তাজমহল বনাম তেজো মহালয় || কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে

আইনজীবীর দাবি, বহু হিন্দু সন্তানদের মতে ‘তেজো মহালয়’ নামের শিব মন্দিরের ওপর তাজমহল তৈরি।

Kunal Roy
৪ মিনিট
তাজমহল বনাম তেজো মহালয় || কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে

“ইয়ে তো সিরফ ঝাঁকি হ্যাঁয়, কাশী-মথুরা অভি বাকি হ্যাঁয়”

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসকালে স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মাটিতে এই স্লোগান তোলে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। নরেন্দ্র মোদি ও ভারতীয় জনতা পার্টি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সেই স্বার্থান্বেষী হিন্দুত্ববাদীরা একে একে কাশী ও শ্রীকৃষ্ণজন্মভূমি মথুরার ধর্মস্থান থেকে মসজিদ স্থানান্তরের দাবি জানাতে থাকে। দুই সপ্তাহ আগে বারানসিতে আদালতের নির্দেশে পুরাতত্ত্ব বিশারদদের (এএসআই) তত্ত্বাবধানে বিশ্বনাথ মন্দির লাগোয়া জ্ঞানবাপি মসজিদে পর্যবেক্ষণকার্য শুরু হয় এবং, মথুরায় ১৬৭০ সাল নাগাদ (সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে) তৈরি শাহি মসজিদ ইদগাহ সরানোর দাবিতে আদালতে মামলা রজু হয়েছে ও চলছে।

যদিও স্বাধীন ভারতে ১৯৯১ সালে প্রণীত ধর্মস্থান আইনে বলা হয়, ১৯৪৭-র ১৫ অগস্ট থেকে যেখানে যে ধর্মস্থান রয়েছে, তা সেখানেই থাকবে।বাবরি ধ্বংসের এক বছর পূর্বের এই আইন মোতাবেক এই ধরনের সকল দাবিকেই অযৌক্তিক জ্ঞাতার্থে নাকচ করা যেতে পারে। এবার ধর্মনিরপেক্ষতার মাটিতে কলঙ্কস্বরূপ হিন্দুত্ববাদীদের নিশানায় উত্তরপ্রদেশ তথা ভারতের জনপ্রিয়তম ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ। বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি, ১৯৮৩-তে ইউনেসকো কর্তৃক বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত তাজমহল বা মুমতাজমহল।

আদৌ তাজমহল কোনদিন ‘তেজো মহালয় মন্দির’ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য একটি অনুসন্ধানী দল গড়ার আর্জি নিয়ে এলাহাবাদ হাই কোর্টের লখনউ বেঞ্চে আবেদন করে 'ভারতীয় জনতা পার্টি'-র অযোধ্যা শাখা। তাদের আইনজীবীর দাবি, বহু হিন্দু সন্তানদের মতে ‘তেজো মহালয়’ নামের শিব মন্দিরের ওপর তাজমহল তৈরি। এই নিয়ে এএসআই-এর তত্ত্বাবধানে অনুসন্ধান হোক এবং মহলের অন্দরে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাইশটি দরজা খোলা ও খতিয়ে দেখা হোক। এমনই এক দাবি করেন ২০০০ সালে পি. এন. ওক নামের আরেকজন।

১৬৩১ নাগাদ সম্রাট শাহজাহানের চতুর্দশ সন্তান কন্যা গৌহর বেগমের প্রসবকালে তাঁর স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মুমতাজ বেগম দেহত্যাগ করেন। এরপর স্ত্রী-শোকে কাতর সম্রাট তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সমাধিসৌধ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। ১৬৩২ সাল থেকে আনুমানিক ১৬৪৮ সালের মধ্যে মূল স্মৃতিসৌধ-র কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এরপরের পাঁচ বছরে বাকি ইমারত ও বাগান-বাগিচার কাজ সম্পূর্ণ হয় এবং সম্ভবত ১৬৫৩ সাল নাগাদ এই আশ্চর্য স্মৃতিসৌধ সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠা হয়। ১৬৬৩-তে ফ্রান্সিস বারনিয়ার নামে একজন ফরাসি পর্যটক আগ্রায় আসেন, তাঁর লেখাতেও প্রভূত প্রশংসা লক্ষ করা যায় এই সৌধের, রবি ঠাকুরের ভাষায় যা 'কালের গালে অশ্রুবিন্দু'।আজকের বিতর্কের মতোই প্রথম বিতর্ক ওঠে তখন, যখন ভারতে আসা ইউরোপিয়ানরাও বিশ্বাস করেননি, এই সৌধের নির্মাতারা ভারতীয়। মহলের স্থপতি হিসেবে আহমেদ লাহুরির নাম এলেও তাজমহল কোনও একজন ব্যক্তির দ্বারা নকশা করা নয়। বিভিন্ন উৎস থেকে তাজমহল নির্মাণে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। পারস্যদেশীয় স্থপতি ওস্তাদ ঈসা চত্বরের নকশা করেছিলেন। বড় গম্বুজটির নকশা করেছিলেন অটোমান সাম্রাজ্য থেকে আসা ইসমাইল খান, যাকে সে যুগের একজন প্রধান গম্বুজ নির্মাতা মনে করা হত। লাহোরের কাজিম খাঁ প্রধান গম্বুজের চূড়ায় স্বর্ণদণ্ডটি নির্মাণ করেছিলেন। দিল্লি থেকে আসা চিরঞ্জিলাল ছিলেন প্রধান ভাস্কর ও খোদাইকারক, এছাড়াও ছিলেন পারস্যের আমানত খাঁ, যাঁর নাম মহলের মূল প্রবেশপথে খোদাই করা আছে বলে জানা যায়। মোহম্মদ হানিফ ছিলেন প্রধান রাজমিস্ত্রি, এছাড়াও আরও অনেকের নাম উঠে আসে এই আশ্চর্যের কারিগর হিসেবে। তবে এই স্থাপত্যের নির্মাণে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন বহু স্থানীয় ভারতীয়ই। সারা এশিয়া এবং ভারত থেকে আনা বিভিন্ন উপাদান সামগ্রী দিয়ে এই সৌধ তৈরি।নির্মাণকাজের সময় হাজারের বেশি হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়, নির্মাণ সামগ্রী বহন করে আনার জন্য। আলো-প্রবাহী অস্বচ্ছ সাদা মার্বেল পাথর আনা হয়েছিল রাজস্থান থেকে।লাল, হলুদ বা বাদামি রঙের পাথর আনা হয়েছেল পাঞ্জাব থেকে। চিন থেকে আনা হয়েছিল কঠিন, সাদা, সবুজ পাথর, স্ফটিক টুকরো। তিব্বত থেকে সবুজ-নীলাভ রঙের রত্ন এবং আফগানিস্তান থেকে নীলকান্তমণি আনা হয়েছিল। উজ্জ্বল নীল রত্ন এসেছিল শ্রীলঙ্কা এবং রক্তিমাভা, খয়েরি বা সাদা রঙের মূল্যবান পাথর এসেছিল আরব থেকে। আঠাশ ধরনের মহামূল্যবান পাথর সাদা মার্বেল পাথরের উপর বসানো হয়েছিল বলে জানা যায়। তৎকালীন মূল্যে এই মহল তৈরির খরচ ছিল প্রায় ৩২ মিলিয়ন রুপি।

স্থাপত্যশৈলির দিক থেকে তাজমহল মুঘল স্থাপত্য হলেও ইন্দো-ইরানীয় স্থাপত্যসমূহ থেকে প্রভাবিত ছিল, মহলের বাগানও তৈরি হয়েছিল পারস্য ধাঁচে। খুব বৈজ্ঞানিকভাবে স্থাপিত এই সৌধের চারটি মিনার একটু বাইরে তৈরি করা হয়, যাতে কোনও অঘটনে মূল সৌধ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আলোক পরিবাহী মার্বেল পাথরের জন্য দিনের বিভিন্ন সময় তাজমহলকে বিভিন্ন রঙের দেখায়, কথিত আছে, এই পরিবর্তিত রংগুলি নারীর পরিবর্তনশীল মেজাজকে চিত্রিত করে। শেষ জীবনে শাহজাহান যখন পুত্রের হাতে দুর্গে বন্দি, তখন তিনি কেবল নীরবভাবে জানালা দিয়ে তাজমহলের দিকে চেয়ে থেকে দিন গুজরান করতেন।

উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশ সেনাদের দ্বারা এই মহল বিকৃত হয়।সৌধের গা থেকে দামি সমস্ত রত্ন খুলে নেওয়া হয়। পরে লর্ড কার্জন তাজমহলে কাজের নির্দেশ দেন ও একটি আলোকবাতি দান করেন। এই সময়ে বাগানও বিলাতি ধাঁচে হয়, যা এখনও বর্তমান। ভারতবাসী হিসেবে এই আশ্চর্য আমাদের গৌরবান্বিত করে এবং বিস্ময়বোধ জাগায় এর নির্মাণের বিষয়ে।

ভারতের মাটি এক বৃহৎ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস বহন করে, যা এই বিকৃত হিন্দুত্বের তুলনায় বহুমূল্য। ভারতে মন্দির বহু পরে তৈরি, মন্দির-মসজিদ পাশাপাশিই, এটাই সরল-স্বাভাবিক।সুতরাং, তাজমহলের ওপর ‘তেজো মহালয় মন্দিরের’ তত্ত্ব ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ওপরই আরেকটি আঘাত ছাড়া আর কিছু নয়, আদালতের সম্প্রতি এ দাবি নাকচ করাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

লিখেছেন
Kunal Roy
Kunal Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।