ফেরিওয়ালা প্রশান্ত কিশোর ও কংগ্রেসি জমিদারি: এক অলীক কুনাট্য

Arka Deb
৪ মিনিট
ফেরিওয়ালা প্রশান্ত কিশোর ও কংগ্রেসি জমিদারি: এক অলীক কুনাট্য

থিতু হওয়া হলো না ফেরিওয়ালার। টালবাহানা চলল, গড়িমসি চলল, নানা জন নানাবিধ কল্পনা-পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু কার্যত সবকিছুতে জল ঢেলে ফের ঝোলা উঠিয়ে অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে রওনা দিলেন রাজনৈতিক ফেরিওয়ালা প্রশান্ত কিশোর। রুদ্ধশ্বাস নাটকের অবসানে যেন দু'পক্ষই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু গ্যালারিতে বসে টানটান নাটক উপভোগ করা আম আদমি কী পেলেন, কী হারালেন?

প্রশান্ত কিশোর এবং কংগ্রেস- সোশ্যাল মিডিয়ার নাট্যমোদীদের সামনে এই দু'পক্ষই পালা নিয়ে নিজস্ব বয়ান দাখিল করেছে। কংগ্রেস বলছে, তাঁকে ঠিক কোন ভূমিকায় চাইছে দল, তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ প্রশান্ত কিশোর রাজি হননি। প্রশান্ত কিশোর অবশ্যই দু'কদম এগিয়েই খেললেন। কংগ্রেসের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন একথা স্বীকার করে নেওয়ার পাশাপাশি প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেসের পুরনো ঘা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তাঁর মত, কংগ্রেসের যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্যে দিয়ে কংগ্রেস আগে সেইসব সমস্যাগুলোর সমাধান করুক, যার শিকড় অনেক অনেক গভীরে প্রোথিত।

কোন সমস্যা? প্রশান্ত ভেঙে বলেননি। কিন্তু রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন পরিবারতন্ত্র, পিতৃতন্ত্রের যে বীজ স্বাধীনতার আগেই কংগ্রেসের মাটিতে বপণ করা হয়েছিল, তা আজ সুদে-মূলে বনস্পতি হয়েছে। রাহুল গান্ধীর নিস্ক্রিয়তা হাল আমলে বারবার প্রমাণিত হলেও তিনি মুকুটহীন স্তাবক-পরিবৃত রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেই চলেছেন, নেতৃত্বদানের প্রশ্নে তাঁকে বা গান্ধী পরিবারের সব সদস্যকে বাদ দিয়ে আমূল সংস্কারের কথা ভাবার ক্ষমতা আমলাতান্ত্রিক কংগ্রেসিদের নেই। সাম্প্রতিক অতীতে অশোক গেহলট- সচিন পাইলট, অমরিন্দর সিং-নভজ্যোত সিং সিধুর প্রকাশ্য কাজিয়া সংবাদমাধ্যমের সূত্রে দেখেছে গোটা দেশ। ফলে কংগ্রেস যে অভ্যন্তরীণ লবির লড়াইয়ে অতি দীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে কারও বাকি নেই। সু-নেতৃত্বের অভাব এবং সাংগঠনিক সমস্যা নিয়ে বারংবার সরব হয়েছে জি২৩ গোষ্ঠী। কিন্তু কখনওই বিভেদরেখা মুছে ফেলে এক হতে পারেননি কংগ্রেসি নেতারা। বলা ভালো, তেমন নেতৃত্বই কংগ্রেস পায়নি, যিনি সকলকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে পারেন।

প্রশান্ত কিশোর ঘরপোড়া গোরু, অতীতে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে ব্যর্থতার কথা তিনি নিশ্চয়ই ভোলেননি। পূর্বাপর জেনেই তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে রফাসূত্র খুঁজতে গিয়েছিলেন। কোনও আশার আলো না থাকলে প্রশান্ত কিশোর এই পথে পা বাড়াতেন না। বাংলায় তৃণমূলের ব্যাপক জয়ের পর যখন কংগ্রেসকে সরিয়ে রেখে একটি তৃতীয় বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলা যায় কি না, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল, তখন প্রশান্ত কিশোর তাঁর মত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিজেপির সঙ্গে লড়তে হলে কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়েই লড়তে হবে। এখনও বিরোধী হিসেবে কংগ্রেসের কোনও বিকল্প নেই। কংগ্রেসের ক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসংশয় এই প্রশান্ত কিশোরই যখন জুতোটা গলানোর প্রশ্ন এল, ঈষৎ তফাৎ রাখলেন। বারংবার বৈঠকের পরেও যখন তাঁকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা গেল না, তখন বুঝতে হবে, প্রশান্ত কিশোর বুঝতে পেরেছেন কংগ্রেসের এই অসুখগুলো এত সহজে সারার নয়। তাছাড়া '২৪-এর যুদ্ধের নীল নকশা সাজানোর জন্য তাঁকে খোলা মাঠ দেবে না এই দল, তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেবে না দলের একাংশ- তা বুঝতে পেরেই প্রস্তাব নাকচ করলেন পিকে, যাবার আগে অসুখটিকেও চিহ্নিত করে গেলেন।

প্রশান্ত কিশোর প্রবল অ্যাম্বিশাস। কোনও দল বা মতের প্রতি তাঁর আনুগত্য নেই। তিনি রাজনীতির সওদাগর। ভালো 'ডিল' যেখানে, সেখানেই তিনি যাবেন। বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস জিততেই প্রশান্ত কিশোর আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন। উত্তর থেকে দক্ষিণ চষে ফেলেছেন, দেখা করেছেন আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। এরপর কংগ্রেসের তীরে তরী ভড়ানোর যে সংকল্প তাঁর মনে উঁকি দিয়েছিল তাতে আবেগের কোনও জায়গা ছিল না। বিজেপির প্রশান্ত কিশোরকে প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাঁর হাত ধরে স্ট্যালিন হোন বা মমতা আঞ্চলিক শক্তিগুলি নিজেদের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। আসমুদ্রহিমাচল চরচর করে বেড়েছে প্রশান্ত কিশোরের গ্রহণযোগ্যতা। এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কোনওটাই সর্বভারতীয় বিরোধী মুখ হয়ে ওঠার মতো শক্তিশালী নয়। কিন্তু প্রত্যেকেই প্রশান্ত কিশোরকে ভরসা করে। এই ব্র্যান্ড ইমেজকেই লগ্নি করতে চেয়েছিলেন প্রশান্ত কিশোর। কংগ্রেস যদি নিঃসংশয়ভাবে তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিত, তবে তিনি বাকিদেরও চুম্বকের কাছে টেনে আনতে পারতেন। তৈরি হত শক্তিশালী বিরোধী ছাতা, এমনটাই ভেবে থাকবেন পিকে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি যে এই বাজার-সমীক্ষা করেছিলেন, তা বোঝা যাবে গত এক বছরে তার চলাচলের ফিরিস্তি দেখলেই। কিন্তু তাতে ভবি ভোলবার নয়।

এহেন নাটকের অবসানে দেশের লোকসকল যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে বাড়ি ফিরলেন, তা হল, নরেন্দ্র মোদির বিজেপির বিরোধিতা করার যথেষ্ট প্রস্তুতি বিরোধী শিবিরের নেই। নেই যোগ্য নেতৃত্ব। রয়েছে মতানৈক্যের পাহাড়। খোলা মনে নেতৃত্বদানের জন্য যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনের প্রচেষ্টাকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখে বিজেপি নেতারা নিশ্চয়ই মুচকি হাসি হাসবেন।

বিজেপি হারুক বা জিতুক, গত কয়েক দশক ধরে তারা লাগাতার চেষ্টা করেছে তাদের আদর্শের ভিত্তিমূল প্রতিষ্ঠা করতে। গ্রামে-গ্রামান্তরে হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে দেওয়া থেকে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ভার্চুয়াল স্পেসে হিন্দুরাষ্ট্রের রবরবা তোলা, বিজেপির সমস্ত চলাচলই সুনিয়ন্ত্রিত,পরিকল্পিত। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হলে দরকার একটি জোরালো প্রতিসংস্কৃতির বোধ। প্রশান্ত কিশোরের সওদাগরি মনোভাব, বেচুবাবু-সুলভ দরকষাকষি, তিন পা এগিয়ে দু'পা পিছিয়ে আসা যেমন কংগ্রেসের অসুখের বিপ্রতীপে তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য-ব্যর্থতার যাত্রার নিরিখে সুবিবেচনা, ঠিক তেমনই রাজনৈতিক দায়মুক্ত, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তও বটে। এহেন দায়হীন, নিজেরটুকু বুঝে নেওয়া, আখের গোছানো, ইগোসর্বস্ব দলীয় সংস্কৃতি নিয়ে বৃষস্কন্ধ বিজেপির বিরোধিতা? ভারতীয় রাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য আজ এক মর্মান্তিক দিন।

লিখেছেন
Arka Deb
Arka Deb
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।