রাখিস মা রশেবসে, এ যেন খাদ্যপ্রেমী সচিনের হৃদয়ের কথা

Sindhu Som
৩ মিনিট
রাখিস মা রশেবসে, এ যেন খাদ্যপ্রেমী সচিনের হৃদয়ের কথা

সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। নব্বইয়ের দশকের সমস্ত ছেলেবেলা জুড়ে এই কিংবদন্তির পায়ের ছাপ। গ্রাম থেকে শহর মেতে থাকত ছোটখাটো এই যুবকের বিরাট স্কোরের আশায়। পাড়ায় পাড়ায় গলিতে গলিতে প্রথমে রেডিও, পরে টিভির পর্দায় ক্রমে তিনি কখন যেন বাঙালিরও পরমাত্মীয় হয়ে গিয়েছেন। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না বিশ্ববিখ্যাত এই ক্রিকেটার খেতে ঠিক কতটা ভালোবাসেন। খেলার মাঠ ছাড়িয়ে এই ক্ষেত্রটিতেও ব্যাট নিয়ে ঢুকে পড়েছেন তিনি। ফলত ক্রিকেটের পাশাপাশি সচিনের খাওয়া নিয়েও বহু জনশ্রুতি তৈরি হয়েছে। তাঁর হাল জীবন নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। উপস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় নাটকীয়তাও জনশ্রুতির পালে হাওয়া লাগিয়েছে। এর মধ্যে কিছু সত্যি, কিছু আখ্যান অভীপ্সা। আজ তার মধ্যে থেকে খুঁজে নেওয়া যাক কিছু সত্যি আখ্যান।

কলকাতার মেজাজে

রেস্তোরাঁর নাম যখন ‘কট অ্যান্ড বোল্ড’, তখন ক্রিকেটাররা সেখানে চট করে যে যাওয়া আসায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। তবে কলকাতায় এসে কলকাতার মেজাজ নিয়ে সেই রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিলেন সচীন-সহ গোটা ভারতীয় টিম। ভেটকি পাতুরি আর সোনালি রং ধরা চিংড়ি ফ্রাই-- এই ছিল তাদের সেদিনকার অর্ডার। অবশ্য সেখানেই থেমে থাকেনি ব্যাপারটা। শুক্লা পালের কাছ থেকে শেষের গোটা সপ্তাহ সচিন মটন বিরিয়ানি, লবস্টার কারি, প্রন কারি, ভেটকি মেন্যে অর্ডার করে গিয়েছিলেন ক্রমাগত।

ভেটকি মেনে, ছবি-ফেসবুক।

বাজে খাবারের অভিজ্ঞতা রয়েছে সচিনেরও

বাজে খাবারের প্রসঙ্গ আসায় সচিন জানিয়েছিলেন এক বিশ্রী অভিজ্ঞতার কথা। সস্ত্রীক একবার শামুক খেয়েছিলেন তিনি। রসুনের সসে ডোবানো সেই শামুক হজম করতে নাকি বেগ পেতে হয়েছিল বেশ। সামুদ্রিক খাবার খুব পছন্দ হলেও এরপরে আর জীবনে শামুক ছুঁয়ে দেখেননি খেলোয়াড়। আরেকবার নাকি তাঁকে পচা খাবার দেওয়া হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতাই সচিনের মতে জঘন্যতম।

পাকিস্তানের স্ট্রিট-ফুড

পাকিস্তানের স্ট্রিট-ফুডের সঙ্গে সচিনের ক্রিকেটে আসা ইস্তক পরিচয়। পাকিস্তানে যখন প্রথম খেলতে গেলেন, তখন বয়স ১৬। শোনা যায়, রোজ সকালে বরাদ্দ ছিল খানকতক কিমা পরোটা আর লস্যি। এই খেয়ে দিন শুরু করতেন, লাঞ্চে খেতেন না কিছুই, একেবারে রাতের খাবার। অথচ সারাদিন না খেয়েও ট্যুর শেষে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন চেহারা নাকি আরও খোলতাই হয়েছিল তাঁর।

দিল্লিতে

আইটিসি মোরিয়ার ‘বুখারা’-টিকে দিল্লির সবথেকে ভালো ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁ বলা হয়। ১৯৭৭-এ তৈরির পর থেকে এই পাঁচতারা রেস্তোরাঁ মেনুতে অদলবদলই করেনি খুব একটা। বিল ক্লিণ্টন, বিল গেটস্‌, ব্রায়ান অ্যাডম, মহম্মদ আলি পর্যন্ত এখানকার বিখ্যাত দাল মাখানি আর কাবাব খেয়ে গিয়েছেন। এই রেস্তোরাঁ সচিনের অন্যতম প্রিয়।

মুম্বইয়ের সি-ফুড

২০০৬ সালের ঘটনা। সচিন তখন একটা বিজ্ঞাপনের শ্যুটিংয়ে এসেছেন। হঠাৎ কাজের মাঝেই মাছ খেতে ইচ্ছে করল। স্টুডিওর মালিক তখন ফোন করলেন ফার্নাণ্ডেজকে। ফ্রান্সিস ফার্নাণ্ডেজ ‘মহিমস্‌ ফ্রেশ ক্যাচ’ বলে একটি রেস্তোরাঁর মালিক। ব্যাস। ফ্রেশ ক্যাচের সঙ্গে কাকতালীয় ভাবে ঘটে যাওয়া এই যোগাযোগ ইতিহাস হয়ে রয়ে গিয়েছে। এছাড়া সি-ফুডের জন্য ‘গলাজি’ রেস্তোরাঁও অত্যন্ত পছন্দ করেন সচিন।

গোয়ার আবিষ্কার

বেতালবতিমের মার্টিনস্‌ কর্নার লিটল মাস্টারের আরেকটি প্রিয় রেস্তোরাঁ। বছর ৩৪ আগে একটা টিন ঢাকা ঘরে মার্টিন এবং ক্যারাফিনা পেরিরা এই সামুদ্রিক খাবারের দোকান শুরু করেন। তখন সন্ধেবেলায় স্থানীয় লোকেদের মাছভাজাই খাওয়াতেন তাঁরা। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে শচীন আবিষ্কার করে ফেলেন এই গুপ্তধনের ভাণ্ডার। এরপরে তাঁর রকমারি অর্ডারের সঙ্গে তাল রাখতে রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছিল ছোট্টো এই দোকানটিকে। কখনও ব্যাটার ফ্রায়েড কালামারি, কখনও ক্র্যাব জেক-জেক, আবার কখনও শার্ক-অ্যাম্বোটিক। মার্টিন মারা গিয়েছেন। লিটল মাস্টারের এখানকার কী খেতে বেশি পছন্দ করেন–জিজ্ঞাসা করা হলে ক্যারাফিনার ছেলে হোসে জানান, মিরিয়াড গোয়ান মশলা দিয়ে ডগি ব্যাগ ব্রিমিং এবং মশলাদার ক্র্যাব স্টাফড।

ক্র্যাব জেক জেক, ছবি-ফেসবুক১৭ বছর বয়েসি তেণ্ডুলকরকে একবার প্রিয় খাবার সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হয়। মূলত ভারতীয় খাবার, অবশ্যই মুরগি—এর বেশি কিছু বলে উঠতে পারেননি সেই কিশোর। তারপর দিন কেটে গিয়েছে। বর্তমানে সেই কিশোর প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। ইতিমধ্যে তার সি-ফুড প্রেমের কথা জেনে গিয়েছে বিশ্ব। জিম্বাবোয়ের বার্বিকিউ থেকে লণ্ডনের সুসি—ঘটে গিয়েছে কতশত ঘটনা। ৯৭-৯৮ নাগাদ অজয় জাদেজার বাড়িতে গোটা ভারতীয় দলের জন্যে বেগুন-ভর্তাও বানিয়ে ফেলেছেন। ঘরে শেফ হিসেবে নামডাক হয়েছে। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়াতেন ভালোবাসেন বলে জানা গিয়েছে, এমনকী সুরেশ রায়নাকে সুশি ও সাশিমি খেতে সচিনই শিখিয়েছিলেন। ক্রিকেটের দুনিয়ার কিংবদন্তীর হাতে এখন দুটি রেস্তোরাঁ, মার্স রেস্তোরাঁর সঞ্জয় নারঙ্গের সঙ্গে যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে, মুম্বইয়ের ‘তেণ্ডুল্করস্‌’ এবং মুম্বই ও ব্যাঙ্গালোরের ‘সচিনস্‌’।

তথ্যঋণ-

“Food for Thought.” n.d. Accessed December 16, 2021.

“Meet Sachin Tendulkar, a Foodie at Heart.” n.d. NDTV Food. Accessed December 16, 2021.

Samosa, Local. 2020. “Know About Sachin Tendulkar’s Favourite Food And Memorable Places.” Local Samosa (blog). April 24, 2020.

The Times of India. 2013. “Sachin Tendulkar: Master Foodie,” November 14, 2013.

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।