হেমন্তে ছিল আলো তৈরির পাঠশালা! কালীপুজোর প্রদীপ যেভাবে তৈরি হত হাতে হাতে

Kali Puja 2022: পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে চলত সলতে পাকানো পর্ব, আলো তৈরির পাঠশালা।

Jagannathdeb Mondal
৪ মিনিট
হেমন্তে ছিল আলো তৈরির পাঠশালা! কালীপুজোর প্রদীপ যেভাবে তৈরি হত হাতে হাতে

কালীপ্রতিমা জলে ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই হিম পড়া শুরু হয়ে যায়। রাতের দিকে বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে মাথার চুল ভিজে ওঠে শিশিরের 'ওম' লেগে। ছাতিমগাছে ফুল ফোটে, পুকুরের জলে মিহি সর দেখা যায়। হেমন্তের এসব হলো মার্কামারা দৃশ্য, গ্রাম-মফসসলে দেখা যাবেই। তবে এখন খানিক তফাৎ ঘটে গেছে, একটু দেরি করে আসে যেন সবকিছুই।

পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে চলত সলতে পাকানো পর্ব, আলো তৈরির পাঠশালা। মানুষ বাজারজাত পণ্যে এত নির্ভর ছিল না, হাতে কাঁচা টাকার অফুরান সঞ্চয় ছিল না, চারদিকের প্রকৃতির দানকে নিজের মতো ব্যবহার করে গড়ে নিত প্রয়োজনের জিনিস।

বিনোদন এত সুলভ ছিল না তখন, পাড়ার সকলে দিনের পর দিন একসঙ্গে বসে তিল তিল করে শ্রম ও যত্নকে আশ্রয় করে 'বই' নামাত। বড় টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা মঞ্চ, ভাইফোঁটার আগের দিন গ্রামের লোকজন মিলে নাটক করবে। গাছের মাথায় চোঙা বাঁধা, বিছানো আলুর বস্তায় বসে বসে অনুষ্ঠান দেখা, এ গাঁ-ও গাঁ ঝেঁটিয়ে লোক এসেছে। চপ-বেগুনি-পাঁপড়ভাজা কিনে খাওয়া, ফিরতি পথে সস্তার বাসনকোসন, কাচগেলাস, হরেক মাল কিনে বাড়ি ফেরা, ফিরতে ফিরতে রাত পুইয়ে যাবে, ভোরবেলা কুয়াশার নিচে সাদা পোশাক পরে শ্রীখোল বাজিয়ে দুয়োরে দুয়োরে গান শুনিয়ে যাচ্ছে টহল-গায়ক, কার্তিক মাসজুড়ে এই টহল চলবে।কত সব অচেনা পদ গাইছে। টাকা পাওয়ার আশা নেই, নামযশের ভাবনা নেই, গান গেয়ে যাওয়া ভালবেসে।

কালীপুজোর কয়েকদিন আগে থেকে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বসে গেছে সার বেঁধে, প্রদীপ গড়ছে কিংবা পুজোর পর মোমবাতি বানাচ্ছে- এ একেবারে চিরপরিচিত দৃশ্য ছিল। এখনও সার বেঁধে বসছে ছোট ছোট বাচ্চারা, হাতে ফোন।

যত দিন যাচ্ছে, আলোহাওয়ার বদল ঘটছে, সময়ের জিনিস সময়ে থাকছে না, গ্রামের দিকে ছোট ছোট নাটকের দল কোনও মতে টিকে আছে কোথাও কোথাও; আলো তৈরির পদ্ধতি প্রায় বিলুপ্ত আস্তে আস্তে। আমাদের চেনা-জানা চালচিত্র একটু একটু করে ঠান্ডা জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে।

যে-কোনও মাটি দিয়ে উপযুক্ত পাত্র গড়া যায় না। কোন জলের মাটি সুন্দর, কোন নদীর পলি টিকবে বেশিদিন, কোন কাঁকড়া-গর্তর পাশে থাকা মসৃণ মাটিতে আঙুল চালানো যাবে সহজ ও সাবলীলভাবে- এ কাউকে শিখিয়ে দিতে হত না, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে যেন শিখে যেতাম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তুলসী থেকে কুলেখাড়া, আজও বাংলার ভরসা গাছপালাই

Natural medicines: আগুন জ্বালাতে শেখা ও চাকা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শিখে নিতে হয়েছে হাতের কাছে থাকা গাছপালার সাহায্যে নিজেকে নিজেই সারিয়ে ফেলতে পারার অপূর্ব কৌশল।

গ্রাফিক্স: দীপ হাওলাদার

আনাড়ি ও ছোট বাচ্চাদের সাহায্য করত বয়সে একটু বড়রা। মাটি খুঁড়ে এনে, বালি-কাঁকড়, কেঁচো-গুগুলি বেছে মাটি নরম করতে হবে ময়দার তালের মতো,ছেনে ছেনে সুন্দর করে তুলতে হবে, তাড়াহুড়ো করা চলবে না, এখান থেকেই শিক্ষা পেতাম ধৈর্যর।

মাটি তৈরি হয়ে গেলে হাতের তালুতে নিয়ে গোল তৈরি করা। সেই গোলাকার গর্তে সলতে রাখার মুখ বানিয়ে অনেক যত্নে, অনেক ভালবাসায় প্রদীপ তৈরি। বাড়তি মাটিতে কেউ কেউ চটজলদি বানিয়ে ফেলত বউপুতুল, জন্তুজানোয়ার।

এরপর চলবে রোদ খাওয়ানো। ধীরে ধীরে শুকিয়ে নেওয়া। রোদ দেওয়া সাঙ্গ হলে পুজোর দিন বিকেলে একবার মৃদু জলে চুবিয়েই কাপড়পাড় দিয়ে সলতে ও সরষের তেলে সাজিয়ে তোলা হলো। মৃদু জলে ভেজানো হলে তেল কম টানে। একই কায়দায় বুদ্ধিমতি চা-দোকানি মাটির ভাঁড় ভিজিয়ে চা পরিবেশেন করে, যাতে শুকনো ভাঁড় চা শোষণ করে না নেয় বেশি।

এইবার কাঁঠালপাতায় রেখে ঘরে বাইরে উঠোনে পুকুরের ধারে গাছতলায় মরাই ও ঢেঁকিশালে সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া। বিবেকানন্দ-মার্কা কাগজে প্যাঁচানো রোগা রোগা মোমবাতি আলোকিত করে তুলছে চারদিক। তামসীকে জয় করে জ্বলজ্বল করছে আলো।

একটা বড় নারকেল মালায় কঞ্চি ঢুকিয়ে তৈরি হতো টর্চ। মালার মধ্যে বসিয়ে দাও ছোট ছোট মোমবাতি, আলো হয়ে গেল, শক্ত হাতে ধরে এবার পাড়া বেড়াও ব্যক্তিগত টর্চ নিয়ে, টুপ করে তুলে নিও এর-ওর বাড়ি থেকে মোম, আলো যে এভাবে চুরি করা যায়- এই বোধে নিজেকে তখন মনে হচ্ছে গ্রিক রূপকথার চরিত্র, স্বর্গ থেকে যে আগুন চুরি করে এনেছিল।

পরের দিন সকালে দেখা যাবে, শ্যামাপোকা পাখা ঝরিয়ে মরে আছে, মোম পুড়ে পুড়ে ক্ষয়ে গেছে। কুছ পরোয়া নেহি! ঝরে থাকা মোম ব্লেড দিয়ে চেঁছে তুলে ছোট বাটিতে গলিয়ে নাও, পেঁপে গাছের ডাল কেটে একটা মুখ আটকে সুতো দিয়ে গলন্ত মোম ঢেলে তৈরি করে নেওয়া গেল হাতে বানানো মোমবাতি।

এইসব আলো তৈরির কারখানা লুপ্তির পথে। একসঙ্গে জড়ো হয়ে মহড়া দিয়ে নাটক তোলা দূর অতীত এখন।একসঙ্গে বসার সময়ই নেই। হাতের আঙুল এমনভাবেই তৈরি হয়ে গেছে, কিছুক্ষণ পরপরই ফোনের স্পর্শ আঁকড়ে ধরতে চায়। জ্যান্ত ও সতেজ জিনিসের চেয়ে কৃত্রিম জিনিসের চটক চিরকালই তো আলাদা।

বাজার ছেয়ে গেছে ইলেকট্রিক নানা আলোতে।কতরকম রং, কতরকম তার বাহার। পয়সা ফেললেই হলো। অপেক্ষাও করতে হবে না, যত্নও করতে হবে না।দুম করে কিনে দুম করে জ্বালিয়ে দিলেই হলো।

তবু হেমন্ত এলে মনে পড়ে, মনে পড়বেই, ছোটবেলার আলোকারখানায় তৈরি আঁকাবাঁকা প্রদীপ ও রোগা রোগা মোমবাতি। দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে থাকা কারখানাগুলোতে তালা পড়ে যাচ্ছে, মরচে পড়ছে।

একটু শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে; দরজা ফাঁক করলেই কিন্তু দেখা যাবে, শীতের ঘোমটার নিচে হিম ও কুয়াশায় জবুথুবু হয়ে ছাদের কিনারে মিটমিট করে জ্বলছে একাকিনী আকাশপ্রদীপ।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।