হিন্দু দেবতার দেখভাল করেন মুসলিমরা, ধর্মের ভেদাভেদ মিলেমিশে যায় বাংলার এই শিব মন্দিরে

Famous shishuyeswar shiv mandir : বিভেদের মাঝে যে মহা মিলনের কথা ভারতের প্রসঙ্গে বারবার বলে গিয়েছেন মুনী ঋষিরা, তা যে প্রকৃতই সে কথা মিলে যায় এই মন্দিরের অন্দরে

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
হিন্দু দেবতার দেখভাল করেন মুসলিমরা, ধর্মের ভেদাভেদ মিলেমিশে যায় বাংলার এই শিব মন্দিরে

আদ্যোপান্ত মুসলিম এলাকা, মুসলিম পাড়া বলতে যা বোঝায় আরকি। ঠিক তার মাঝেই রয়েছে একটা আস্ত শিব মন্দির। ধর্ম নিয়ে বিভেদ কেবল মানুষের মধ্যেই, দেবতার যে তাতে কিছুই যায় আসে না তা যেন প্রমাণিত হয় এইখানে এসে। মুসলিম বাসিন্দাদের সেবাতেই শিবের বসবাস এখানে, এমনকী দৈব মহিমা নিয়ে বর্ণনাও করেন তারাই। মুর্শিদাবাদ, বাংলার প্রাচীন স্থাপত্য এবং ইতিহাসের সাক্ষী এই জেলা। এখানেই রয়েছে এমন নিদর্শন। স্থানীয় মুসলিম জমিদার হাজি আরাম হোসেনের জমির ওপরে তৈরি হয়েছে এই মন্দির। ওই জমিদার নিজেই মন্দির তত্ত্বাবধান করতেন। তিনি মারা যাওয়ার পরে তাঁর ছেলেরা এই মন্দিরের দেখভাল করেন। সেই থেকে প্রজন্মের হাত ঘুরে হিন্দু দেবতা নিত্যদিন জল বাতাসা পান মুসলিমদের হাতেই।

বিভেদের মাঝে যে মহা মিলনের কথা ভারতের প্রসঙ্গে বারবার বলে গিয়েছেন মুনী ঋষিরা, তা যে প্রকৃতই সে কথা বোঝা যায় মুর্শিদাবাদের ওই শিব মন্দিরে পা রাখলেই। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই মন্দিরটি। সেই থেকে একইভাবে মুসলিমদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে মন্দিরটি। বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানে যখন বড়ো করে পুজোর আয়োজন করা হয় তখন তার দেখভালও করেন তাঁরাই। দেবতাকে জাগ্রত বলে প্রচার করার দায়ভারটুকুও তাদের ওপরই বার্তায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নাগ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব মেলে এখানে, আজও নিয়মিত পুজো হয় বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এই হিন্দু মন্দিরে

Oldest Hindu Temple : সারা বছরই ভক্ত এবং পর্যটকদের কম বেশি ভিড় থাকলেও রামনবমী ও শিবরাত্রির দিন বিশেষ করে ভক্তের ঢল নামে এই মন্দিরে, কোন দেবতার পুজো হয় এখানে?

স্থানীয় ভাষায় ওই শিব শিশুয়েশ্বর শিব নামে পরিচিত। মুর্শিদাবাদের ভরতপুর বিধানসভা অঞ্চলে রয়েছে এই মন্দির। কাছাকাছি রেলস্টেশন বলতে সালার। স্টেশনে নেমেই মিলবে টোটো, তারই একটাতে চেপে প্রায় তিন কিলোমিটারের পথ। ওই পথেই পড়বে উজানিয়া-শিশুয়ায়। আর সেখানেই রয়েছে প্রাচীন এই শিশুয়েশ্বর শিব মন্দির। এখানে শিবলিঙ্গ বৃদ্ধিচক্র শিশুয়েশ্বর শিব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাভারতের 'ঘৃণ্য' চরিত্র পূজিত হন ভারতে! দুর্যোধন মন্দিরের যে কাহিনি অবাক করবেই

Duryodhana Temple Kerala: এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। ভিতরে গেলে কেবল একটি উঁচু মঞ্চ দেখতে পাওয়া যায় যাকে বলা হয় মণ্ডপম বা আলথারা।

লোকমুখে শোনা যায়, প্রাচীনকালে এখানে চারিদিকে ছিল ঘন জঙ্গল। বেশ খানিকটা দূরে এক গ্রামের বাসিন্দা নফর পালের গোরু নিজে থেকেই এখানে এসে দুধ দিয়ে যেত। গরুর মালিক বিষয়টা নিয়ে বেশ অবাক হন, তার পর খোঁজ নাইট জানতে পারেন, এই এলাকায় পড়ে থাকা একটি ঢিপির ওপর পাথরে রোজ দুধ দিয়ে যায় ওই গোরু। কয়েকদিন লক্ষ্য করার পর তিনি দেখতে পান, পাথরটি ক্রমশ বাড়ছে।

কথায় বলে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এই শিবের ক্ষেত্রেও হয়েছে ঠিক তাই। বিশ্বাসের জোরেই এখানে বছরের পর বছর পূজিত হন শিশুয়েশ্বর। গরু বৃতন্তের খবর ছড়িয়ে পড়ে কম দিনের মধ্যেই। খবর পেয়ে বর্ধমানের মহারাজা এখানে এসে ঠিক করেন মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই খোদ মুসলিম পট্টির মধ্যে গড়ে ওঠে আস্ত একটা হিন্দু মন্দির। প্রথম দিকে কাটোয়া থেকে পুরোহিত এনে তিনি এই মন্দিরে নিত্য পুজো শুরু করেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা যায় অন্য, শোনা যায় মন্দিরের শিব লিঙ্গটি নাকি ক্রমশ আরও বাড়তে থাকে। শেষে ভক্তরা প্রার্থনা করেন যাতে আর বৃদ্ধি না পায়। অবাক করা বিষয় হল, সেই প্রার্থনার ফলও নাকি মেলে শীঘ্রই। দেখা যায়, শিবলিঙ্গটি তিনখণ্ড হয়ে গিয়েছে। মূলখণ্ডটির পাশে মন্দিরের মধ্যেই পাওয়া যায় আরও একটি খণ্ড। আর তৃতীয় খন্ডটি গঙ্গার উজানে ভেসে চলে যায়। এই গঙ্গার উজানে এখানে হল আসত বলেই জায়গাটির নাম হয় উজানিয়া। ভৌগলিক ব্যাখ্যায় যদিও পাথর ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়া নিয়ে অন্য তত্ত্ব মেলে, কিন্তু তাতে ভক্ত আর বিশ্বাসের পায়ে কুড়ুল মারার ক্ষমতা জন্মায় না। তাই ওই বিশ্বাসের জোরেই এখানে দেবতা জাগ্রত হতে ওঠেন দিনদিন। হিন্দুরা তো বটেই মুসলিম ভক্তরাও আপন করে নিন বিগ্রহকে। ধর্মের ধ্বজা ওড়ে মিলনের সূত্র ধরেই।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।