মিলে গেল একশো বছর আগের ভবিষ‍্যৎবাণী! এই আবিষ্কারে খুলে যাচ্ছে পৃথিবীকে দেখার নতুন জানলা

অবশেষে ধরা দিল সেই অরূপরতন, যার ভবিষ্যৎবাণী আইনস্টাইন করেছিলেন একশো বছর আগে।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
মিলে গেল একশো বছর আগের ভবিষ‍্যৎবাণী! এই আবিষ্কারে খুলে যাচ্ছে পৃথিবীকে দেখার নতুন জানলা

আপনার তত্ত্বটি কতটা সুন্দর কিংবা কতটা বুদ্ধিদীপ্তভাবে আপনি সেটিকে উপস্থাপন করছেন, তাতে কিছু আসে যায় না, যদি পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে তা না মেলে।

-রিচার্ড পি. ফেইনম্যান

ডাস্টার ঝাড়ার জন্য হাত ঝাঁকালে নাকি ঢেউ ওঠে চারদিকে- কই দেখতে পাই না তো! কেন জলে ঢিল ফেললে ঢেউ ওঠে না, যাকে আমরা জলতরঙ্গ বলি? কোনওকিছুর কমা-বাড়া হলেই ঢেউ সৃষ্টি হবে, এটাই তো নিয়ম! তাহলে ডাস্টার ঝাঁকালে কী ধরনের ঢেউ তৈরি হয়? দেশ-কালের ঢেউ, মহাকর্ষের ঢেউ- কী সেটা!

তা বুঝতে গেলে আমাদের নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের শরণাপন্ন হতে হয়, যা বলে, এই মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করে এবং দেয় তার সাংখ্যমান। অদ্ভুত এই তত্ত্ব! একদিকে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি, অপরদিকে গাছ থেকে আম কেন পড়ল- সব কিছুর মুশকিল আসান এই সূত্র। আকাশ ও পৃথিবী যে একই নিয়মে বাঁধা, কেউ বলেনি এর আগে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সূর্যের গায়ে পৃথিবীর সমান বড় দাগ! ধ্বংস হতে পারে পৃথিবী?

Sunspot: এই দাগটি তাক করে রয়েছে সরাসরি পৃথিবীর দিকেই। যে সাম্ভাব্য ঘটনাগুলি ঘটতে পারে-

কিন্তু একটা খুঁতখুঁত থেকেই গেল। ধরুন, আজ হঠাৎ পৃথিবী হাওয়া হয়ে গেল, চাঁদ কি সঙ্গে সঙ্গে সেই বিপর্যয় টের পাবে? না কি আর একটু অপেক্ষা করতে হবে? নিউটনের মতে তৎক্ষণাৎ টের পাবে। ইংরেজিতে যাকে বলে 'action at a distance'‌. কিন্তু পৃথিবী বিলোপের খবরটা কে বয়ে নিয়ে যাবে? আলোর চেয়ে বেশি বেগে কেউ তো যেতে পারে না। কিন্তু সেজন্যও তো অবকাশ চাই কিছুটা। এদিকে নিউটনের তত্ত্বে বাহকের জায়গা খালি, যা হবে সবই তৎক্ষণাৎ!

ঊনবিংশ শতাব্দীতে আইনস্টাইন মহাকর্ষের ধারণাই বদলে দিলেন এবং দেখালেন স্থান ও কাল বিচ্ছিন্ন নয়। তারা মিলেমিশে এক চারমাত্রিক জগৎ তৈরি করে, যেখানে আমাদের বসবাস। তিনি বলেন দেশ-কালের জ্যামিতি বেঁকে যাওয়ার নামই মহাকর্ষ। যেমন, আপনার সামনে একটি কাগজে কিছু মিষ্টি রাখা আছে, একদল পিঁপড়ে সারি বেঁধে চলছিল মিষ্টির টানে। আপনি রেগে গিয়ে দুমড়ে দিলেন কাগজটাকে। ব্যাটা পিঁপড়েগুলো নাছোড়বানদা, কিন্তু বাঁকা পথে পথে অর্থাৎ, বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে পথটাকে বাঁকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনি তো পিঁপড়ের ওপর কোনও বলপ্রোয়োগ করেননি শুধু কাগজের জ্যামিতিটা পাল্টে দিয়েছেন মাত্র। আইনস্টাইন বললেন, যে কোনও জায়গায় ভর থাকলে সেখানকার দেশ-কালের জ্যামিতি বেঁকে যায়, যার ফলে সোজা রাস্তা ও বাঁকা দেখায়, আর সেটাকে আমরা মহাকর্ষ বলে মনে করি।

মহাকর্ষ মানে তাহলে দেশ-কালের বক্রতা। কোথাও একটা ভর রাখলে তার প্রভাবে আশপাশের জ্যামিতি কীভাবে বদলায়, তার একটা হিসেব। কিন্তু যেখানে ভর নেই, সেখানেও তো পর্যায়ক্রমে দেশ-কাল এই যে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে- এই দোমড়ানো-মোচড়ানোটাই যে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা মহাকর্ষের ঢেউ।

সে না হয় বোঝা গেল, কিন্তু তার যে দেখা মেলা ভার, কারণ সে যে ভারি ক্ষীণ। তোড়জোড় শুরু হলো এই ঢেউয়ের সম্মুখ সাক্ষাৎকারের জন্য। আলোক তরঙ্গ দেখার অনেক উপায় আছে, কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দেখার একমাত্র উপায় হলো, তার ধাক্কায় কোনও বস্তুর আকারের সামান্য বিকৃতির পরিমাপ (১-এর পিঠে ২১টা শুন্যের একভাগ)। অনেকদিনের এই চেষ্টার ফলই LIGO (Laser Interferometer Gravitational Observatory)। কেমন দেখতে এই যন্ত্র? কীভাবে ধরা পড়ল সে?

পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে মাইকেলসন ইনটারফেরোমিটার নামে এক যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। LIGO তারই এক উন্নত সংস্করণ। ইংরেজি L অক্ষরের মতো, যার দুই বাহু ৪ কিমি লম্বা। আমেরিকার দুই প্রান্তে হ্যালফোড আর লিভিংস্টোনে এই দু'টি এরকম L বসানো আছে। দুই বাহু বরাবর লেজার রশ্মি পাঠিয়ে তাদের মিলিয়ে দিলে দেখা যায় বাহুদু'টির দৈর্ঘ্য সমান ছিল। বাহুদু'টি সমকোণে থাকার ফলে এদের ওপর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এসে পড়লে তাদের দৈর্ঘ্য কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হবে, যা এই যন্ত্রের নজর এড়াবে না। এই যন্ত্র এত সংবেদনশীল যে, কয়েক হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে দেশ-কালের জ্যামিতিতে কোনও ঢেউ উঠলেও তা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়বে।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালে এক অদ্ভুত সংকেত পাওয়া গেল। প্রথমে হ্যানফোডে, পরক্ষণেই (১ সেকেন্ডের হাজার ভাগের ছয় ভাগ) লিভিংস্টোনে। সেই কম্পাঙ্কের তীব্রতা ও তীক্ষ্ণতার হিসেব কষে বিজ্ঞানীরা বলেন, কৃষ্ণগহ্বরদু'টির ভর যথাক্রমে সূর্যের ভরের ৩৬ গুণ ও ২৭ গুণ মিলে নতুন কৃষ্ণগহবরের ভর সূর্যের ৬২ গুণ।বাকি ৩ গুণ গেল কোথায়? কেন তা বেরিয়েছে মহাকর্ষীয় ঢেউয়ের আকারে?

অবশেষে ধরা দিল সেই অরূপরতন, যার ভবিষ্যৎবাণী আইনস্টাইন করেছিলেন একশো বছর আগে। শেষে একটা প্রশ্ন করাই যেতে পারে, এই ভুল ধরার এত প্রচেষ্টা কেন? শুধুই কি আইনস্টাইনের মানসকন্যা? আসল কথা হলো, আলোকতরঙ্গ ছাড়া মহাবিশ্বকে দেখার আর কোনও জানলা এর আগে ছিল না, এই নতুন জানলা দিয়ে বোধহয় আমরা বিশ্বকে দেখতে পাব আরও নতুন নতুন রূপে। কারণ, এই ঢেউ দুর্বল আর দুর্বলতাই তার শক্তি। এই ঢেউ সহজেই ঢুকে পড়ে পদার্থের অন্দরমহলে, তাই আমরা আশা করে আছি যে, মহাকর্ষীয় ঢেউয়ের কাছ থেকে আমরা জানব নিউট্রন তারার হাঁড়ির খবর, কৃষ্ণবিবর সৃষ্টির রহস্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস, আরও কত কী!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।