সম্পূর্ণ প্যারালাইজ়ড রোগীকেও হাঁটানো সম্ভব! পথ দেখাচ্ছে বিজ্ঞান

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
সম্পূর্ণ প্যারালাইজ়ড রোগীকেও হাঁটানো সম্ভব! পথ দেখাচ্ছে বিজ্ঞান

প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত শরীরকে অসাড় করে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে। একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী ও তাঁর পরিবারই বোঝেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল শরীর নয়, জীবন থামিয়ে দেয় এই সমস্যা প্যারালাইসিসের কারণগুলির মধ্যে অন্যতম স্ট্রোক, শিরদাঁড়ায় আঘাত, নার্ভের অসুখ প্রভৃতি। নড়াচড়ার বা হাঁটাচলার ক্ষমতা, শারিরীক অনুভূতি, ইন্দ্রিয়ের কাজ, স্বাভাবিক অভিব্যক্তি সবই প্রায় হারায় শরীরের যে অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয় - সেই অংশে।

সাধারণত প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত হওয়া অংশও তার আশেপাশের নার্ভকোশগুলির মৃত্যু (সেল ডেথ) হয়। প্যারালাইসিস সারিয়ে তোলা এখনও দুঃসাধ্য একটি বিষয়। তবে যদি নার্ভকোশগুলির যদি খুব অল্প সংখ্যায় মৃত্যু হয়, সে ক্ষত্রে প্যারালাইসিস প্রায় পুরোপুরো সারিয়ে তোলা যায়।

কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে যদি নষ্ট হয় নার্ভ কোশ,যদি সম্পূর্ণ ভাবে লোপ পায় হাঁটাচলার ক্ষমতা, ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি তাহলে? এবার সেই অসাধ্যকেই বাস্তবে পরিণত করলো প্রযুক্তি। স্পাইনাল কর্ডের ভয়াবহ আঘাতের পর, চলাফেরার ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়েও কেবল ইমপ্ল্যান্টের সাহায্যে পায় হাঁটতে পারলেন তিন ব্যক্তি। শুধু তাই নয় সাধারণ কাজ, সাঁতার কাটা, ট্রেডমিলে দৌড়নো সব কাজই করতে পারছেন তাঁরা শরীরে ইমপ্ল্যান্ট ইলেক্ট্রোডটি বসানোর পরে।

সুইস ফেডেরাল ইনস্টিট্যুট অফ টেকনোলজির নিউরোসায়েন্টিস্ট গ্রেগরি কার্টাইন সেই অসাধ্যসাধন করে দেখিয়েছেন ইমপ্ল্যান্ট ইলেক্ট্রোডটি অবিষ্কারের মাধ্যমে। তাঁর সাড়া জাগানো এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে নেচার মেডিসিন নামের সায়েন্টিফিক জার্নালে। গবেষকদের বক্তব্য প্রাথমিক ভাবে এই ইমপ্ল্যান্ট ইলেক্ট্রোডকে বানানো হয়েছে এমনভাবেই, যাতে এই ইমপ্ল্যান্ট ইলেক্ট্রোডটি কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে আসা সিগন্যাল বা বার্তাকে অনুকরণ করে শরীরের নিম্নাংশের প্যারালাইসিসে ভোগা রুগীদের হাঁটাচলা এবং ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তার আগে কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নার্ভগুলিতে বৈদ্যুতিক সঞ্চার ঘটিয়ে তাদের উদ্দীপিত করবে এই ইলেকট্রোড।

কী ভাবে ফিরে পেলেন তাঁরা সেই ক্ষমতা? কী ভাবেই বা কাজ করে সেই ইমপ্ল্যান্ট ইলেক্ট্রোডটি? তা জানার আগে সংক্ষেপে জানতে হবে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত ঠিক কেন হয়। প্যারালাইসিস হলে নার্ভের কার্যক্ষমতা লোপ পায়। শিরদাঁড়ার আঘাত বা স্পাইনাল কর্ড ইনজ্যুরির ক্ষেত্রেও শরীর আংশিক বা সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে যায়। শিরদাঁড়ার উপরের অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হলে শরীরে সম্পূর্ণ অসাড়তা দেখা যায় - ডাক্তারির ভাষায় একে বলে টেট্রাপ্লেজিয়া বা কোয়াড্রিপ্লেজিয়া। অন্যদিকে, আঘাত যদি শিরদাঁড়ার নিম্নভাগে লাগে, সে ক্ষেত্রে শরীরের নিম্নাংশ ও দুই পা অসাড় হয় - ডাক্তারির ভাষায় একে বলে প্যারাপ্লেজিয়া।

শরীরকে চালানোর জন্যে আমাদের কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গে বার্তা পাঠায়, যে বার্তা আসে নার্ভের মাধ্যমে। কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের আবার দুটি অংশ - মস্তিষ্ক এবং শিরদাঁড়া বা স্পাইনাল কর্ড। কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র থেকেই নার্ভগুলি এসে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে।

মজার বিষয় হল আমাদের নার্ভকোশগুলি বার্তা পাঠায় ইলেক্ট্রিক পরিবহনের মাধ্যমে। হ্যাঁ, অবশ্যই আপনার, আমার বাড়িতে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়, আমাদের শরীরের ইলেক্ট্রিক সরবরাহের তেজের সামনে তা অনেকগুণ বেশী। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে আসা বৈদ্যুতিক বার্তা নার্ভ কোশ গ্রহণ করে, আবার শরীরের অন্য অংশে পাঠিয়ে দেয়। যে অংশে পাঠায় সেই অংশে অনুভূতি সঞ্চারিত হয়, বা নড়াচড়া করে ওঠে একটি অঙ্গ।

প্যারালাইসিস বা পক্ষাক্ষাত হলে যখন স্নায়ুকোশগুলির মৃত্যু হয়, তখন শরীরের প্যারালাইজ়ড অংশে কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে বার্তা পাঠানোর কেউ থাকে না। ফলে প্যারালাইজ় অংশে না থাকে নড়াচড়ার ক্ষমতা, না থাকে অনুভূতি।

ইলেক্ট্রোডগুলি ক্ষতিগ্রস্থ নিউরোনগুলিকে উদ্দীপিত করবে। করবে। আর উদ্দীপিত নিউরোন থেকে ছড়িয়ে পড়া বৈদ্যুতিক বার্তা পৌঁছে যাবে শরীরের নিম্নাংশে। এবং হাঁটাচলা বা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করবে। ফলে প্যারালাইজ়ড অংশও আবার অনুভূতি পাবে এবং কাজ করবে আগের মতই।

অস্ত্রোপচারের সাহায্যে এই ইমপ্ল্যান্ট ইলেকট্রোডটি বসানো হয়েছে শরীরের সেই সব স্থানেই যেখানে স্পাইনাল কর্ড থেকে বেরিয়ে আসা মোটর নিউরোনগুলির প্রান্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছে। মোটর নিউরোন আমাদের হাঁটাচলা, নড়াচড়া, এবং ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। ইলেক্ট্রোডগুলি স্পাইনাল কর্ডের এই ক্ষতিগ্রস্থ নিউরোনগুলিকে উদ্দীপিত করবে।

ইলেক্ট্রোডগুলি বসানোর আগে পরীক্ষা করা হয়েছে কোনো ব্যক্তির জন্যে কতটা ইলেক্ট্রিক্যাল কারেন্ট আদর্শ। আরও মজার বিষয় হল, অস্ত্রোপচারের পরে প্রত্যেক ব্যক্তি রিমোটের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ইলেক্ট্রিকের মাত্রা। হাঁটবার সময় বা পা নাড়ানোর সময় কতটা ইলেক্ট্রিকের উদ্দীপনা দরকার রিমোটের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন তাঁরা নিজেরাই।

আপাতত এই ইলেট্রোডটি অস্ত্রোপচার করে বসানোর জন্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ। আপাতত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি সীমাবদ্ধ থাকলেও, ভবিষ্যতে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন এই গবেষণা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।