আসলে কে সান্তা ক্লজ, সত্যিই আসবেন আজ রাতে?

Amit Pratihar
৪ মিনিট
আসলে কে সান্তা ক্লজ, সত্যিই আসবেন আজ রাতে?

গোটা পৃথিবীর একটা বড় অংশ জুড়ে বড়দিন মানেই সান্তা ক্লজ এলেন বলে। লাল রঙের পোশাক, চোঙা আকৃতির লম্বা টুপি পরা, সাদা চুল-দাড়িওয়ালা, কাঁধে লম্বা এক ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক বৃদ্ধ যাঁর প্রধান কাজই হল যিশুর জন্মদিনে হরেক কিসিমের মানুষজনকে উপহার বিতরণ করা, যাদের যা প্রয়োজন তা পূরণ করা। কিন্তু আজও বহু মানুষ যে প্রশ্নের জবাব খুঁজে হয়রান, তা হল কে এই সান্তা? কোথা থেকে এলেন এই শশ্রুগুম্ফশোভিত পুরুষ, কেনই বা ঘুরে ঘুরে বাচ্চাদের মাঝে উপহার বিতরণ করেন তিনি? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ যাঁকে আমরা সান্তাক্লজ নামে চিনি, তার নেপথ্যে আছে এক লম্বা কাহিনি।

জনশ্রুতি বলছে, ২০০০ বছর আগের কথা, আনুমানিক চতুর্থ শতকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মায়রা ( যার বর্তমান নাম তুর্কি) অঞ্চলে নিকোলাস নামে এক বিশপ ছিলেন। সাম্প্রতিক কালে একটি হাড়ের মাইক্রোস্যাম্পেল কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সান্তা কোনও গল্পকথা নয়। সান্তা ছিলেন। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন সেই অঞ্চলের সব থেকে ধনী ব্যক্তি। পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুর পর তরুণ বয়সেই নিকোলাস পিতার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারি হন। অল্প বয়সেই নাকি এত সম্পত্তির মালিক হয়ে যান নিকোলাস যে চিন্তা শুরু করেন, কী করা যায় প্রয়োজনাতিরিক্ত এত সম্পত্তির! নিকোলাস মানুষ হিসাবে খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। দয়ার্দ্র হৃদয় যুবা তাই নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, নিজের বাকিটা জীবন তিনি অসহায়দের সাহায্য করেই কাটাবেন।

কথিত আছে, নিকোলাস একবার তাঁর অঞ্চলের এক গরিব লোকের সংস্পর্শে আসেন যাঁর তিনটি কন্যা ছিল। তার মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেলেও, সেই গরিব বাবা কিছুতেই মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না পণের অর্থ, স্বর্ণ অলংকার জোগাড় করতে পারছিলেন না বলে। নিকোলাস সেই খবর জানতে পারেন, এবং ঐ পরিবারকে গোপনে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন । তিনি একদিন একটা কাপড়ের ব্যাগে স্বর্ণ অলংকার এবং বেশ কিছু টাকা ভরে গভীর রাতে বেরোলেন ওই গরিব পরিবারের উদ্দেশ্যে। গরিব লোকটির বাড়িতে চিমনির নীচে যেখানে চিমনির গরমে কাপড় শুকোতে দেওয়া ছিল, সেখানে ওই সোনার ব্যাগটি রেখে দিলেন নিঃশব্দে। পরদিন ওই ব্যাগটি পেয়ে পরিবারের সক্কলের খুশির কোনো সীমা রইল না। শীঘ্রই বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল ধুমধাম করে।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ের বয়স হতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল যখন, তখন ওই মেয়েদের গরিব বাবা ভাবলেন কী ভাবে ওই দয়ালু ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়! এবং এরপর ছোট মেয়ের বিয়ের বয়স হলে তিনি রোজ রাতে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন চিমনির পাশে। হঠাৎ এক রাতে নিকোলাসকে সোনার ব্যাগ দেওয়ার সময় দেখে ফেললেন তিনি। নিকোলাসকে একটু চেপে ধরতেই তিনি স্বীকার করলেন যে তিনিই লুকিয়ে সোনার ব্যাগ ফেলে রেখে যেতেন। দরিদ্র লোকটির কাছে নিকোলাস বিষয়টি গোপন রাখতে অনুরোধ করলেন। কারণ নিকোলাস চাইতেন না তাঁর দানের কথা লোকেদের কানে যাক। মহম্মদের কথা মনে পড়বে বহু ধর্মপ্রেমীর। কথিত আছে মহম্মদও বলতেন, ডান হাত দিয়ে দানের খবর বা হাতও যেন না জানতে পারে।

কিন্তু নিকোলাসের এই গোপন কর্ম বেশিদিন চাপা রইল না। অঞ্চলের যে কোনও মানুষের বিপদের দিনে নিকোলাস গোপনে উপহার দিয়ে তাঁদের বিপদ থেকে উদ্ধার করতে শুরু করলেন এবং যথা সময়ে ধরাও পড়তে লাগল। এ'ভাবেই লোকেদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো নিকোলাসের এই মহৎ কাজের খবর। নিকোলাস সব্বার মধ্যে প্রিয় হয়ে উঠলেন এবং এভাবেই নিকোলাস হয়ে উঠলেন সেন্ট নিকোলাস, আজকের কথকতায় সান্তা ক্লজ। নিকোলাসের এই মহান কাজের ধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, যারা কোনোভাবে সাহায্য বা উপহার পেতেন তারাও অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে লাগলেন, আর সান্টার নামে উপহার দিতে লাগলেন। এবং নিজেদের আত্মপরিচয় গোপন করলেন স্যান্টার লাল-সাদা পোশাকের আড়ালে।

অচিরেই দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন সেন্ট নিকোলাস। লোকমুখে ঘুরতে লাগলো তাঁর নাম। তাঁর গুণগানে ছেয়ে গেল শহরের অলিগলি থেকে রাজপথ পর্যন্ত। শোনা যায় এক সরাইখানায় তিন মৃত শিশুকে প্রাণ দিয়েছেন প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন সান্তা। আবার এও শোনা যায়, মাঝদরিয়ায় ডুবন্ত জাহাজের নাবিক প্রাণ পেয়েছে সান্তার কল্যাণে। আর এই জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে নেমে আসলো নিকোলাসের জীবনে। তুরস্কের সম্রাট ডায়াকলেটিয়ান সান্টাকে মায়রা থেকে বিতাড়িত করেন এবং নিজের কারাগারে বন্দি করেন । মনে করা হয় ৩৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর সেখানেই মৃত্যু হয় সেন্ট নিকোলাসের।

তাঁর হাড়ের নমুনাটি আমেরিকার ইলিনয়ের ‘সেন্ট মার্থা অব বেথানি চার্চ’-এর ধর্মযাজক ফাদার ডেনিস ও’নিলের কাছ থেকে থেকে পাওয়া যায়। তিনি আবার সেটি পেয়েছিলেন ফ্রান্সের লিয়ঁ শহর থেকে। ক্রমেই প্রমাণিত হয় সান্টা কোনও গল্পকথা নয়। সেই কোন ১৮৯৭ সালেই দ্য সান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সাংবাদিক ফ্রান্সিস ফারসেলাস লিখেছিলেন, "হ্যাঁ সান্তা ক্লজ আছে। আজ থেকে হাজার বছর, দশহাজার বছর পরেও তিনি শিশুহৃদয়ের সব মানুষকে আনন্দ দেবেন।"

আজ এই মহামারী পার করে মনে হয় যে মানসিকতা আজ আমাদের দাঁড় করায় পথে পড়ে থাকা অসহায় পরিবারদের পাশে, যে মানসিকতা আমাদের অচেনা ব্যক্তির প্রয়োজনে রক্ত দান করায়, যে মানসিকতা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী করা অনুদান পৌঁছে দেয় বন্যা কবলিত এলাকায়, যে মানসিকতায় আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, একে অপরের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ি, একে অপরকে আরও জড়িয়ে জড়িয়ে থাকি, তার নামই সান্তা। ধন্যবাদ সান্তা, আপনি যেতে যেতে এমন একটা ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন এই বসুন্ধরার চৌদিকে, যার নাম ভালোবাসা।

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।