জেসন রেকুলাকের 'হিডেন পিকচার্স': অসহ্য সাসপেন্স, সত্যসন্ধানী হরর-থ্রিলার

ক্লাসিক বেবি-সিটিং হরর ফিকশনকে একদম নতুন মোড়কে পরিবেশন করার এই প্রচেষ্টায় বলাই যায় জেসন রেকুলাক সফল হয়েছেন।

Suman Saha
৩ মিনিট
জেসন রেকুলাকের 'হিডেন পিকচার্স': অসহ্য সাসপেন্স, সত্যসন্ধানী হরর-থ্রিলার

ধরুন আপনার বয়স একুশ। এর মধ্যেই আপনার একটা নারকীয় ইতিহাস তৈরি হয়ে গিয়েছে। অক্সিকন্টিন, হেরোইন থেকে শুরু করে অন্য কোনো ভয়াল নেশার আসক্তির কারণে এককালে অসুস্থ হয়ে আপনাকে রিহ্যাবেও যেতে হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর গত আঠেরো মাস ধরে একজন স্পনসরের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রয়েছেন, এখনও নিয়মিত কঠোর নিয়মে জীবন বাঁধা। এমত অবস্থায় ফিলাডেলফিয়ার বিষণ্ণ ঘিঞ্জি সেফ হারবার ছেড়ে দূরে নিউ জার্সির স্প্রিং ব্রুকে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র বাচ্চা সামলানোর সুযোগ আসে, আপনার স্পনসরেরই উদ্যোগে। টেড ও ক্যারোলাইন ম্যাক্সওয়েল সম্প্রতি তাদের বছর পাঁচেকের ছেলে টেডিকে নিয়ে বার্সেলোনা থেকে ফিরে স্প্রিং ব্রুকে বাগান ঘেরা বাড়ি কিনে তাতে এসে উঠেছেন। আপনি গেলেন, ইন্টারভিউ দিলেন, খানিক তাল বাহানার পরে সিলেক্টেডও হলেন এবং অবশেষে ম্যাক্সওয়েল পরিবারে এসে থাকতে শুরু করলেন। আপনাকে বাড়ির পিছনে বেশ কিছুটা দূরে গেস্ট-কটেজে থাকতে দেওয়া হল।

সকাল-সকাল টেড ও ক্যারোলাইন কাজে বেরিয়ে যান, আর আপনাকে পুঁচকে টেডিকে সারাদিন সামলাতে হয়। কিন্তু টেডির সঙ্গে দিন কাটাতে-কাটাতে কয়েকটা অদ্ভুত ব্যাপার আপনি লক্ষ্য করলেন। বাচ্চাটা প্রত্যেকদিন দুপুরবেলা যখন নিজের ঘরে একান্তে থাকে, তখন কারও সাথে সে কথা বলে, যার কণ্ঠস্বর ঘরের বাইরে থেকে টের না পাওয়া গেলেও অদৃশ্য উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। টেডিকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় তার ইম্যাজিন্যারি ফ্রেন্ড আনিয়ার সঙ্গে সে বাতচিত চালায়, যাকে সে একাই কেবল দেখতে পায়। টেডি আনিয়ার ছবি আঁকে, আপনি দেখেছেন পাঁচ বছরের এক বাচ্চা ছেলে খাতায় এক বিদঘুটে চেহারার মহিলাকে আঁকছে। কিন্তু কোনভাবেই আনিয়াকে চোখে দেখতে পারছেন না। এই বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কেও কিছু তথ্য আপনার গোচরে আসে। এই যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে-পরেই, আপনি যে কটেজে থাকেন, সেই কটেজ ঘরে অ্যানি ব্যারেট নামের এক মহিলা রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান।

ঘরে প্রচুর রক্ত পাওয়া গেলেও অ্যানি ব্যারেটের দেহ উদ্বার করা যায় না। রাতের বেলা শুয়ে থাকাকালীন আপনার কেবলই মনে হয়, বন্ধ ঘরের ভিতরে কেউ আপনাকে এক নাগাড়ে দেখে চলেছে। ক্রমশ টেডির ড্রয়িং খাতায় বিদঘুটে দেখতে আনিয়ার অস্তিত্ব ক্রমশ আরও বেড়ে যেতে থাকে। এবং তারপর একদিন...

এমনই এক রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার উপন্যাস জেসন রেকুলাকের 'হিডেন পিকচার্স'। বইটি জেসনের দ্বিতীয় বই, প্রকাশিত হয়েছে এই বছর মে মাসে। ইতোমধ্যেই বেস্টসেলার এবং ভূয়সী প্রশংসাও পেয়েছে নিজগুণেই। টানটান গ্রিপিং ছন্দে উত্তম পুরুষে লেখা এই উপন্যাসটি একটা সময়ের পড়ে 'আনপুটডাউনেবল'-এর পর্যায়ে চলে যায়। এবং পরতের পর পরত উন্মোচিত হওয়া শুরু করে যখন, তখন মালুম হয়, শুরু থেকে সহজ রহস্য মনে হলেও এর মধ্যে অনেক জটিল, অদেখা ব্যাপার লুকিয়ে আছে। পরপর প্রচুর যুক্তিপূর্ণ অথচ অপ্রত্যাশিত টুইস্ট পাঠককে একচুল বোর করে না আর সেগুলো এমন টুইস্ট, যেগুলো পাঠক কোনোভাবেই আগে থেকে গেস করতে পারবেন না।

একুশ বছরের এই ন্যানির নাম ম্যালোরি কুইন। অপরাধবোধের বোঝা মাথায় নিয়ে সে নতুন জীবনের সন্ধানে স্প্রিং ব্রুকে এসে কাজে যোগ দেয়, কিন্তু কিছুদিন পরেই সে উপলব্ধি করতে শুরু করে, অনেক ক্ষতিকারক কিছু এই বাড়িতে লুকিয়ে আছে, যা সাদা চোখে আশেপাশের মানুষজন বুঝতে না পারলেও সে বুঝতে পারছে। অতীতের মাটিচাপা রহস্য ও বর্তমানের অদেখা অনেক ঘটনা এই থ্রিলার উপন্যাসের কাঠামো গড়ে তোলে। লেখকের মুনশিয়ানা এখানেই যে, শুরুতেই একগাদা তথ্য পাঠকদের না জানিয়ে ধীরে-ধীরে নিজের গল্পের পরিবেশ গড়ে তুলতে থাকেন। খুব বেশি চরিত্রের ঘনঘটা না থাকলেও প্রত্যেকটি চরিত্রকেই যথেষ্ট সময় দিয়ে বোনা হয়েছে, ফলে কোনো মোচড়ই অহেতুক লাগে না। বেশ যত্ন নিয়ে স্প্রিং ব্রুকের সাবারবান ভাইভ-টাকে ফুটিয়ে তুলেছেন জেসন এবং সেইসাথে ম্যাক্সওয়েল পরিবারের বাড়ির চারপাশটাকেও। বড়ো প্রশংসা প্রাপ্য এই বইয়ের দুর্দান্ত ইলাস্ট্রেশনগুলোর কারিগর উইল স্টাইহিল ও ডুগি হর্নারের। প্রত্যেকটা ইলাস্ট্রেশনই প্লটের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং রহস্য উন্মোচনে এগুলোর বড়ো ভূমিকাও রয়েছে।

এটি হরর নভেল হওয়ার পাশাপাশি অনেক বেশি করে মিস্ট্রি থ্রিলারও। হার হিম করা ভূতের গল্প পড়ব ভেবে পড়তে বসলে ভুল করবেন, কিন্তু যদি চান বুক চাপা রহস্য উন্মাদনায় বিভোর হয়ে যেতে এবং শকিং টুইস্টে অহরহ চমকে উঠতে, তাহলে এই বই আপনার জন্য।

ক্লাসিক বেবি-সিটিং হরর ফিকশনকে একদম নতুন মোড়কে পরিবেশন করার এই প্রচেষ্টায় বলাই যায় জেসন রেকুলাক সফল হয়েছেন। স্বয়ং স্টিফেন কিং-এর প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিভিন্ন খ্যাতনামা ক্রিটিকদের বাহবা পেয়েছেন। আশা করি পরবর্তীতেও এঁর কাছ থেকে অসাধারণ কিছু পেতে চলেছি।

ও হ্যাঁ, শেষের এপিলগখানা সামলে পড়বেন। খুব ইমোশনাল। এবং এই ইমোশন ভীষণভাবে জাস্টিফায়েড।

মুদ্রিত মূল্য-২০৮৮ টাকা

লিখেছেন
Suman Saha
Suman Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।