স্মার্টফোন দুনিয়াকে নতুন দিশা দেখাতে পারে গুগল-এর টেনসর চিপসেট

By: Satyaki Bhattacharyya

November 20, 2021

Share

স্মার্টফোন দুনিয়াকে নতুন দিশা দেখাতে পারে গুগল-এর টেনসর চিপসেট।

বিশ্বব্যাপী বহু মানুষের জীবনে স্মার্টফোন দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভারত সহ একাধিক উন্নয়নশীল দেশে স্মার্টফোন বিক্রি হু হু করে বাড়ছে। যে কোন স্মার্টফোনের প্রাণ ভোমরা সেই ডিভাইসের ভিতরে থাকা চিপসেট। এই চিপসেটের মধ্যেই থাকে স্মার্টফোনের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট, গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট, নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। তাই স্মার্টফোন কেনার আগে চিপসেট চালো করে দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

স্মার্টফোন দুনিয়ায় সবথেকে জনপ্রিয় দুটি অপারেটিং সিস্টেম অ্যাপল-এর আইওএস ও গুগল-এর অ্যানড্রয়েড। প্রায় দুই তৃতীয়াংশের বেশি বাজারের দখল রেখে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন অপারেটিং সিস্টেমের দুনিয়ায় রাজত্ব করছে অ্যানড্রয়েড। সম্প্রতি অ্যানড্রয়েড ১২ সহ বাজারে এসেছে গুগল-এর নতুন স্মার্টফোন পিক্সেল ৬ ও পিক্সেল ৬ প্রো। এই দুই ফোনেই ব্যবহার হয়েছে টেনসর (Tensor) চিপসেট। এতদিন কোয়ালকম প্রসেসর ব্যবহার করে নেক্সাস ও পিক্সেল সিরিজের ফোন তৈরি করত গুগল। তবে নিজেদের মেশিন লার্নিং ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উন্নতির সঙ্গে বাজার চলতি চিপসেট পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে যেতে না পারার কারণেই নিজেদের পৃথক চিপসেট বানাতে বাধ্য হয়েছে গুগল।

কী আছে গুগলের নতুন টেনসর চিপসেট? অ্যাপেল-এর পথে হেঁটে নিজস্ব চিপসেট ডিজাইন না করে চিপসেট ডিজাইনের জন্য কোয়ালকম, মিডিয়াটেক ও এক্সিনোসের মতোই ARM -এর সাহায্য নিয়েছে গুগল। এই চিপসেটে রয়েছে ৮টি CPU কোর ও ২০টি GPU কোর। আটটি CPU কোরের মধ্যে দুটি হাই পারফর্মেন্স ARM Cortex-X1 থাকছে। এই দুটি হাই পারফর্মেন্স কোরে থাকছে ২.৮ গিগাহার্জ ক্লক স্পিড। প্রসঙ্গত চলতি বছরে লঞ্চ হওয়া কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগন ৮৮৮ ও অন্যান্য ফ্ল্যাগশিপ চিপসেটে একটি মাত্র ARM Cortex-X1 কোর ব্যবহার হয়েছিল।

এছাড়াও টেনসর চিপসেটে ব্যবহার হয়েছে দুটি ২.২ গিগাহার্জ ক্লক স্পিডের দুটি Cortex A76 কোর ও চারটি ১.৮ গিগাহার্জ Cortex A55 কোর। হালকা কাজ করার জন্য শেষ চারটি কোর ব্যবহার হবে। ফলে অনেকটাই ব্যাটারি বাঁচবে বলে দাবি করেছে গুগল। এছাড়াও টেনসরে থাকছে ২০ কোরের Mali-G78 গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট। কোয়ালকম চিপসেটে নিজেদের Adreno জিপিইউ ব্যবহার করলেও এক্সিনোসের পথে হেঁটে চিপসেটে Mali জিপিইউ ব্যবহার করেছে গুগল।

একই সঙ্গে এই চিপসেটের মধ্যেই থাকছে কোম্পানির নিজস্ব Titan M2 চিপ। এই চিপ ফোনের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ফোনের ভিতরেই সুরক্ষিত রাখবে। ক্লাউড সার্ভারে তথ্য আপলোড না হওয়ার কারণে গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে দাবি করেছে গুগল। এর ফলে ম্যালওয়্যার ও অন্যান্য ভাইরাস অ্যাটাকের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

সব সময় মাইক্রোফোন ও অন্যান্য সেন্সর খুব কম ব্যাটারি খরচ করে চালিয়ে রেখার জন্য টেনসরে বিশেষ কনটেক্সট হাব ব্যবহার করেছে গুগল।

তবে টেনসরের প্রধান আকর্ষণ মেশিন লার্নিং প্রসেসিংয়ের ক্ষমতা। এই জন্য টেনসরে একটি বিশেষ মেশিন লার্নিং ইঞ্জিন ব্যবহার হয়েছে। গুগলের প্রোডাক্ট ম্যানেজার মোনিকা গুপ্তা এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছেন, “বর্তমানকে না ভেবে মোবাইল কম্পিউটিংয়ে মেশিন লার্নিংয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই টেনসর চিপসেট ডিজাইন করা হয়েছে।” “টেনসরের মাধ্যমে স্মার্টফোনে মেশিন লার্নিংকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে গুগল। মোশন মোড, ফেস আন-ব্লার, স্পিড এনহান্সমেন্ট ও ভিডিওয়ে HDRnet এর মতো ফিচার ব্যবহার করা সম্ভব হবে।” অর্থাৎ আগে যে সব ফিচার ব্যবহারের জন্য সক্রিয় ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন হতো এখন মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়াই সেই সব ফিচার ব্যবহার করতে পারবেন পিক্সেল গ্রাহকরা। আর এই সব কিছুর পিছনেই টেনসরের অবদান রয়েছে।

মোনিকা আরও জানিয়েছেন, “স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ, ইমেজিং ও ভিডিওর জন্য পিক্সেল ফোনে বিশেষভাবে মেশিন লার্নিং ব্যবহার হবে।” আর এই কারণেই গুগলের যে সব ক্যামেরা ও অন্যান্য ফিচার ব্যবহারের জন্য এতদিন ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন হতো এবার কোন রকম কানেক্টিভিটি ছাড়াই সেই সব ফিচার ব্যবহার করা যাবে।

বিগত কয়েক বছর ধরেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের উপরে জোর দিচ্ছে গুগল। এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে মার্কিন কোম্পানি। তবে ম্যাপস, সার্চ, ট্রান্সলেশন, লেন্স, জিমেল, ফটোস ও কোম্পানির অন্যান্য সার্ভিস ব্যবহারের জন্য এতদিন সক্রিয় ইন্টারনেট কানেকশন থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রথম থেকেই ইন্টারনেট কোম্পানি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার কারণেই গুগলের প্রায় সব সার্ভিস ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন হয়। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই রোজগার করে গুগল। তবে এবার নতুন টেনসর চিপসেটের মাধ্যমে সেই পথ থেকে কিছুটা সরে আসার পথে হাঁটতে শুরু করেছে মার্কিন টেক জায়েন্ট কোম্পানিটি।

এতদিন পিক্সেল ফোনে তিন বছরের সফটওয়্যার আপডেটের প্রতিশ্রুতি দিত গুগল। তবে টেনসর চিপসেট ব্যবহারের ফলে পিক্সেল ৬ ও পিক্সেল ৬ প্রো গ্রাহকরা আগামী পাঁচ বছর সব অ্যানড্রয়েড আপডেট পেয়ে যাবেন। চিপসেটের জন্য কোয়ালকমের উপরে নির্ভরশীল থাকার কারণেই পিক্সেল গ্রাহকরা অ্যানড্রয়েড আপডেট থেকে বঞ্চিত হতেন। তবে এবার গুগল নিজের চিপসেট তৈরি করে আরও বেশি আপডেটের প্রতিশ্রুতি দিল। ফলে যে কোন গ্রাহক একবার পিক্সেল ফোন কিনলে দীর্ঘদিন তা ব্যবহার করতে পারবেন। যা গুগলকে তথ্য সংগ্রহ করে বিজ্ঞাপন দেখাতে সাহায্য করবে।

স্মার্টফোন দুনিয়ায় অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের আধিপত্য অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাপী বিক্রি হওয়া মোট স্মার্টফোনে এক তৃতীয়াংশের বেশি অ্যানড্রয়েড ডিভাইস। সমীক্ষা বলছে ২০২৫ সালের আগেই অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে। এই সব ফোনের সফটওয়্যার গুগল তৈরি করলেও হার্ডওয়্যার তৈরি করে শাওমি, স্যামসাং, ওয়ানপ্লাসের মতো কোম্পানিগুলি। বিভিন্ন অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিকে অ্যানড্রয়েডের উৎকর্ষতা বোঝাতে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে নেক্সাস ও পিক্সেল সিরিজের ফোনগুলি তৈরি করছে গুগল। তবে এবার নিজেদের চিপসেট তৈরি করে অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোন দুনিয়াকে এক নতুন দিশা দেখানোর চেষ্টা করল কোম্পানিটি। যা অন্যান্য স্মার্টফোন ও চিপসেট প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলিকে ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং দুনিয়ায় পথ দেখাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: 

  • https://timesofindia.indiatimes.com/gadgets-news/explained-googles-newly-announced-tensor-chips-for-pixel-6-and-pixel-6-pro/articleshow/87164842.cms
  • https://www.cnet.com/tech/mobile/apples-a15-bionic-chip-powers-iphone-13-with-15-billion-transistors-new-graphics-and-ai/
  • https://blog.google/products/pixel/introducing-google-tensor/
  • https://www.idc.com/promo/smartphone-market-share

More Articles