বঙ্গভঙ্গ বিরোধী কলকাতা সাক্ষী দেশের প্রথম জাতীয় পতাকার

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী কলকাতা সাক্ষী দেশের প্রথম জাতীয় পতাকার

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। রণক্লান্ত ভারতবাসী পেল বহু আকাঙ্খিত মুক্তির স্বাদ।দেড়শো বছর ধরে ইংরেজ কর্তৃক পদদলিত হবার পর স্বাধীনতার সূর্যে উদ্ভাসিত হলো দিগন্ত। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদের বৈঠকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো ভারতের জাতীয় পতাকাকে, যে পতাকা পক্ষান্তরে ছিল বহু যুদ্ধের সাক্ষী বহু বলিদানের নেপথ্য নায়ক।

পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার ' কলের কলকাতা ' রচনায় লিখেছিলেন ,জাপানি বোমাতে নিস্পৃহ থাকা কলকাতা ঘাড় গুঁজে থাকা আপিস যাও আর বাড়ি ফেরোর কলকাতা হঠাৎ হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে ইংরেজদের বিরুদ্ধে,প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়ে,গর্জন করে ওঠে বন্দে মাতরম ধ্বনিতে। আক্ষরিক অর্থে বুড়ো কলকাতা তার বুকের গভীরে জমিয়ে রাখে হাজারো ইতিহাস,যার অনেকটাই প্রতিস্পর্ধা আর প্রতিবাদের।

সালটা ১৮৮৩,সময়টা উত্তাল।কলকাতা তখনও ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের রাজধানী।সমগ্র ভারতে স্বাধীনতার আগুন জ্বলছে পুরোদমে।ব্রিটিশ সরকারের শাসন আর শোষণের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী।প্রতি মুহূর্তে তারা যেনো বুঝিয়ে দিতে উদগ্রীব তারা শাসক ভারতবর্ষ শাসিত।সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ' কলের কলকাতা ' - তেই তুলে ধরছেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক খণ্ডচিত্র - " ধর্মতলার চৌমাথা থেকে দূরে দেখা গেল একটা মিছিল।লাল,সবুজ আর তিনরঙা নিশান গিঁট দিয়ে বাঁধা।এগিয়ে এল মিছিল।যাবে দক্ষিণে।"

সুভাষ মুখোপাধ্যায় আরও লিখছেন, "মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মিনিটে একজন করে বুলেট বেঁধা লোক আসছে।কাউকে কাউকে হাসপাতালে না নামিয়ে সোজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মর্গে।যাদের আত্মীয়স্বজন আছে,তাদের ঘিরে আকাশবাতাস জুড়ে বুকফাটা চিৎকার উঠেছে।"

এই লেখা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইংরেজদের শাসন এবং শোষণের চিত্রটি।কিন্তু এরই পাশাপাশি আরও একটি ছবি কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না যে ইংরেজদের শত অত্যাচারও ভারতবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিন্দুমাত্র স্তিমিত করতে পারেনি।অন্যদিকে ঠিক এই সময়ই এক বাঙালি স্থান করে নিলেন ইতিহাসের পাতায়,সৌজন্যে তার তৈরি পতাকা। শ্রীশচন্দ্র বসু ছিলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সোসাইটির সদস্য।তার হাত ধরেই তৈরি হলো ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা। যদিও সূর্যের প্রতীক দেওয়া সেই পতাকা পরবর্তীকালে প্রচারের আড়ালে চলে যায় কিন্তু এর পূর্বে ভারতের সর্বজনস্বীকৃত কোনো পতাকার খোঁজ পাওয়া যায় না। এমনকী সিপাহী বিদ্রোহ হয় দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের সবুজ জাফরের পতাকাকে সঙ্গী করেই।

এরপর চলে যাওয়া যাক ১৯০৫ সালে। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় উদ্বেল আপামর ভারতীয়।লর্ড কার্জনের একটি সিদ্ধান্ত যেনো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সেদিন ঘৃতাহুতি করেছিল।রাস্তায় নামলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। রাখির বাঁধনে বাঁধলেন আট থেকে আশি সক্কলকে।এই সময়েই ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন গুপ্ত সংগঠনগুলি।সেই সময় পার্সিবাগান অঞ্চলে যুগান্তর গোষ্ঠীর বিপ্লবী তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।শ্রীশ চন্দ্র বসু পরবর্তী প্রজন্মের হাতে যে জয়পতাকা বহনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাই সুচারুভাবে বহন করেছিলেন যুগান্তর গোষ্ঠীর সদস্যরা।তারাও একসময় সিদ্ধান্তে এলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিপূর্ণতা অর্জন এবং সমস্ত বিপ্লবী সংগঠনগুলিকে এক ছাতার তলায় আনতে অবিলম্বে প্রয়োজন একটি জাতীয় পতাকার।সেইমতো পতাকার নীল নকশা তৈরীর গুরুভার অর্পিত হলো অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সম্পাদক শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এবং সুকুমার মিত্রের হাতে।

১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট।কর্মব্যস্ত কলকাতা তখন সবে একটা নতুন কর্মমুখর দিন উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় কলকাতার গ্রীয়ার পার্কে উত্তোলিত হল এই জাতীয় পতাকা।ব্যারিস্টার প্রমথনাথ বসু উত্তোলন করেছিলেন পতাকাটি যার ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয় দুই বাঙালির হাতেই।একজন শচীন্দ্র প্রসাদ বসু অন্যজন সুকুমার মিত্র।

স্বাধীনতা সমতা এবং সৌভ্রাতৃত্ব এই ছিল কলকাতার বুকে উত্তোলিত জাতীয় পতাকার মূল বিষয়। ফরাসী জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি এই পতাকাটি পরবর্তীতে পরিচিতি পায় ' ক্যালকাটা ফ্ল্যাগ ' নামে।

কে ভি সিং জানান, অনুভূমিক এই পতাকায় ছিল সবুজ হলুদ এবং লাল এই তিনটি রঙের আধিক্য।হলুদ অংশে লেখা থাকত ' বন্দেমাতরম ' সবুজ অংশে ছিল আটটি পদ্ম আবার লাল রঙের বামদিকে ছিল সূর্য ডানদিকে ছিল চাঁদ - তারা যা ছিল হিন্দু মুসলিমের সৌভাতৃত্বের প্রতীক। আশ্চর্যের কথা ১৯০৬ সালে যে কলকাতায় হিন্দু - মুসলিমরা সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে নির্মিত হচ্ছে ভারতের জাতীয় পতাকা ১৯৪৬ সালে সেই কলকাতায় রক্তরাঙা হয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িকতার রক্তে। রাজনীতি কত বিচিত্র!

১৯০৭ সালের ২২এ আগস্ট জার্মানির মাটিতে ক্যালকাটা ফ্ল্যাগের অনুসরণে আরও একটি পতাকার আবির্ভাব ঘটে মাদাম ভিবাজির হাতে।এরপর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ১৯২৯ এর ৩১এ ডিসেম্বর।এই দিনই ভারতের জাতীয় কংগ্রেস স্বীকৃতি দেয় ' ক্যালকাটা ফ্ল্যাগকে।'

এভাবেই কল্লোলিনী তিলোত্তমা শোনায় প্রতিস্পর্ধা আর শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ করার গল্প।একটি পতাকা কলকাতার মাটিতেই জন্ম দিয়েছিল এক ইতিহাসের। কিন্তু শুধুই কি ইতিহাস? নাকি সে রূপকথার গল্প? ঠাকুরমার ঝুলি উপুড় করে যে গল্প শুনিয়েছে শহর কলকাতা। আত্মবিস্মৃতিতে আচ্ছন্ন বাঙালি কি সেই ইতিহাসকে মনে রেখেছে?

তথ্যসূত্র - ' কলের কলকাতা ' - সুভাষ মুখোপাধ্যায়

কলকাতার সাতকাহন

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।