অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা আসলে মানসিক অসুখ, কীভাবে দানা বাঁধে এই রোগ?

আপনার নাম কী? যে পাঠক এই লেখা পড়ছেন এই মুহূর্তে, মনে মনে পুরো নাম বললেন তো? আসলে আমরা বেশিরভাগই তাই বলি। ছোট থেকে শেখানো হয়, আমার পরিচয় আমার পুরো নাম। আমি একজনকে চিনতাম, সে পদবি ব্যবহার করত না।আপনি বলবেন ব্যতিক্রম, আমি বলব, ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হতে পারে না। আসলে বিগত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল ও মাস মিডিয়া বিশেষ কিছু কারণে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের আবহাওয়া তৈরি করেছে। এবার কোন উসকানি বা ঘটনা থেকে এই আবহাওয়া তৈরি হলো, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিভাগের রাজনীতির আড়ালে কোন মন কাজ করে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষকে একটু সজাগ করে তোলা।

আজ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখা লিখছি। আমি একটি কলেজে মনস্তত্ত্ব পড়াই। অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন, যারা স্নাতক স্তরে মনস্তত্ত্ব পড়ে, তাদের মনস্তত্ত্বের প্র‍‍্যাকটিকাল আবশ্যিক। এই নিয়ম স্কুলেও আছে। সমাজ-মনোবিজ্ঞানে আমাদের অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের কারণ, তা থেকে মুক্তির উপায় ইত্যাদি বেশ কিছু বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়।একটি প্র‍্যাকটিকাল করতে হয়, সেটা বেশ ইন্টারেস্টিংও। বোগারডাস সোশ্যাল ডিসট‍্যান্স স্কেল, গুগল করলেই দেখতে পাবেন।

তা এই প্র‍্যাকটিকালটির বিষয় হচ্ছে ৫টি বা ৬টি দেশ বা ধর্মের নাম থাকবে, আর কিছু ক্যাটেগরি থাকবে, যেমন ধরুন কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে আপনি বিবাহ করতে চান, কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে আপনি আপনার প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চান থেকে শুরু করে কোন দেশ বা ধর্মের মানুষকে নিজের দেশ থেকে বের করে দিতে চান? মানে কাকে খুব কাছে চাইছেন, আর কাকে একেবারেই সহ্য করতে পারছেন না বলে বের করে দিচ্ছেন। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যেত, একটি বিশেষ ধর্মের মানুষকেই মানুষ তার নিজের দেশে রাখতে চাইতেন না। এরকম রেসপন্সই পাওয়া যেত বেশিরভাগ সময়। বছরের পর বছর প্র‍্যাকটিকালের খাতা দেখেছি, ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছি, একটি বিশেষ দেশ বা ধর্মের প্রতি কেন এত বিদ্বেষ? উত্তর যা পেয়েছি, তাতে বুঝতে পেরেছি, আসল বীজ অনেক ভেতরে, যত্নে বপন করা হয়েছে এবং দিনের পর দিন তা মনের ভেতর লালন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: রিল মানে কি সহজেই হাততালির লোভ? ‘রিয়েল’-কে পাশ কাটিয়ে কত দূর যাব আমরা?

এই যে প্রায় হঠাৎ করেই যে কোনও উসকানিতে এইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আসলে এর শিকড় খুবই গভীরে, তা আসলে উসকানির অপেক্ষায় থাকে, কখনও আবার তাও দরকার পড়ে না। মনস্তত্ত্বে প্রেজুডিস হলো নেতিবাচক অনুভব, এই যে ছোট থেকেই পরিবারের মধ্যে বিভাজন ঢুকে গেছে, তাই শহরের বেশ কয়েকটা বিশেষ জায়গা ‘ওদের', অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের এই বিশেষ অনুভব বা প্রেজুডিস কাজ করে।

'স্টিরিওটাইপ' শব্দটি নিশ্চয়ই শুনেছেন, আমাদের মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তা হলো কগনিশন। মানে আমাদের যে ধারণা বা মনের যে গঠন তৈরি হয়ে গেছে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের সম্পর্কে। তা কিন্তু ইতিবাচক ও নেতিবাচক- দুইই হতে পারে। আপনি আপনার নিজের দেশ, নিজের জাত, নিজের ধর্ম নিয়ে, তার যতই গলদ থাকুক, ভয়ংকরভাবে ইতিবাচক থাকবেন। এরপর হলো ডিসক্রিমিনেশন। ব্যবহারিক দিক। এনআরসি-কে আপনি এই পর্যায়ে ফেলতে পারেন। আমাদের কোনও বিশেষ সংগঠন, ধর্ম, দেশ, সম্প্রদায় পছন্দের নাই-ই হতে পারে, ভালো ও সুস্থ ধারণা তৈরি না-ও হতে পারে। কিন্তু তার ফলে তাদের ক্ষতি হতে পারে, বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে, ব্যবহারিক দিক থেকে এমন আচরণ চূড়ান্ত বৈষম্য গড়ে তোলে, যা সার্বিকভাবে সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। ব্যক্তিস্তরেও যতক্ষণ মাথা ও মন অবধি কোনও সমস্যা থাকছে, তা বিরাট আকারে প্রভাব ফেলছে না।

কিন্তু ব্যবহারিক দিকে যদি তার প্রকাশ বাড়তে থাকে, তবে তা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও ক্ষতিকারক। একইভাবে এই কথা সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, আমার নিজস্ব মনে তৈরি হওয়া ঘৃণা, মাথায় তৈরি হয়ে যাওয়া ধারণা আসলে কিছু উসকানির অপেক্ষায়। মনুষ্যত্বের এই দৈন‍্য, যা তাকে হীন করে তোলে, যা বহু শিক্ষিত মানুষ বহু ডিগ্রি অর্জন করেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেননি, তা আসলে ক্রমে গঠিত হয়। অনেকের মনে হয়, 'যা রটে তা কিছুটা তো বটে‘, নিশ্চয় সত্য কিছু আছে, না হলে এতদিন ধরে রটে আসা ঘটনা মিথ্যে কেন হবে? (মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Kernel of truth)। তা আসলে মনকে উদার করতে চাইলেই ঝেড়ে ফেলা সম্ভব।

আমরা জানি, ডিগ্রি নয় শিক্ষা পারে মানুষকে বড় করে তুলতে, সেই শিক্ষা সিলেবাসের বাইরে, যাদের সম্পর্কে বিদ্বেষ, মিশে দেখেছি কি তাদের সঙ্গে কখনও? তাদের উৎসবে সামিল হয়েছি কি? মিশলে দেখবেন, তাদের জীবনধারণ নিয়ে যেভাবে আপনি ধারণা তৈরি করেছেন, তার সঙ্গে হয়তো কোনও মিলই নেই। আর আমাদের মধ্যে এই আমরা-ওরার বিভেদ চিরকালীন, তা পাশের পাড়া থেকে শুরু করে ক্রিকেট, ফুটবল, খাওয়া, পোশাকের ধরন, অন্যের দেশ সব ক্ষেত্রেই এক। ওরা একইরকমভাবে খারাপ, সকলেই সমান- (outgroup homogeneity) এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভ্রম বা bias। ভ্রম ভাঙা যায় যুক্তি দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, সঠিক তথ্য দিয়ে। চেষ্টা করা যায় কি? তাহলে ‘ওরা‘ নয়, ভারমুক্ত হবেন আপনি নিজেও, কারণ একথা তো সত্যিই নিজের মধ্যে থাকা নেতিবাচক মনোভাব। তা আসলে নিজের ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি। তাই না?

More Articles

;