'মা' ডাকে বলি, ডুবন্তকে দেবীর উদ্ধার, রহস্য-কথকতায় ভরা শীতলগ্রামের চৌধুরীদের দুর্গাপুজো

Burdwan Shitalgram Durgapuja: পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক ক্ষীরগ্রাম। সেটি ৫১ সতীপীঠের একটি যেখানে দেবী পার্বতীর একটি আঙুল পড়ে বলে জানা যায়। সেই মন্দিরে দেবী যজ্ঞদা রূপে পূজিত হন দুর্গা।

Ramen Das
৪ মিনিট
'মা' ডাকে বলি, ডুবন্তকে দেবীর উদ্ধার, রহস্য-কথকতায় ভরা শীতলগ্রামের চৌধুরীদের দুর্গাপুজো

যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা..

এখানে মেঘের কোলেই বিচ্ছুরিত হয় আনন্দ, মাতৃরূপে শান্তির অমোঘ বাণী। এখানে দেবীকে ছাপিয়ে এক মেয়ে আসেন ঘরে। এই গ্রামে মায়ের কাছেই আদর পান মেয়ে। স্বর্গলোকের ঈশ্বর নন, বর্ধমানের চৌধুরী বাড়িতে মা দুর্গা থাকেন মেয়ে হয়েই। বঙ্গের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এই পুজো আজও মৌলিক-অভিনব-অনন্য। জমিদারি প্রথা, সামন্ততান্ত্রিক উদযাপনের আবহ ছাড়িয়ে এই পুজো এখনও সর্বজনীন, সকলের পুজো। কেন আর কীভাবে মৌলিক হয়ে উঠেছে ৩২০ বছরের বেশি বছর ধরে চলে আসা এই পুজো?

তখনও দেশের ছত্রে ছত্রে শাসন করছেন মুঘলরা। বর্গী হানার পর্ব ছাড়িয়ে দেশজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পুজো, সনাতন ধর্মের মানুষের অবস্থানের সংকটের অভিযোগের কথা ইতিহাস দাবি করলেও বর্ধমানের মঙ্গলকোট ব্লকের শীতলগ্রাম ছিল ভিন্ন। চৌধুরী বাড়ির সদস্যদের কথায়, তখন রায়বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ির প্রভাব ওই অঞ্চলে। একদিন জানা গেল, দেবী দুর্গার প্রতিমা, মন্দির-সহ রায় বাড়ির বিরাট অংশ পুড়ে ছাই। গ্রামজুড়ে চাউর হল, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রায়বাড়ির পুজোয় ঘটেছে অনাচার! অমঙ্গলের পাপে এই সর্বনাশ হয়েছে ওই পরিবারে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতেই শীতলগ্রামের চৌধুরী বাড়ির বড়কর্তা পেলেন স্বপ্নাদেশ। স্বপ্নে দেবী তাঁকে বললেন, তিনি তাঁর কাছে ফের পুজো পেতে চান। চৌধুরী বাড়িতে আসতে চান আবার। সেই স্বপ্নের সূত্রেই তিনি গেলেন বাড়ির কাছের এক দিঘির পাড়ে। সেখানেই পেলেন এক মাতৃ অবয়ব। তাই নিয়েই প্রতিষ্ঠা করলেন ঠাকুরদালানে। শুরু হল মায়ের পুজো। কিন্তু মেয়ের মতো করেই। সেই থেকে আজও বংশ পরম্পরায় চলে আসছে দুর্গার বাড়ির মেয়ের মতো করে আরাধনা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বনেদি আভিজাত্যে বিলুপ্তির পথে নীলকণ্ঠ পাখিরা! দশমীর দিনে কেন ওড়ানো হয় এই বিশেষ পাখি?

Durga Puja Neelkantha Pakhi: শোভাবাজার রাজবাড়িতে প্রতিমা বিসর্জনের দিন নীলকণ্ঠ পাখির মূর্তি গড়ে তাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। নীলকন্ঠ পাখির ছবি এঁকে আকাশে ফানুস উড়িয়ে দেওয়া হয়।

এখানে দেবী একচালা। সন্তানদের নিয়ে পুজোর চারদিন আপ্যায়ন করা হয় তাঁকে। বাড়ির মেয়েকে ঠিক যেভাবে যত্নে রাখা হয়, ভোগ থেকে আদর- সবই চলে এই বাড়ির পুজোয়।

এই পুজোর রয়েছে আরও ইতিহাস। মূলত, ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় বোধনের পরে সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের সময় সেই দিঘির জল ভরা হয় ঘটে। বিরাট শোভাযাত্রা করে সকলে একই রঙের পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে রওনা দেন ঘটে জল ভরতে। এই পুজোয় দু’টি ঘট থাকে। চরণঘট এবং শান্তিঘট। চরণঘটে মূল পুজো সম্পন্ন করেন বাড়ির কুল পুরোহিত। এরপর অষ্টমীর পুজো, অঞ্জলি এবং সন্ধিপুজোর সময় বলি হয় চৌধুরী বাড়িতে। পশুবলির রেওয়াজ কোনওকালেই নেই চৌধুরীদের মেয়ের পুজোয়, চালকুমড়ো বলি হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাগানের মাটিতে শিশুকন্যার অলীক পায়ের ছাপ! যেভাবে শুরু হল শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো

Durgapuja: রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর কন্যা প্রতিদিন বাড়ি সংলগ্ন বাগানে তাঁর বন্ধু পদ্মাবতীর সঙ্গে খেলত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জমিদার বাড়ির কেউ পদ্মাবতীকে দেখেননি।

এই বলি নিয়েও রয়েছে জনশ্রুতি। বলা হয়, পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক ক্ষীরগ্রাম। সেটি ৫১ সতীপীঠের একটি যেখানে দেবী পার্বতীর একটি আঙুল পড়ে বলে জানা যায়। সেই মন্দিরে দেবী যজ্ঞদা রূপে পূজিত হন দুর্গা। বলা হয়, ওই মন্দিরে বলির সময়ে ‘মা’ বলে চিৎকারের শব্দ শুনে চৌধুরীদের পুজোর বলি দেওয়া হত। পরবর্তীতে ওই একই শব্দে ভর করে বাকি নয়টি পুজোর বলি হত। আর সেই শব্দ শোনার জন্য গ্রামের আলপথ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন গ্রামের বহু বাসিন্দা। পরে সময় মেনে বলি হলেও সেই শব্দ শোনার প্রচলন চলে এসেছে গ্রামের কুলদেবতা সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে। এখনও সেই মন্দিরে বলির সময় ‘মা’ ডাকের শব্দ শুনে বলি হয় চৌধুরীদের বাড়িতে। এই মন্দিরেই রোজ পুজো পাঠানোর প্রথাও রয়েছে এই বাড়িতে।

এই পুজো নিয়ে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে আছে বহু কথকতা। বলা হয়, চৌধুরীদের বাড়ির মেয়ে দুর্গা নাকি দেখা দেন মাঝে মাঝেই। কেউ কেউ বলেন, ঠাকুর দালানে সারাবছরই থাকেন মা দুর্গা। আবার বিসর্জনের দিন নাকি ঘটেছিল এক অলৌকিক ঘটনা! জানা যায়, বিসর্জনের সময় এক ব্যক্তি আটকে যান প্রতিমার বাঁশের কাঠামোর মধ্যে। ডুবে যান তিনিও। কিন্তু দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরেই ওই ডুবন্ত ব্যক্তি উঠে আসছেন ঘাটে। তিনি দাবি করেন, ডুবন্ত অবস্থায় তাঁকে নাকি কেউ টেনে তুলেছেন। তবে সেই উদ্ধারকারীকে দেখেননি তিনিও।

এই পুজোর ভোগে থাকে মেয়েকে যত্নের ছাপ। বাড়ির সকলে মিলে ভোগ রান্না করেন। পুজোর পাঁচদিন অর্থাৎ দশমীর সকল পর্যন্ত নানা পদের নাড়ু, অন্নভোগ, ফল, মায়ের জন্য বিভিন্ন পদের মিষ্টি দেওয়া হয়। সবটাই নিরামিষ। এই প্রসাদ জোটে গ্রামের সকলের ভাগেই। দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের পরে বাড়িতে আসে মাংস। আমিষ খাওয়া হয় সেদিন। বাদ যান না আগত কেউই। বিসর্জনের পরদিন মিষ্টি প্রদানের ব্যবস্থা এখনও করেন চৌধুরীরা।

ওই পরিবারের অন্যতম সদস্য তামসী চৌধুরী ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, “একটা সময় এমন অবস্থা হয়েছিল যে, আমাদের বাড়ির প্রায় সব জিনিস নিলামে ওঠে। জমিদার বাড়ির অবস্থা করুণ হয়। সেদিন কাঁসার বাসন বেচেও মায়ের পুজো করেছি আমরা। আজও সেই পরম্পরা, ইতিহাস বজায় রাখার চেষ্টা করি। অবারিত দ্বারে আমাদের মেয়ের পুজোয় আসতে বাধা নেই কারও। এখনও যতটুকু পারি সকলে মিলে, সব শরিকরা মিলে একই রাখি পুজো।”

এই পুজো এখনও জমায় ভিড়। শীতলপ্রসাদ নিতে হাজির হন শয়ে শয়ে মানুষ। পুজোর উপাচারে ঘটের গুরুত্ব এখানে বেশি। প্রতিমার সঙ্গেই মহাজাঁকজমকে ঘট আসে বাড়িতে। আবার বিসর্জনের সময় প্রতিমা নয়, ঘট বিসর্জন হয় আগে। বলিতেও রয়েছে অভিনবত্ব। সব মিলিয়ে বর্ধমানের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো এখনও যতটুকু বজায় রেখেছে, সবটার ছত্রে ছত্রে বিরচিত এক ইতিহাস, আচার আর সর্বজনীনতার মোক্ষম আবহ।

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।