জেলে কেরানির কাজ করবেন সিধু, লালু থেকে চিদম্বরম – কেমন ছিল জেলকুঠুরির জীবন

জেলে সিধুর জন্য ডায়েটে চমক! আপাতত পাটিয়ালা সেন্ট্রাল জেলে দিন কাটছে পাঞ্জাবের প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধানের। জেলে তাঁকে কেরানির কাজ দিল কর্তৃপক্ষ। সাত নম্বর বারাকে বসেই কেরানির কাজ করবেন কয়েদি নম্বর ২৪১৩৮৩। নিরাপত্তার কারণে কুঠুরি থেকে বেরোবেন না। চলবে ‘‌ওয়ার্ক ফ্রম সেল’‌। সেখানেই পাঠানো হবে ফাইল।


কাজের জন্য যেমন বিশেষ পরিবেশ, তেমনই খাবার–দাবারেরও আলাদা ব্যবস্থা। সেই নিয়ে আদালতে আবেদন করেছিলেন তাঁর আইনজীবী। জানিয়েছিলেন, তাঁর ৫৮ বছরের মক্কেল আটা, ময়দা, চিনি খান না। লিভারের সমস্যা রয়েছে। বিশেষ ডায়েট বরাদ্দ করা হোক। আদালত মেনে নিয়েছে। এর ফলে তাঁর পাতে যে সব খাবার উঠবে, তা পাঁচতারায় একমাত্র মেলে।

সব রান্না হবে অলিভ তেলে। সকাল শুরু হবে চা আর ডাবের জল দিয়ে। এর পর ল্যাকটোজ ফ্রি দুধের সঙ্গে চিয়া, সূর্যমুখী, ফ্লাক্স সিড খাবেন। সঙ্গে আমন্ড। এর পর বিটরুট বা অ্যাভোকাডের জুস। সঙ্গে কিউয়ি বা তরমুজ বা আপেল বা পেয়ারার মতো ফল। দুপুরে পানিফল আর বাজরার আটার রুটি। সঙ্গে স্যতে করা সবজি। সন্ধেবেলা ছানা বা টোফু। এক কাপ চা, চিনি ছাড়া। রাতে এক বাটি সবজি, ডালের স্যুপ।


কাজের জন্য সিধুকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কী ভাবে আদালতের দীর্ঘ রায় সংক্ষিপ্ত করে লিখতে হয় এবং জেলের বিভিন্ন নথি সংরক্ষণ করতে হবে তিন মাস ধরে তা-ই শেখানো হবে সিধুকে। তবে জেলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম তিন মাস সিধুকে কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। প্রশিক্ষণ শেষের পরে তাঁকে প্রতিদিনের পারিশ্রমিক বাবদ ৪০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে। তবে তিনি কত টাকা মজুরি বাবদ পাবেন, তা নির্ভর করবে তাঁর কাজের দক্ষতার উপর। সকাল ৯টা থেকে ১২টা এবং বিকেল ৩টে থেকে ৫টা পর্যন্ত সিধুকে কাজ করতে হবে। জেল থেকে আয় তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে বলেও জেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে।

 

আরও পড়ুন-রাজীব হত্যার অভিযোগে জেল কুঠুরিতে কাটল ৩১টা বছর! কেমন ছিল নারকীয় দিনগুলো?

 

সশ্রম কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস বন্দিকে কাজ শেখানো হয়। ওই সময় তিনি বেতন পান না। পরে অদক্ষ, আধাদক্ষ ও দক্ষ কর্মী হিসাবে তিনি দিনে ৩০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। বেতন সরাসরি বন্দির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।


তবে শুধু সিধুই নয়, এর আগে দেশের বহু গণ্যমান্য রাজনৈতিক নেতাই জেলকুঠুরির ভিতর জীবন কাটিয়েছেন। ঘটেছে বহু নাটকীয় ঘটনা।

জেলে পৌঁছেছিলেন লালু ভক্তরা


পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা। যেমন- দুমকা, দেওঘর ও চাইবাসা কোষাগার সংক্রান্ত মামলা। বারবার বিভিন্ন সময় জেলে গেছেন বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। মজার ব্যাপার হল, তিনি জেলে গেলেই তাঁকে সেবা করতে আগেভাবে জেলে পৌঁছে যান দুই সাগরেদ।


রাঁচি পুলিস ও বিরসা মুন্ডা জেলের রেকর্ড বলছে, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লালুপ্রসাদ যখন চাইবাসা ট্রেজারি মামলায় পাঁচ বছরের জন্য দণ্ডিত হয়ে বিরসা মুন্ডা জেলে গিয়েছিলেন, তার কয়েকদিনের মধ্যেই একটি মামলায় বিচারাধীন বন্দি হয়ে জেলে হাজির হয়ে যান মদন যাদব। ২৩ ডিসেম্বর আরজেডি-প্রধান পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির দেওঘর ট্রেজারির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে বিরসা মুন্ডা জেলে যান। আগেই ওই জেলে কয়েদি হিসেবে পৌঁছে যান মদন। সেবার তাঁর সঙ্গী হয়ে জেলে হাজির হন লক্ষ্মণ মাহাতোও। তাঁরা নাকি `নেতাজি লালু’কে সেবা করার জন্য জেলে যান।


এদিকে তিনি জেলে গেলে তাঁকে দেখার জন্য লাইন পড়ে যায় জেলের বাইরে। কারও হাতে পছন্দের স্ন্যাকস, কেউবা আসেন ফল-মূল, বাড়ির খাবার নিয়ে। সুখের দিনে ইতি পড়তে সময় লাগেনি, কারণ জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয় এসব চলবে না।

 

জেলে `নো স্পেশাল’ চিদম্বরম


হাসিমুখে জেলে যান পি চিদম্বরম। সিবিআই চিদম্বরমকে হেফাজতে না চাওয়াই শেষপর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে যেতে হয় তাঁকে। যার পরিণতি স্বরূপ তিহার জেলে রাত কাটাতে হয় প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীকে। তিহারের ৭ নং জেলে ঠাঁই হয় চিদম্বরমের। তাঁর ছেলে কার্তিও এই কুঠুরিতেই ছিলেন। চিদম্বরমকে কোনও ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়নি। তাঁর জন্য একটা আলাদা কুঠুরি বরাদ্দ হয়েছিল। আর বরাদ্দ করা হয়েছিল বিলেতি শৌচাগার। তাঁকে খেতে দেওয়া হয় জেলের খাবার (ডাল, একটি সবজি আর ৪-৫টি রুটি)। সঙ্গে রাখতে দেওয়া হয় ওষুধ ও সংবাদপত্র। বাড়ি থেকে আনা পোশাক পরার ছাড় ছিল। তবে, তাঁকে ঘুমোতে হয় কাঠের চৌকিতেই।


বন্দিদের খাবার খেয়েছেন জয়ললিতাও

গারদের পিছনে কেটেছে জে জয়ললিতার। হাই প্রোফাইল বন্দি! জে জয়ললিতা। বেঙ্গালুরুর জেলে তাঁরও রাত কাটে। হিসাব বহির্ভুত সম্পত্তি রাখার অভিযোগে চার বছরের হাজতবাসের সাজা ঘোষণা করে বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত।


জেলে কোনও রাজকীয় ট্রিটমেন্ট পাননি জয়া। প্রথম রাতের খাবার খেতে একটু দেরি হয়ে যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর। মেনুতে ছিল জেলের খাবার। ছিল- ডাল, ভাত, সম্বর সঙ্গে দই ভাত। ছিল চাটনিও। আদালতের রায়ের পরই তামিলনাডু বিধানসভার সদস্য পদ খোয়ান জয়ললিতা।


জেলের ভাত খেতে হয়েছে এ রাজা, কানিমোঝিকেও


টু-জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ডিএমকে প্রধান করুণানিধির মেয়ে কানিমোঝিকে গ্রেফতার করে তিহার জেলে পাঠানো হয়। এর আগে টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আন্ডিমুথু রাজাকে (ডিএমকে'র তৎকালীন এমপি এবং দলিত নেতা) গ্রেপ্তার করে তিহার জেলে পাঠানো হয়। কয়েকটি কোম্পানিকে সুলভ মূল্যে টেলিকম লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ওই টেলিকম কেলেঙ্কারিতে ভারত সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। মোদ্দা কথা হল এ রাজা এবং কানিমোঝিকেও জেলের ভাত হজম করতে হয়েছে। তবে একটা কথা ঠিক, মাথায় বড় নেতার হাত থাকলে এবং পকেটের জোর থাকলে নাকি জেলেও স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাওয়া যায়।


অসুস্থ অমর সিংও যান শ্রীঘরে


অসুস্থ হয়ে জামিন পেলেও বিচারের বাণী বোধহয় একেই বলে! জেলে যেতে হয়েছিল অমর সিংয়ের মতো নেতাকেও। যদিও অসুস্থতার কারণে বেশিদিন তাঁকে খেতে হয়নি জেলের ভাত।


২০০৮ সালে সংসদে আস্থাভোটে ঘুষকাণ্ডে অভিযুক্ত অমর সিংকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিস। কিন্তু একদিন তিহার জেলে থাকার পরই স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এ ভর্তি করানো হয় তাঁকে। চিকিত্‍সার প্রয়োজনে সমাজবাদী পার্টির বহিষ্কৃত এই নেতার অন্তর্বর্তী জামিনের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত। এর পর ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে স্থায়ী জামিনের আবেদন জানিয়েছিলেন অমর সিং। নিম্ন আদালত তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। পরে জামিনের আবেদন মঞ্জুর দিল্লি হাইকোর্ট। মেয়াদ কম হলেও জেলে বসে চোখের জল ফেলতে হয়েছে অসুস্থ অমরকেও।


দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাও হয়েও অনেককেই শ্রীঘরে যেতে হয়েছে, অনেকের নাম উল্লেখ করতে হলে, সেই তালিকা যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা মুশকিল। তবে যাঁদের নাম না বললেই নয় তাঁরা হলেন প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি বাঙ্গারু লক্ষ্মণ, বিএস ইয়েদুরাপ্পা, সুরেশ কালমাদি, বাংলার সুশান্ত ঘোষ। কোথায় এর শেষ!

More Articles

;