'ওদিকে তাকালে চোখ খারাপ হয়!' টুকি ও নব্বইয়ের সেই বৈশাখী বিকেল

Kolkata 90's: উদ্বোধনী সংগীত হওয়ার আগেই আকাশ কড়কানোর আওয়াজ পাওয়া গেল।

Rahul Arunodoy Banerjee
৩ মিনিট
'ওদিকে তাকালে চোখ খারাপ হয়!' টুকি ও নব্বইয়ের সেই বৈশাখী বিকেল

একটা ব্যাজ। একটা ব্যাজ যে জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা জানে শুধু এই বিশেষ বিকেলগুলো।হিলিয়াম আলোর চক্করে বিকেলের শেষ আলো মুখচোরা উঠতি বিড়িখোরের মতো সুবিধেজনক গলি খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে, আর হিলিয়াম আলোকে কর্তাব্যক্তি ভেবে ভিড় জমাচ্ছে অজস্র পোকা। আমিও ঘুরঘুর করছি পাড়ার দাদাদের চারপাশে, কখনও জুটছে উপেক্ষা, কখনও মৃদু অভয়ের খুচরো ছুড়ে দিচ্ছেন তাকানোর অজুহাতে, সেই আতিশয্যেই দু'সারি কার্ডবোর্ডের চেয়ার পেতে ফেলছি আমি।

ভোম্বলদা চেয়ার বাগিয়ে বসে গেছেন, মাইক টেস্টিং! মাইকের প্রতি ভোম্বলদার অপত্য স্নেহ, তেমনই অধিকারবোধ। যে-কোনও কারণেই পাড়ায় মাইক আসুক, ভোম্বলদার মাইক চাই। তার জন্য ত্যাগস্বীকার অবশ্য কিছু কম করেন না ভোম্বলদা, এমনও হয়েছে, পুরো পরিবার ঝেঁটিয়ে গেছে কাশ্মীর, ভোম্বলদা আজাদগড়ের বান্টি হারিয়ে গেলে কোথায় যোগাযোগ করবে বলার জন্য 'মজলিশ'-এর তড়কা, রুটি খেয়ে পুরো পুজো কাটিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মাইক ছাড়েনি।

এহেন ভোম্বলদা যে সন্ধে পড়ার আগেই মাইকের দখল নেবেন, তাতে আশ্চর্য কিছু নেই। চেয়ার পাতা আমাদের সারা, তাতেও অসুবিধে নেই। টুকি চলে আসবে, একটা ব্যাজ আমার লাগবে ও আসার আগেই, যেভাবেই হোক। টুকি রবীন্দ্রসংগীতের দলে আছে, ওরা সবাই বাবুসোনার বাড়িতে তৈরি হচ্ছে, তবলার ঠুকঠাক, হালকা হাসির উচ্ছ্বাস- সবই ভেসে আসছে ওদের বাড়ি থেকে। তা আসুক, টুকি যে এখনও আসেনি, তা আমি বিলক্ষণ জানি।

প্রায় একসঙ্গেই ঘটল ঘটনাটা, পাড়ার দাদা দয়াপরবশ হয়ে ব্যাজ পরাচ্ছিল, এমন সময় মাঠের এক কোনা দিয়ে হেঁটে আস্তে দেখলাম টুকিকে। বুকে সেফটিপিন ফুটল কি? জানি না। আসলে ঠিক তার আশপাশে এত অজস্র পিন ফুটছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে, সেফটি পিন কোন ছাড় যে, টের পাব? ভাগ্য করে কিছু বেলফুল জন্মেছিল আজ, যারা ওর খোঁপার স্রোতে থমকে আছে, পঁচিশে বৈশাখের ঘাম ব্লাউজের ওপরের পিঠের অংশে জমে আছে শিশিরের মতো। আমার দিকে একটিবারও না তাকিয়ে ও বাবুসোনাদের বাড়িতে ঢুকে গেল।

সময়টা মে মাসের শুরু হলেও বিকেলবেলা মাঝেমধ্যে আশ্চর্য লিলুয়া বাতাস বয় এই সময়, যা আজও বইল খানিক এই অলক্ষুণে সময়টাতেই। মিষ্টুদি-দের চিলতে বাগান কেঁপে উঠল ওই হাওয়ায় সলতের মতো। আমার মনকেমনের সঙ্গী হলো শুধু বাবুয়াদার গ্রিল কারখানার ঝালাই মেশিন। ওদিকে বেশিক্ষণ তাকালে চোখ খারাপ হয় জানতাম, কিন্তু মন কবে বারণ শুনেছে? মন তো আলোর চারপাশে ভিড় করা ওই পোকাগুলো অথবা টুকির চারপাশে আমি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যারা ফিতে কাটছে পারিশ্রমিক নিয়ে, বেশ করছে! শিল্পীদের সময়ের দাম আছে বইকি

Tollywood actor-writer Rahul writes: ফিতে যারা কাটে, তারা বেশ করে।

সন্ধে পেকে উঠেছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যাজেদের ব্যাস্ততা। বয়স্কদের ধরে চেয়ারে বসাচ্ছি, যিনি হয়তো বিন্দুমাত্র উৎসাহী নন, শুধুমাত্র সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছেন; তাদেরকেও ধরে বসিয়ে দিই পারলে। এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ক্যাঁচাল, লোকাল কাউন্সিলরকে পায়রা দেওয়া হয়েছে ওড়ানোর জন্য, তিনি ওড়াবেনই, কমলদার পায়রাও তেমন গোঁ ধরেছে, উড়বে না। শেষে খেপে গিয়ে যখন উনি দু'হাতে পায়রা চেপে ধরে ইন্টারন্যাশনাল গাইতে শুরু করলেন ওকে ধরে ধরে নামানো হলো।

কিন্তু উদ্বোধনী সংগীত হওয়ার আগেই আকাশ কড়কানোর আওয়াজ পাওয়া গেল, তারপর যেমনটা হয়ে থাকে বৈশাখী বিকেলে, মুহূর্তে সব লন্ডভন্ড। মঞ্চের পিছনের টেম্পোরারি সাজঘর উড়ে গেছে, তাই সবাই মঞ্চে জড়ো হয়েছি বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য। টুকির মুখ ভার, ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

-কী রে? খারাপ লাগছে?'

টুকি বৃষ্টি দেখতে দেখতেই বলল, "খারাপ লাগবে না? সব ভেস্তে গেল।"

আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, "ওয়ার্ড কমিটি তো বলেছে, পরের রবিবার করবে।"

-পরের রবিবার!

নিজের মনে শব্দদুটোর ওজন করল যেন, তারপর নিজের মনেই বলল, "আবার সাজতে হবে?"

টুকির এই প্রশ্নের উত্তর তৈরি ছিল, বললাম, "প্লিজ সাজিস।"

তারপর আর ওর সামনে দাঁড়াইনি। স্বেচ্ছাসেবকের কি আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে চলে?

“বাবা”, সহজের ডাকে চটকা ভাঙল। শেরউড-এ আজকে বিজয়া সম্মিলনী, তাই মিস জোজো মানে জোজোদি আসবে। সহজ তাই নিয়ে প্রবল উত্তেজিত, আমাকে তাড়াতাড়ি ডেকে নিয়েছে যাতে তাড়াতাড়ি সাইকেল প্র্যাকটিস সেরে শো শুরু থেকে দেখতে পারে। আমার চোখের সামনে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে, আমি সেসব দেখতে দেখতে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। সহজ আমার পাশে বসতে বসতে বলল, "বাবা দেখো, জাস্ট লাইক তারাবাতি", আমি তাকিয়ে দেখলাম মঞ্চের এককোনায় শেষ মুহূর্তের ঝালাই চলছে কিছুর। আমি বললাম, "ওদিকে তাকিও না সহজ, চোখ খারাপ হয়।"

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।