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। গঠনগতভাবে বাংলাদেশের কোথাও কোথাও যথেষ্ট ঢালু। বঙ্গোপসাগরের সাথে ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রয়েছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের। এমনকী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি।

একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন ও বন্যার মতোপ্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ এবং আগামীতেও হবে ।

সাম্প্রতিক সময়ে আইপিসিসি রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি এবং শেষের দিক নাগাদ বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি ২.০ শতাংশ থেকে৯.০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইপিসিসি-র একপ্রতিবেদনেও বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে মারাত্মকভাবে আঘাত হানবে। প্রতিবেদনে আরও অনুমান করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অব্যাহত থাকবে। ব্রহ্মপুত্র-সহ সকল নদীর অববাহিকায় ফলস্বরূপ বন্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।

সমগ্র বাংলাদেশ যখন ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অপেক্ষায় তারিখ গুণছে এবং পদ্মাতটের মানুষগুলোর মনে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আবেশ, তখন ভয়াল বন্যায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি মানুষগুলো চাইছে স্রেফ বাঁচতে।

More Articles

;