'দ্য ওম্যান ইন হোয়াইট' - কবি এমিলি ডিকিনসনের শেষ ক'টি বছর

Anirban Bhattacharyya
৫ মিনিট
'দ্য ওম্যান ইন হোয়াইট' - কবি এমিলি ডিকিনসনের শেষ ক'টি বছর

‘My life had stood – a Loaded Gun –

In Corners – till a Day

The owners passed - identified –

And carried me away –‘

১৫ মে, ১৮৮৬। আড়াই বছরের ব্রাইট’স ডিজিজের অস্বাভাবিক মৃত্যুযন্ত্রণার পরিসমাপ্তি। ইংরিজি কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক নক্ষত্রের পতন। এবং স্বভাবতই, তারারা যেভাবে খসে। কোনওরকম শব্দ ছাড়াই। জীবৎকালে মাত্র দশটি কবিতা এবং একটি চিঠি ছাপা হয়েছিল। অবশ্য এমন নীরব এবং পরিচিতিবিহীন জীবন এবং অবিচুয়ারি সাহিত্যের ইতিহাসে নতুন না। কিন্তু কোথায় এমিলি ডিকিনসন অনন্যা? কেন তাঁর শেষ ক’টি দিন অন্যরকম? শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি রহস্যাবৃত কিছু মুহূর্ত, সাদা পোশাকে পরিবৃতা এক স্বপ্ননারী এবং তাঁর শাশ্বত কবিতা। প্রিয় পাঠক, একটু জেনে নিই ...

একের পর এক মৃত্যুশোক, অবসাদ এবং ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা একাকীত্বের মিস্টিক এক বোধ – এমিলি ডিকিনসনের শেষ সময়ের করুণতম এক কথকথার অন্যতম কয়েকটি সুতো বলা যেতে পারে। পাঠকের সুবিধার্থেই এমিলি সম্পর্কে ছোট্ট করে ক্রনোলজিটা বলে নেওয়া ভালো। ১৮৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস-এর অ্যামহারস্টে জন্ম এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনসনের। বাবা গভীরভাবে ধার্মিক এবং নিষ্ঠাবান এডওয়ার্ড মেয়ে এমিলির পড়াশুনো এবং লেখালেখিতে যথার্থই অভিভাবক ছিলেন। অ্যামহারস্ট অ্যাকাডেমিতে পাঠরত অবস্থাতেই কবিতা লেখা শুরু, পরে পারিবারিক অ্যাটর্নি বেঞ্জামিন নিউটনের হাত ধরে ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং র্যাওলফ এমারসনের কবিতার সঙ্গে পরিচয়। নিউটনের যক্ষ্মায় অকালমৃত্যুতে কিছুটা হলেও স্তব্ধতা এবং এমিলির প্রথম বড়সড় মৃত্যুশোক এবং শোকগাথা – ‘When a little girl, I had a friend, who taught me immortality – but venturing too near, himself – he never returned’। পরবর্তীকালে লংফিলো, ব্রন্টে সিস্টার্স এবং এলিজাবেথ ব্রাউনিং-এর লেখার প্রতি গভীর আসক্তি। ক্রমশ ঘরবন্দি হয়ে থাকার এবং আনুষ্ঠানিক ক্রিশ্চান বিশ্বাসের প্রতি অনীহা – এই দুইয়ের লক্ষণ ক্রমশ দেখা দিতে থাকে এই সময়টা থেকেই। যদিও বন্ধু হিসেবে এই ক্রমশ কাছে আসেন আর্চ স্ট্রিট প্রেসবাইটেরিয়ান চার্চের মিনিস্টার চার্লস ওয়াডসওয়ার্থ, স্প্রিংফিলদ রিপাবলিকান কাগজের সম্পাদক স্যামুয়েল বোলস, কাব্যসমালোচক টমাস হিগিনসন। ১৮৬৭ সাল থেকেই সম্পূর্ণভাবে সাদা পোশাকে নিজের হোমস্টেডের বাড়ির ঘরে অন্তরিন থাকতে শুরু করেন এমিলি। কেন? এমিলির কথায় –

‘I do not cross my Father’s ground to any house or town’

‘I felt a funeral, in my Brain,

And Mourners to and fro

Kept treading – treading – till it seemed

That sense was breaking through –‘

কিভাবে সেক্লুশন শুরু? কখন? ১৮৭৪ সালের ১৬ জুন বোস্টনে পিতার আকস্মিক স্ট্রোক এবং মৃত্যু। টানা তিনদিন ঘরবন্দি হয়ে রইলেন এমিলি। যখন ঘর খুললেন, বোন ল্যাভিনিয়া দেখলেন কালো পোশাকে পরিবৃত বাকি পরিবারের ঠিক বিপরীতে সাদা গাউনে থমথম করছে এমিলির মুখ, ছিপছিপে শরীর। ল্যাভিনিয়া জানতে চেয়েছিলেন সাদা পোশাক কেন? তাঁরা তো এখন শোকের ভেতর আছেন! উত্তরে এমিলির বক্তব্য ছিল, তিনিও শোকের ভেতরেই আছেন। তাই সাদা পোশাক। এভাবেই সাদা এবং মৃত্যুচেতনা সমার্থক হয়ে যাচ্ছিল এমিলির ভেতর। প্রায় হিমশীতল এবং ডিকিনসন পরিবারে একধরনের অস্তিত্বহীন মায়ের ১৮৭৫-এর ১৫ জুন হঠাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোক এবং ১৮৮২ সালে বৃদ্ধার মৃত্যু পর্যন্ত পরবর্তী সাত বছর ধরে দুই বোন এমিলি এবং ল্যাভিনিয়ার লড়াই, যা এমিলির কথায় ভয়াবহ ভীষণ – ‘Home is so far from home ….’। ১৮৮২ সালে চার্লস ওয়াডসওয়ার্থ ও ১৮৮৪ সালে যক্ষ্মায় ম্যাসাচুসেটস কোর্টের সিনিয়র জাজ অটিস লর্ডের মৃত্যু এবং এমিলির ভাষায় - ‘Our latest loss …’। ১৮৮২ সালে ভাই অস্টিনের সঙ্গে ম্যাবেল লুমিস টড নাম্নী এক লেখিকার প্রেম, এবং ফলত অস্টিনের স্ত্রী এবং এমিলির অন্যতম প্রিয় বন্ধু সুজানের দীর্ঘ এক অবসাদ যা ক্রমশ ছেয়ে যায় এমিলির ভেতরেও। ১৮৮৩ সালে ভাইপো গিলবার্টের মৃত্যু, ওটিস লর্ডের পর আবার যক্ষ্মার করাল গ্রাস। এইসব মৃত্যুশোক নিয়েই এমিলি লিখেছিলেন, ‘The dyings have been too deep for me, and before I could raise my Heart from one, another has come.’

শরীর সঙ্গ দেয়নি। ব্রাইট’স ডিজিজের লক্ষণ একের পর এক। ১৮৮৪ সালে রান্না করতে করতে হঠাৎ ব্ল্যাকআউট। শেষের শুরু। ঘন ঘন মাথা যন্ত্রণা, শ্বাসকষ্ট এবং বমিভাব। ১৮৮৫ সালের ৩০ নভেম্বর অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায়, ভাই অস্টিন বাধ্য হয়ে বোস্টন ট্রিপ ক্যান্সেল করে ছুটে আসেন বোনের কাছে। শেষের দিকে কিছুই লিখতে পারতেন না। কবিতাগুলি লিখে কাগজের পর কাগজ সুতোর মালা দিয়ে সেলাই করা এমিলিয়ান লেগ্যাসি বন্ধ হয়ে গেছিল বছর খানেক আগেই। শুধু চিঠি বড়জোর। শেষ চিঠিতে দুই কাজিন লুইস এবং ফ্রাঙ্ক নারকোসকে লিখেছিলেন, ‘Little cousins, Called Back. Emily’। দীর্ঘ চিঠির জন্য একটা সময়ে সমার্থক হয়ে যাওয়া এমিলি ডিকিনসনের সেই শেষ চিঠি এবং শেষ শব্দ। ১৮৮৬। ১৫ মে। অস্টিন লিখছেন, ‘She ceased to breathe that terrible breathing just before the whistles sounded for six (p.m.)’। দ্য স্প্রিংফিল্ড রিপাব্লিকানে সুজান লিখলেন, - ‘A Damascus blade gleaming and glancing in the sun was her wit. Her swift poetic rapture was like the long glistening note of a bird one hears in the June woods at high noon, but can never see’। সাদা কফিনের দিকে তাকিয়ে টমাস হিগিনসনের কণ্ঠে এমিলির প্রিয় আরেক এমিলি, এমিলি ব্রন্টের কবিতা ‘নো কাওয়ার্ড সোল ইজ মাইন’। হিগিনসনের স্মৃতিতে সেই দিন। কবিতা থামিয়ে একবার সাদা কফিনের দিকে তাকিয়েছিলেন হিগিনসন, মনে হয়েছিল, “E.D.’s face a wondrous restoration of youth – she is 54 and looked 30, not a gray hair or wrinkle, and perfect peace on the beautiful brow. There was a little bunch of violets at the neck and one pink cypripedium; the sister Vinnie put in two heliotropes by her hand ‘to take to Judge Lord’”। প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে পড়ে এমিলির কবিতা এবং বারবার ছেয়ে যাওয়া মৃত্যুচেতনা। মৃত্যু নিয়েই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কবিতাটিতে এমিলি লিখেছিলেন – ‘Because I could not stop for Death-/ He kindly stopped for me -/ The Carriage held but just Ourselves -/ And Immortality.’

শেষটুকুতে একটু আয়রনি থাকুক। এমিলির সমাধি বলতে একটা সময় পর্যন্ত ‘ই.ই.ডি.’ আদ্যাক্ষর দিয়ে চিহ্নিত সাধারণ একটি গ্রানাইট পাথর ছিল। পরে মার্থা ডিকিনসন বিয়াঞ্চি একটি মার্বেল স্ল্যাব দিয়ে এপিটাফটি বদলে দেন। যোগ হয় একটি দুটি নতুন শব্দ। হিউ কনওয়ে-র একটি উপন্যাসের নাম। এবং আয়রনিকালি দুই কাজিনকে লেখা এমিলির শেষ চিঠির শেষ দুটি শব্দ – ‘Called Back’ ...

‘I heard a fly buzz – when I died –

The stillness in the Room

Was like the stillness in the Air -

Between the Heaves of Storm –

…..

With Blue – uncertain – stumbling Buzz –

Between the light – and me –

And then the Windows failed – and then –

I could not see to see –‘

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।