অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা আসলে মানসিক অসুখ, কীভাবে দানা বাঁধে এই রোগ?

আমাদের কোনও বিশেষ সংগঠন, ধর্ম, দেশ, সম্প্রদায় পছন্দের নাই-ই হতে পারে, ভালো ও সুস্থ ধারণা তৈরি না-ও হতে পারে। কিন্তু তার ফলে তাদের ক্ষতি হতে পারে, বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে, ব্যবহারিক দিক থেকে এমন আচরণ চূড়ান্ত বৈষম্য গড়ে তোলে, যা সার্বিকভাবে সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।

Anwesa Bandyopadhyay
৪ মিনিট
অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা আসলে মানসিক অসুখ, কীভাবে দানা বাঁধে এই রোগ?

আপনার নাম কী? যে পাঠক এই লেখা পড়ছেন এই মুহূর্তে, মনে মনে পুরো নাম বললেন তো? আসলে আমরা বেশিরভাগই তাই বলি। ছোট থেকে শেখানো হয়, আমার পরিচয় আমার পুরো নাম। আমি একজনকে চিনতাম, সে পদবি ব্যবহার করত না।আপনি বলবেন ব্যতিক্রম, আমি বলব, ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হতে পারে না। আসলে বিগত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল ও মাস মিডিয়া বিশেষ কিছু কারণে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের আবহাওয়া তৈরি করেছে। এবার কোন উসকানি বা ঘটনা থেকে এই আবহাওয়া তৈরি হলো, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিভাগের রাজনীতির আড়ালে কোন মন কাজ করে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষকে একটু সজাগ করে তোলা।

আজ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখা লিখছি। আমি একটি কলেজে মনস্তত্ত্ব পড়াই। অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন, যারা স্নাতক স্তরে মনস্তত্ত্ব পড়ে, তাদের মনস্তত্ত্বের প্র‍‍্যাকটিকাল আবশ্যিক। এই নিয়ম স্কুলেও আছে। সমাজ-মনোবিজ্ঞানে আমাদের অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের কারণ, তা থেকে মুক্তির উপায় ইত্যাদি বেশ কিছু বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়।একটি প্র‍্যাকটিকাল করতে হয়, সেটা বেশ ইন্টারেস্টিংও। বোগারডাস সোশ্যাল ডিসট‍্যান্স স্কেল, গুগল করলেই দেখতে পাবেন।

তা এই প্র‍্যাকটিকালটির বিষয় হচ্ছে ৫টি বা ৬টি দেশ বা ধর্মের নাম থাকবে, আর কিছু ক্যাটেগরি থাকবে, যেমন ধরুন কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে আপনি বিবাহ করতে চান, কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে আপনি আপনার প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চান থেকে শুরু করে কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে নিজের দেশ থেকে বের করে দিতে চান? মানে কাকে খুব কাছে চাইছেন, আর কাকে একেবারেই সহ্য করতে পারছেন না বলে বের করে দিচ্ছেন। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যেত, একটি বিশেষ ধর্মের মানুষকেই মানুষ তার নিজের দেশে রাখতে চাইতেন না। এরকম রেসপন্সই পাওয়া যেত বেশিরভাগ সময়। বছরের পর বছর প্র‍্যাকটিকালের খাতা দেখেছি, ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছি, একটি বিশেষ দেশ বা ধর্মের প্রতি কেন এত বিদ্বেষ? উত্তর যা পেয়েছি, তাতে বুঝতে পেরেছি, আসল বীজ অনেক ভেতরে, যত্নে বপন করা হয়েছে এবং দিনের পর দিন তা মনের ভেতর লালন করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রিল মানে কি সহজেই হাততালির লোভ? 'রিয়েল'-কে পাশ কাটিয়ে কত দূর যাব আমরা?

সাংঘাতিক অস্থিরতা, ট্রেন্ডে থাকতে চাওয়া বাধ্যতামূলক জীবন মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। দায়টা সকলের, দায়িত্বটাও সকলকেই ভাগ করে নিতে হবে।

এই যে প্রায় হঠাৎ করেই যে কোনও উসকানিতে এইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আসলে এর শিকড় খুবই গভীরে, তা আসলে উসকানির অপেক্ষায় থাকে, কখনও আবার তাও দরকার পড়ে না। মনস্তত্ত্বে প্রেজুডিস হলো নেতিবাচক অনুভব, এই যে ছোট থেকেই পরিবারের মধ্যে বিভাজন ঢুকে গেছে, তাই শহরের বেশ কয়েকটা বিশেষ জায়গা ‘ওদের', অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের এই বিশেষ অনুভব বা প্রেজুডিস কাজ করে।

'স্টিরিওটাইপ' শব্দটি নিশ্চয়ই শুনেছেন, আমাদের মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তা হলো কগনিশন। মানে আমাদের যে ধারণা বা মনের যে গঠন তৈরি হয়ে গেছে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের সম্পর্কে। তা কিন্তু ইতিবাচক ও নেতিবাচক- দুইই হতে পারে। আপনি আপনার নিজের দেশ, নিজের জাত, নিজের ধর্ম নিয়ে, তার যতই গলদ থাকুক, ভয়ংকরভাবে ইতিবাচক থাকবেন। এরপর হলো ডিসক্রিমিনেশন। ব্যবহারিক দিক। এনআরসি-কে আপনি এই পর্যায়ে ফেলতে পারেন। আমাদের কোনও বিশেষ সংগঠন, ধর্ম, দেশ, সম্প্রদায় পছন্দের নাই-ই হতে পারে, ভালো ও সুস্থ ধারণা তৈরি না-ও হতে পারে। কিন্তু তার ফলে তাদের ক্ষতি হতে পারে, বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে, ব্যবহারিক দিক থেকে এমন আচরণ চূড়ান্ত বৈষম্য গড়ে তোলে, যা সার্বিকভাবে সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। ব্যক্তিস্তরেও যতক্ষণ মাথা ও মন অবধি কোনও সমস্যা থাকছে, তা বিরাট আকারে প্রভাব ফেলছে না।

কিন্তু ব্যবহারিক দিকে যদি তার প্রকাশ বাড়তে থাকে, তবে তা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও ক্ষতিকারক। একইভাবে এই কথা সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, আমার নিজস্ব মনে তৈরি হওয়া ঘৃণা, মাথায় তৈরি হয়ে যাওয়া ধারণা আসলে কিছু উসকানির অপেক্ষায়। মনুষ্যত্বের এই দৈন‍্য, যা তাকে হীন করে তোলে, যা বহু শিক্ষিত মানুষ বহু ডিগ্রি অর্জন করেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেননি, তা আসলে ক্রমে গঠিত হয়। অনেকের মনে হয়, 'যা রটে তা কিছুটা তো বটে‘, নিশ্চয় সত্য কিছু আছে, না হলে এতদিন ধরে রটে আসা ঘটনা মিথ্যে কেন হবে? (মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Kernel of truth)। তা আসলে মনকে উদার করতে চাইলেই ঝেড়ে ফেলা সম্ভব।

আমরা জানি, ডিগ্রি নয় শিক্ষা পারে মানুষকে বড় করে তুলতে, সেই শিক্ষা সিলেবাসের বাইরে, যাদের সম্পর্কে বিদ্বেষ, মিশে দেখেছি কি তাদের সঙ্গে কখনও? তাদের উৎসবে সামিল হয়েছি কি? মিশলে দেখবেন, তাদের জীবনধারণ নিয়ে যেভাবে আপনি ধারণা তৈরি করেছেন, তার সঙ্গে হয়তো কোনও মিলই নেই। আর আমাদের মধ্যে এই আমরা-ওরার বিভেদ চিরকালীন, তা পাশের পাড়া থেকে শুরু করে ক্রিকেট, ফুটবল, খাওয়া, পোশাকের ধরন, অন্যের দেশ সব ক্ষেত্রেই এক। ওরা একইরকমভাবে খারাপ, সকলেই সমান- (outgroup homogeneity) এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভ্রম বা bias। ভ্রম ভাঙা যায় যুক্তি দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, সঠিক তথ্য দিয়ে। চেষ্টা করা যায় কি? তাহলে ‘ওরা‘ নয়, ভারমুক্ত হবেন আপনি নিজেও, কারণ একথা তো সত্যিই নিজের মধ্যে থাকা নেতিবাচক মনোভাব। তা আসলে নিজের ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি। তাই না?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।