হেমন্ত, বিষণ্ণ আঁধারে এক অশরীরি উৎসব

Hemanta and Halloween : হ্যালুইন আর ভূত চতুর্দশী মিলিয়ে হেমন্তকাল যেন বিবিধ ভূতের উৎসবের জন্যই দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

rudranjan
৪ মিনিট
হেমন্ত, বিষণ্ণ আঁধারে এক অশরীরি উৎসব

এখনও শীত আসেনি। বাতাসে তার আঁচটুকু লেগেছে মাত্র। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে ধীরে। ইংরেজিতে একে বলে 'twilight, অর্থাৎ, সন্ধিপ্রকাশের কাল। জন মেসফিল্ড হলে এ সময়ের বর্ণনায় লিখতেন,

“Twilight it is, and the far woods are dim, and the rooks

cry and call.

Down in the valley the lamps, and the mist, and a star over all,

There by the rick, where they thresh, is the drone at an end,

Twilight it is, and I travel the road with my friend.”

এমন সময়ে ধৈবত জমে ভালো। পূরবীর কোমল ধৈবত। টোড়ির জাগরণ নেই তাতে। আছে শুধু সন্ধ্যাপূর্ব বিষণ্ণতা। এ বিষণ্ণতাকে ঘিরেই বাঙালির জীবনে আস্ত একটা ঋতু গড়ে উঠেছে। নাম তার হেমন্ত। বঙ্গজীবনের সকল ঋতুরই কোনও না কোনও পরিচিতির তকমা আছে। তার বসন্ত জুড়ে থাকে দোল আর কাফির বন্দিশ,

“দেখো আলী হোরি খেলত, নন্দলাল রে,

সঙ্গ লীনি আপনি কায়ী গোয়াল বাল রে।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হেমন্তে ছিল আলো তৈরির পাঠশালা! কালীপুজোর প্রদীপ যেভাবে তৈরি হত হাতে হাতে

Kali Puja 2022: পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে চলত সলতে পাকানো পর্ব, আলো তৈরির পাঠশালা।

তার গ্রীষ্মের সিংহাসনের থাকে পয়লা বৈশাখ আর তার রাবীন্দ্রিক আহ্বান। কিন্তু হেমন্ত তার কাছে যেন কেমন পরিচিতিহীন। তার হাল হকিকত কতকটা সৌর জগতের এককালীন নবম গ্রহ, প্লুটোর মতো। থেকেও নেই। 'আশ্বিনের শারদপ্রাতের' কোলাহল কেটে গেলে এই বাতিলের পরিচয় নিয়ে হেমন্ত আসে, তারপর একসময় নিশ্‌চুপে জায়গা করে দেয় শীতকে। কেউ তার খোঁজ রাখে না। যেন বাতাসে মিহি কুয়াশার আস্তরণ সাজানোতেই হেমন্তের দায়িত্ব শেষ।

পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে এ সময় মহা হট্টগোল। হ্যালুইন উৎসবের আনন্দ। মধ্যযুগের আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সে বাস করতেন সেলটিকরা। অনেকে মনে করেন তাঁদের 'সামহাইন' উৎসব থেকেই হ্যালুইনের সূচনা। এ উৎসবের মধ্যে দিয়েই শুরুয়াদ হতো শীতের। হ্যালুইন ছিল আঁধারের উৎসব। হিন্দু বাঙালিদের ভূত চতুর্দশীর মতোই সে উৎসবেও নাকি প্রেতলোক থেকে পৃথিবীতে নেমে আসত রাশি রাশি আত্মা। তবে 'তিন শতকের শহর' কলকাতার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা আত্মাদের জাগিয়ে তুলতে হ্যালুইনের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না।

কার্ল মার্ক্স তাঁর 'কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার'-এর শুরুতে লিখছেন,

“A specter is haunting Europe - the specter of communism.”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অশুভ আত্মা তাড়ানোর উৎসব! হ্যালোউইনের অজানা গল্প জানলে শিউরে উঠতেই হবে

Halloween: কীভাবে শুরু হলো এই ভুতুড়ে উৎসব?

'Specter' এর আক্ষরিক অনুবাদ যদি হয় ভূত, তবে তাতে এসে পড়ে অতীত প্রসঙ্গ। যে শহর শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিচল। উন্নয়নের ঘোর লাগা চোখে যে প্রতিনিয়ত তার আশেপাশের মফসসলগুলিকে গ্রাস করছে, তার খাসজমিনে যে অতীতের ভূত সদা বর্তমান- এ কথা নতুন করে বলে দিতে হয় না। কাকতালীয়ভাবে, হেমন্তের সঙ্গে ভূত শব্দটা যেন বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। হ্যালুইন আর ভূত চতুর্দশী মিলিয়ে হেমন্তকাল যেন বিবিধ ভূতের উৎসবের জন্যই দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কাজেই, হেমন্তকে হয়ত অনায়েসে অন্ধকারের ঋতু আখ্যা দেওয়া চলে।

অন্ধকারে মিশে থাকে শীতের আবেশ। সে আবেশ ডানায় মেখে এক হেমন্ত রাতেই ওল্ড পার্ক স্ট্রিট কবরখানার দিকে উড়ে যায় চোক্তারদের পূর্বপুরুষ, বৃদ্ধ দণ্ডবায়স। সে সব রাতে কবরখানায় স্লিম্যান ও শেরউড সাহেবের মধ্যে বাঁধে ধুন্ধুমার ডুয়েল। দণ্ডবায়সের উপর তার রেফারিংয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে। তবে এ রঙ্গমঞ্চের কুশীলব দণ্ডবায়স একা নন। সঙ্গে আছেন তাঁর ইতিহাসখ্যাত সঙ্গিনী, বেগম জনসন। এ শহর বেগম জনসনকে মনে রাখেনি। দণ্ডবায়সরূপী দাঁড়কাকও আজ তার কাছে উদ্বৃত্ত।

ওল্ড পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি হয়ে আরও বেশ খানিকটা দক্ষিণের দিকে এগোলেই চেতলা ব্রিজ। তার একধার ঘেঁষে 'কেউ নেই শূন্যতা'-র মতো পড়ে থাকে ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশান। সেখানে তখন হেমন্তকালীন কার্নিভাল। কালীপুজো উপলক্ষে জড়ো হয়েছে শয়ে শয়ে রংবাজ ভূত। এমন চিত্রই পাওয়া যায় নবারুণ ভট্টাচার্যের 'কাঙাল মালসাট' উপন্যাসে। কে নেই সেই শ্মশান উৎসবে? উনিশ শতকের দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল। নকশাল আমলের খোঁচড়। আর বেপাড়ার অদ্ভূতুড়ে সব মাস্তান। তাঁদের নামের কতই না রকমফের। জগা, ভানু, মংলা, ভুতনি, টালি, লন্ডন।

এ উৎসব তো শুধু মৃত্যুর নয়। জীবিতেরাও সেখানে উপস্থিত। হাবিলদারদের পাল্লায় পড়ে টালিগঞ্জ থানার ওসিকেও সেদিন ভূতেদের সঙ্গে বসে মদ্যপান করতে হয়। কার্তিক আর অগ্রহায়ণ যেমন হেমন্তে এসে মিশে যায়, ঠিক তেমনভাবেই কালীপুজো মিলিয়ে দেয় প্রেতলোক আর জীবলোককে। এছাড়া শহুরে বাঙালি প্রেতলোকের খবর বিশেষ রাখে না। অথচ তার শহরেই রয়েছে প্রেতলোকের বেশুমার বাসিন্দা। এই ভূতের শহরের উপর দিয়েই তো একসময় কত কিছু বয়ে গিয়েছে। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, একটি মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, এক শতাব্দীর কত শত আন্দোলন আর পরিকল্পিত গণহত্যা।

আজ থেকে ৫২ বছর আগে ১২ অগাস্ট দুপুরেও উত্তর কলকাতার কাশীশ্বর চ্যাটার্জি লেন বা ভোলানাথ স্ট্রিটের বাসিন্দারা জানতেন না রাতে ঠিক ঘটতে চলেছে। সেদিন রাত নামতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল, কংগ্রেসের সদস্যরা স্রেফ দা, কাটারি দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছিল একাধিক নকশালকে। সে হত্যালীলা চলেছিল দু'দিন ধরে। তারপর একসময় ইতিহাসের পাতায় থেকে গেল কাশীপুর-বরাহনগর গণহত্যার কাহিনি হয়ে। যে বারুদ সেদিন নিষিদ্ধ ইস্তেহার হয়ে গণ্ডারের চামড়ার চেয়েও পুরু কলকাতার মাটির তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল, তার খোঁজেই পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এসেছিল 'যুদ্ধ পরিস্থিতি'-এর রণজয়। সেও এক হেমন্ত সন্ধ্যায়। একসময় যাদবপুর অঞ্চলে যে সমস্ত রাইফেলকে সে শীতঘুমে পাঠিয়েছিল, তাদের উদ্ধার করতেই হবে তাকে। সেদিনও ছিল কালীপুজোর রাত। দিকে দিকে বিস্ফোরণের শব্দ। যেন যুদ্ধ লেগেছে শহরে। যে যুদ্ধ জোয়ারে গা ভাসিয়েই সত্তর-একাত্তর সালে একদল মানুষ অন্য অনেকের মতো পড়াশুনো ছেড়েছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর আর পাঁচজন শখের বিপ্লবীর মতো তাঁরা বিদেশ পালাতে পারেননি। সে সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। এঁদের না ছিল কফি হাউস, না ছিল মায়কভস্কি। কেউ এঁদের মৃত্যুতে ইন্টারন্যাশনাল গায়নি কোনওদিন। অতীতের রাইফেল আগলাতে আগলাতে একদিন 'যুদ্ধ পরিস্থিতি'-র সেই বৃদ্ধ ইস্তিরিওয়ালা হয়ে উঠলেন তাঁরা। তারপর রণজয়রা বাউন্ডুলের মতো এ পথ সে পথ ঘুরে পাতালঘরের গোপন অস্ত্রাগারের সন্ধান করলে পরাজিত গলায় তাদের একটি উত্তরই দিতে পারলেন, “ওর উপর বাড়ি উঠে গেছে। সব ফ্ল্যাটবাড়ি। কিচ্ছু নেই।”

আসলে হেমন্ত শুধুই বিষণ্ণতার গল্প বলে না। সে তার বুকে বিস্তর অস্ত্রও লুকিয়ে রাখে। যে সব অস্ত্র আর কোনওদিন জাগবে না। বা হয়তো কালের ফেরে জেগে উঠবে একদিন। কে বলতে পারে?

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।