পরোয়া করেননি সরকারের রক্তচক্ষু! এনডিটিভি আদানির দখলে যাওয়ার পর কী করবেন রবীশ কুমার?

শাসকের বিরোধী মুখ হিসেবেই যাদের পরিচিতি ছিল তাদের সমর্পণে প্রশ্ন উঠেছিল, এবার কী করবেন রবীশ কুমার?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
পরোয়া করেননি সরকারের রক্তচক্ষু! এনডিটিভি আদানির দখলে যাওয়ার পর কী করবেন রবীশ কুমার?

"ভারতের নিউজ চ্যানেলগুলি অক্লান্তভাবে দেশের গণতন্ত্রকে খুন করেছে, যার ফলে মানুষ এখন এমন সব নিউজ চ্যানেলেরই কভারেজ শোনে, যা ভারতরাষ্ট্রকে কোনও প্রশ্ন করে বিচলিত করে না।" একটি অনুষ্ঠানে এভাবেই ভারতের 'গোদি মিডিয়া'-কে নিয়ে বলেছিলেন নিজেরই ভাষায় 'পৃথিবীর প্রথম এবং বিখ্যাত জিরো টিআরপি সঞ্চালক’ সাংবাদিক রবীশ কুমার। দীর্ঘদিন ধরেই এনডিটিভির একাধিক অনুষ্ঠানে কংগ্রেস সরকার থেকে মোদি সরকারের নীতির বিরোধিতা করে এসেছেন রবীশ। টিআরপি-র বিচারে ‘প্রাইমটাইম উইথ রবীশ’ অথবা ‘রবীশ কা রিপোর্ট’-এর জনপ্রিয়তা বরাবরই বেশি। কিন্তু ২৩ অগাস্ট একটি বিজ্ঞপ্তিতে আদানি গ্রুপ জানায়, এনডিটিভি-র ২৯.১৮ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। আরও একটা অংশ তারা কিনতে চায়, যদি এনডিটিভি রাজি হয়। বাকি অংশ কিনে নিলে সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণও আর থাকবে না এনডিটিভি-র হাতে। যে মোদি সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করে এসেছে এনডিটিভি, শাসকের বিরোধী মুখ হিসেবেই যাদের পরিচিতি ছিল তাদের এহেন সমর্পণে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি রবীশ কুমার পদত্যাগ করবেন এনডিটিভি থেকে?

সমস্ত জল্পনায় ইতি টেনে ট‍্যুইট করে রবীশ কুমার লিখেছেন, "প্রধানমন্ত্রী মোদি আমাকে সাক্ষাৎকার দেবেন কিংবা অক্ষয়কুমার আমার জন্য গেটের বাইরে আমের ঝুড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবেন, এসব যতখানি গুজব, এনডিটিভি থেকে আমি পদত্যাগ করছি, সেটাও একই ধরনের গুজব।"

রবীশ কুমারের জীবনে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগেও নিজের মাথা না-নোয়ানো সাংবাদিকতার জন্য একাধিকবার ঝুঁকির মুখে পড়েছেন তিনি। তাঁর সাংবাদিকতা সবসময়ই প্রান্তিক সত্যর উন্মোচন। নিজের দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে সত্যকেই টিভিতে, প্রকাশ্যে তুলে এনেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব থেকে শুরু করে বিজেপির আইটি সেলের প্রোপাগান্ডা- রবীশের প্রাইমটাইমে সবকিছুকেই তিনি যুক্তির আলোয় সাধারণ মানুষের কাছে ভুল প্রমাণ করে এসেছেন। মানুষ যখন খবরের প্রতি মুখ ফিরিয়েছে, তখন রবীশ কুমার লিখছেন, "হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি-র সমস্ত খবরই ভুয়া খবর। মানুষ এইসব খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করছে।"

কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হুমকি পান রবীশ। এই প্রসঙ্গে রবীশ কুমার লিখছেন, "আপনি যদি প্রশ্ন করেন, সেটা কখনও কখনও আপনার জীবনের জন্য ঝুঁকির হতে পারে। কিন্তু আমি যদি প্রশ্ন করা ছেড়ে দেই তাহলে আমি কোনওদিনই সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে পারব না।"

প্রান্তিক ভারতের কথা বলতে গিয়ে রবীশ কুমার বিশ্বাস করেন ভাষার রাজনীতিতে। এনডিটিভি-র যে ক'টি শো রবীশ কুমার করেন, বা যেখানে রবীশ বক্তব্য রাখেন, তাঁর হিন্দি যেন ভারতের প্রান্তের মানুষের মুখের ভাষা হয়ে ওঠে। মাজাঘষা ভাষায় যে ওই অদেখা-অচেনা ভারতের কাছে পৌঁছনো যাবে না, তা বিলক্ষণ বিশ্বাস করেন রামন ম্যাগসেইসেই-জয়ী সাংবাদিক রবীশ। অন্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলি যখন ‘গলাবাজি’-র সাংবাদিকতার পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তখনও রবীশ তাঁর প্রাইমটাইম সঞ্চালনা করেন, মানুষের কাছে সহজ ভাষায় সত্য খবর পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এক কথকের ভঙ্গিতে। নিজে সাংবাদিক হয়েও ভারতের সংবাদমাধ্যমের ওপর তেমন আস্থা বা বিশ্বাস নেই তাঁর। লেখেন, "সাংবাদিক হিসেবে যে আদর্শ আমরা শিখেছি, আজ আর তার কণামাত্রও অবশিষ্ট নেই। এখন কেবল যা হয়, সবই ধর্ম ও হিন্দু-মুসলিম নিয়ে। এখন সঞ্চালকরা সবাই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যস্ত। আর কেন মানুষ খবর দেখবে!"

২০১৯-এ যখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ঘোষণা করছেন, সেসময়ও নিজের অনুষ্ঠান ‘প্রাইমটাইম উইথ রবীশ'-এ মোদি সরকার ও ‘হিন্দু মিডিয়া'-র প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে একা মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন রবীশ। সরাসরি সাংবাদিকদের উদাসীনতাকে প্রশ্ন করে বলেছেন, "প্রত্যেক এক ব্যক্তিকেই কখনও না কখনও দিক বাছতে হয়। এটাই সময়। এখন যদি মানুষ দিক ঠিক করতে না পারে এই পরে আর দ্বিতীয় সুযোগ মিলবে না।" মোদি-শাহর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, "সরকার কি জানেনা দেশে পুরুষের থেকে ও মহিলাদের স্বাক্ষরতার হার কম? এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে তো জেনেশুনে প্রান্তিক মহিলাদের কে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল সরকার।"

নিজের এই অবিচল নির্ভীক সাংবাদিকতার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ২০১৩ ও ২০১৭ সালে তাঁর সাংবাদিক হিসেবে অবদানের জন্য পেয়েছেন রামনাথ গোয়েঙ্কা এক্সেলেন্স ইন জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড। ২০১৯ সালে পেয়েছেন সাংবাদিকতার অন্য আরেক সম্মান রামন ম্যাগসেইসেই অ্যাওয়ার্ড। ভারতে যেখানে সংবাদমাধ্যমের গলায় বকলস বেঁধে দিয়েছে মোদি সরকার, তখন রবীশ কুমারের ব্যাতিক্রমী স্বর সাংবাদিকতার কর্তব্য প্রমাণে নিরলস কাজ করে চলেছে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।