সাহিত্যে বারবার মেয়েদের জিতিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ

 

উনিশ শতকে নারীর অধিকার যখন অনেকটাই অকল্পনীয়, তখন রবীন্দ্রনাথ নারীকে তুলে এনেছেন তাঁর লেখনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে। সমাজের আবর্তে থেকেও তাঁর নারীরা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গলা তুলেছেন। নারীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন: স্বাধীনচেতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ও সাহসী হিসেবে। শাস্ত্রে মেয়েদের বলা হয় ‘পূজার্হা গৃহদীপ্তয়’। কিন্তু রবীন্দ্রচেতনায় নারীকে গৃহলক্ষ্মীর সম্মানে অধিষ্ঠিত দেখার চেয়ে পুরুষের হৃদয়েশ্বরীরূপে দেখার প্রবণতা বেশি। রবীন্দ্রনাথের গল্পে নারীমুক্তির দরজা খুলেছে। নারীকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, দাঁড় করিয়েছেন পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে।

 


রবীন্দ্র-সাহিত্যে আমরা বেশ ক’জন নারীকে পাই যাঁরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে আলো জ্বালিয়েছেন। 'স্ত্রীর পত্র'-তে মৃণাল চরিত্রে এঁকেছেন নারীর সামাজিক স্বাধীনতার কথা। যেমনটা এনেছেন, ছোটগল্প 'সমাপ্তি'-র মৃন্ময়ী, 'ল্যাবরেটরি'-র সোহিনী অথবা 'শাস্তি'-র চন্দরা চরিত্রের মাধ্যমে।

 


আর 'শেষের কবিতা'-য় লাবণ্য এসেছে তৎকালীন সমাজে নারী-বন্দিত্বের গতানুগতিক প্রথা ভাঙা আধুনিক ভূমিকায়, যাঁকে আমরা দেখেছি মুক্ত, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে। প্রেমের পাশাপাশি লাবণ্যর এই পরিচয়টাই ছিল উপন্যাসের মূল কথা। এভাবেই রবীন্দ্র-সাহিত্যের সব নায়িকাই নারীমুক্তির মশাল জ্বেলেই উদ্ভাসিত হয়েছেন। তাই তো 'চিত্রাঙ্গদা'-য় মণিপুর নৃপদুহিতার কথাগুলো আজকের নারীরও আশ্রয়:

"পূজা করি মোরে রাখিবে মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে
পিছে, সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ
মোরে সংকটের পথে, ….
যদি সুখে দুঃখে মোরে কর সহচরী,
আমার পাইবে তবে পরিচয়।…"

 

 

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথের আত্মাও ধ‍রা দিয়েছিলেন প্ল্যানচেটে?

 

 

নিরুপমা, হৈমন্তী, মৃণাল, কল্যাণী, অনিলা- এই পাঁচজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঁচটি বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দেনাপাওনা’, ‘হৈমন্তী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘অপরিচিতা’ ও ‘পয়লা নম্বর’-এর নায়িকা।

 

 

‘দেনাপাওনা’ গল্পে দেখা যায় মধ্যবিত্ত বাবা রামসুন্দরের আদরের মেয়ে নিরুপমা। জমিদার রায়বাহাদুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পুত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে অনেক টাকা পণ স্বীকার করে বাবা। নিরুপমা সুন্দরী। কিন্তু সেই রূপের কোনও কদর বা আদর তার শাশুড়ির কাছে নেই। গল্পেও আমরা দেখি, পণের পুরো টাকা দিতে পারেনি বাবা। তাই শ্বশুরবাড়িতে সে শাশুড়ির প্রবল নির্যাতনের শিকার। মেয়েকে সুখী করতে শেষ সম্বল, তাদের বাড়ি বিক্রি করে দেন বাবা। কিন্তু নিরুপমা টাকা দিতে বাধা দেয়। "টাকা যদি দাও তবেই অপমান। তোমার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নেই। আমি কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম। না বাবা, এ টাকা দিয়ে তুমি আমাকে অপমান কোরো না"- এই একটিমাত্র সংলাপে নিরুপমার ব্যক্তিত্ব ঝলসে উঠতে দেখা যায়। তাঁর এই উক্তি চিরকালীন পণপ্রথার মুখে একটা সজোরে থাপ্পর।

 


নিরুপমার চেয়েও বিকশিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হৈমন্তী। সে শৈশবে মাতৃহীন এবং বাবার আদরের মেয়ে। হৈমন্তীর মধ্যেও অনেকটা মাধুরীলতার ছায়া দেখতে পাওয়া যায় । হৈমন্তীও সুন্দরী। সে তার বাবার সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলে মুক্ত পরিবেশে বড় হয়েছেন। তার বাবা গৌরসুন্দর যেন রবীন্দ্রনাথেরই প্রতিরূপ। বাবা-কন্যার মধ্যে স্নেহ ও বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যেও কবি ও কবিকন্যার প্রতিফলন দেখা যায়। নিরুপমার চেয়ে হৈমন্তী মানসিকভাবে আরও অনেক দৃঢ় চরিত্রের। হৈমন্তী সবকিছু হেসে উড়িয়ে দিলেও অপমানের কণ্টকশয়নে থাকায় ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। একসময় মৃত্যু হয় এই প্রবল আত্মবিশ্বাসী নারীর। হৈমন্তী বেঁচে থাকতে তার প্রাত্যহিক নিপীড়নের গণ্ডি থেকে বের হতে পারেননি। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়েছিল মৃণালের ক্ষেত্রে। শ্বশুরবাড়ির লোকরা তার রূপের কথা ভুলে গেলেও সে যে বুদ্ধিমতী, সেটা তারা ভুলতে পারেননি।

 


মৃণাল সহজ, স্বাভাবিক বুদ্ধির অধিকারিণী। তাই অন্যায় দেখলে এর প্রতিবাদে সত্য কথাটি তিনি সহজে উচ্চারণ করতে পারেন। আর তাই শ্বশুরবাড়িতে তাকে প্রতি পদে হেয় করার চেষ্টা চলে। তবে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মৃণাল সেসব তুচ্ছ করে তার প্রতিবাদী ভূমিকা ধরে রাখে। সংসারে নারীর অবস্থান যে কত দুঃসহ তা নতুন ভাবে উপলব্ধি করেন মৃণাল। একসময় সাংসারিক বন্দিদশা থেকে নিজের মুক্তির পথ খুঁজে নেয় মৃণাল। সে পুরীর তীর্থক্ষেত্রে চলে যায়। বাঙালি ঘরের একজন কুলবধূর এই সাহসী ভূমিকা ছিল চমকপ্রদ। মৃণাল নিজেই বলে, সে আত্মহত্যা করবে না বরং স্বাধীনভাবে বাঁচবে। "মীরাবাইকে তো বাঁচার জন্য মরতে হয়নি।" 'স্ত্রীর পত্র'-র শেষ লগ্নে এসে শোনা যায় মৃণালের দৃপ্ত ঘোষণা:
"...মীরাবাঈ তার গানে বলেছিল,'ছাড়ুক বাপ, ছাড়ুক মা, ছাড়ুক যে যেখানে আছে, মীরা কিন্তু লেগেই রইল, প্রভু-- তাতে তার যা হবার তা হোক।' এই লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকা। আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।
তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন-
মৃণাল।‘’

 

 

‘শেষের কবিতা’-র লাবণ্য, ‘ল্যাবরেটরি’-র সোহিনী, ‘দুই বোন’-এর শর্মিলা ও ঊর্মিলা, ‘গোরা’-র সুচরিতা, ‘নৌকাডুবি’-র হেমনলিনী, ‘নষ্টনীড়’-এর চারুলতা, ‘ঘরে বাইরে’-র বিমলা, ‘চোখের বালি’-র বিনোদিনীর তুলনা বাংলা সাহিত্যে বিরল। বিচিত্র সব নারীচরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাটকেও। ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনী, ‘রাজা ও রাণী’-র রাণী , ‘মায়ার খেলা’-র প্রমদা সকলেই অনন্যা।

 

 

রবীন্দ্রমানসে নারী শুধুই কোমলতা, স্নেহ বা প্রেমের প্রতিভু নন বরং অনেক সময়ই নারী নীতির প্রশ্নে আপসহীন, সভ্যতার সংকটে বিবেক এবং সমাজ-কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে চিত্রিত। রবীন্দ্রবিশ্বের নারীরা পুরুষের ছায়ামাত্র নয়, যা সেযুগের প্রেক্ষাপটে খুবই স্বাভাবিক বলে গণ্য হতে পারত। বরং যুগের তুলনায় আশ্চর্যরকম অগ্রসর তাঁর নারীচরিত্ররা।

 

 


ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন কাদম্বরী, জ্ঞানদানন্দিনী, স্বর্ণকুমারী, সরলা ঘোষাল, ইন্দিরা দেবীর মতো বিশিষ্ট প্রতিভার অধিকারী নারীদের। সেইসঙ্গে নিজের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা মাধুরীলতা, রেণুকা, মীরাদেবীর মতো নারীর ছায়াও প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে। নিঃসন্তান কাদম্বরী দেবীর বিপুল নিঃসঙ্গতা এবং নিঃসন্তান ও অকালমৃত বড় কন্যা মাধুরীলতাও নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছেন তাঁর লেখায়। তাঁর তিন কন্যার একজনও দাম্পত্যজীবনে সুখী ছিলেন না। সেই অসুখী দাম্পত্যের প্রতিফলন ও আত্মহত্যাকারী কাদম্বরীর আদিগন্ত অভিমানের ছোঁয়াও পাওয়া যায় তাঁর সৃষ্টির ভুবনে আকাশচারী নারীদের মানসে।

 


রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতায় নারীদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। 'সাধারণ মেয়ে'-র মালতী শরৎবাবুর গল্পের মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চেয়েছেন নরেশ সেনের অবহেলাকে। 'সবলা'-য় শোনা যায় চিরকালীন নারীমুক্তির আওয়াজ:


"নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার
হে বিধাতা?...’’

More Articles

;