কৃষ্ণপ্রেমকে রাধার চোখ দিয়ে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

কেবলমাত্র ‘চিত্রাঙ্গদা’-ই নয়, ‘শ্যামা’, ‘চণ্ডালিকা’-র মতো নাটকেও লিঙ্গ ও যৌনতার নির্ধারণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছেকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
কৃষ্ণপ্রেমকে রাধার চোখ দিয়ে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

ভারতীয় শিল্প-সাহিত্যে লিঙ্গচেতনার ছক ভাঙার শুরু সেই চৈতন্যের আমলেই। নারী-পুরুষের পরিচিতিকে সমাজ-নির্ধারিত খোপের বাইরে গিয়ে দেখার ক্ষেত্রে সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ চৈতন্যের সুযোগ্য উত্তরসাধক।ভারতীয় সমাজে প্রচলিত নারী-পুরুষ ভাবনাকে নস্যাৎ না করেও নিজের বিভিন্ন লেখায় লিঙ্গচেতনার নতুন ডিসকোর্স তৈরি করছেন রবীন্দ্রনাথ। শরীর, শ্রম, সময় এবং লিঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্কের বুনটকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের নারী-পুরুষের ভাবনা এবং লিঙ্গের রাজনীতির অন্যতম সফল উপস্থাপনা ‘চিত্রাঙ্গদা’। মহাভারতে চিত্রাঙ্গদার ভূমিকা কেবল অর্জুনের স্ত্রী। যেখানে মহাভারতে চিত্রাঙ্গদার পরিচয় শেষ হয়, সেখান থেকেই যেন চিত্রাঙ্গদার নব-নির্মাণ শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নাটকে চিত্রাঙ্গদা একদিকে মণিপুর রাজ্যের রাজকুমারী, যে রাজপরিবারের শিক্ষায় যোদ্ধার প্রশিক্ষণ পেয়েছে। যেখানে তাঁর মনন তৈরি হয়েছে পুরুষের ভূমিকাকে আপন করে নিতে। আবার সেই চিত্রাঙ্গদাই যখন অর্জুনের প্রণয়িনী, তখন নারীত্বের স্বাভাবিক ধর্মকে তার মধ্যে দেখাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই চিত্রাঙ্গদা আর পাঁচজন নারীর মতোই তার প্রিয় পুরুষের সান্নিধ্য চায়। সেই ভূমিকায় তার যোদ্ধার কাঠিন্য খসে পড়ে। নারীর লালিত্য হয়ে ওঠে তখন চিত্রাঙ্গদার অলংকার।

এখানে সচেতনভাবেই রবীন্দ্রনাথ নারী ও পুরুষের লিঙ্গ-পরিচিতির বাইরে গিয়ে চিত্রাঙ্গদার চরিত্র তৈরি করেছেন। কোথাও গিয়ে নারী সত্তা ও পুরুষ সত্তা চিত্রাঙ্গদার মধ্য দিয়ে পরস্পরকে ছেদ করে গিয়েছে। বিশ্বভারতী থেকে ১৯৩৬-এ প্রকাশিত ‘চিত্রাঙ্গদা’- র বর্ণনায় সুরূপা এবং কুরূপাকে আলাদাভাবে বর্ণনা করছেন রবীন্দ্রনাথ। নাটকের মধ্য দিয়ে চিত্রাঙ্গদার লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি। ভাবনার দায় রেখেছেন পাঠকের ওপর। কিন্তু ‘চিত্রাঙ্গদা’-র ক্ষেত্রে লিঙ্গ নির্ধারণ কোনও সমাজ-নির্ধারিত ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। নিজের ‘যৌনতা’ নির্ধারণে এখানে প্রামাণ্য হয়ে উঠেছে স্ব-ইচ্ছা। সুরূপা ও কুরূপার লিঙ্গ নির্ধারণের নেপথ্যে তাই চিত্রাঙ্গদার ইচ্ছেই বাস্তবতা পেয়েছে। কেবলমাত্র ‘চিত্রাঙ্গদা’-ই নয়, ‘শ্যামা’, ‘চণ্ডালিকা’-র মতো নাটকেও লিঙ্গ ও যৌনতার নির্ধারণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছেকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই সমুদ্রতীরে কাদম্বরীর সঙ্গে শেষ ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের

'সব ঠাঁই মোর ঘর আছে'- বিশ্বভুবন ভ্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু বারবার ফিরেছেন শিকড়ে।

রবীন্দ্রনাথের লেখায় অনেকক্ষেত্রেই ‘সে’ সর্বনামের ব্যবহার বেশি। বাংলা সর্বনাম হিসেবে 'সে’-র নির্দিষ্ট কোনও লিঙ্গ-পরিচিতি নেই। বিভিন্ন লেখায় প্রথম পুরুষ ‘সে’ সর্বনামের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সচেতনভাবেই রবীন্দ্রনাথ নারী-পুরুষ লিঙ্গের ভেদাভেদকে অস্বীকার করেছেন।

আবার 'ভানুসিংহের পদাবলী'-ও রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের ভাবনার পরতে পরতে জড়িয়ে‌। বৈষ্ণব পদাবলিতে রসতত্ত্বর নিরিখে রাধাকৃষ্ণের যে দোলাচল, তাকে বিনির্মাণ করছেন রবীন্দ্রনাথ। এক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের যৌনতার নির্ধারণে দুঃসাহসী রবীন্দ্রনাথ। আবার এই বৈষ্ণব ভাবনারই ছায়া দেখতে পাই ‘কড়ি ও কোমল’-এর অনেকগুলি কবিতায়। যেখানে ‘মথুরায়’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণের বিরহ-যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছেন। যেখানে কৃষ্ণ বিরহে রাধাকে ডাকছেন,

বাঁশরি বাজাতে চাহি বাঁশরি বাজিল কই?

এবার রাধে রাধে ডাক বাঁশি মনোসাধে ,

আজি এ মধুর চাঁদে মধুর যামিনী ভায়’।

আবার ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের ‘ একাল ও সেকাল’ কবিতায় রাধার বিরহভাবকে নিয়ে লিখছেন,

আজ ও আছে বৃন্দাবন মানবের মনে।

শরতের পূর্ণিমায়

শ্রবণের বরিষায়

উঠে বিরহের গাথা বনে উপবনে।

এখন যে বাঁশি বাজে যমুনার তীরে।

এখনো প্রেমের খেলা

সারাদিন, সারা বেলা

এখনো কাঁদিছে রাধা হৃদয় কুটিরে।

যে রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণের বিরহকে ফুটিয়ে তুলছেন পুরুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব থেকে, সেই রবীন্দ্রনাথই আবার অনায়াসে বর্ণনা করছেন কৃষ্ণপ্রেমে কাতর বিরহী রাধার মনকে। এই যে নারী-পুরুষের মন থেকে মনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ও লিঙ্গের ভেদাভেদকে মুছে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। গান থেকে কবিতা- রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির গলিঘুঁজি দর্শন করলেই এই উভকামী সত্তা ধরা পড়বে।

আবার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ যখন নিজে তৈরি করছেন লাবণ্য, দামিনী, চিত্রাঙ্গদার মতো চরিত্র, সেই রবীন্দ্রনাথই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সব নিয়মকে এড়াতে পারছেন না। নিজের তিন মেয়ের বিবাহ দিচ্ছেন অল্প বয়সে, মেয়েদের ভালোর জন্য নির্ভর করছেন ‘সৎ পাত্র’-র ওপর। আবার এরই উলটপুরাণ করছেন নিজেই। অকাল-বিধবা প্রতিমা দেবীর সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন পুত্র রথীন্দ্রনাথের। এমনকী, শান্তিনিকেতনের আশ্রম জীবনে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও ক্ষমতায়নের চেষ্টা করে গিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন খেলা থেকে আশ্রমে পিকনিক, মেয়েদের হোস্টেল থেকে পেশাগত ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের হয়ে সওয়াল করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

নিজের লিঙ্গচেতনা নিয়ে নিজের দ্বান্দ্বিক অবস্থানকে কখনওই অস্বীকার করেননি রবীন্দ্রনাথ। স্ববিরোধকে নিয়েই লিঙ্গ-রাজনীতির পথ দেখিয়েছেন তিনি।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।