নদীর অতলে তলিয়ে গেছে একের পর এক মন্দির, পুরুলিয়ার যে ইতিহাস চলে গেছে আড়ালে

Telkupi Temples: গত শতাব্দীতেই শেষ মন্দিরগুলিও ডুবে গিয়েছে। হয়তো এই শতকেও দু'-একটি মন্দির আরও বেশিই বেঁচে থাকত। কিন্তু '৫৭ সালে দামোদরের ওপরে দেওয়া হল বাঁধ।

Sindhu Som
৪ মিনিট
নদীর অতলে তলিয়ে গেছে একের পর এক মন্দির, পুরুলিয়ার যে ইতিহাস চলে গেছে আড়ালে

পুরুলিয়ার তেলকূপির নাম শুনেছেন? না শোনারই কথা। চারদিকে জল, দামোদরের মাঝে মাথা তুলে আছে কেবল দু'টি মন্দিরের চূড়া। কিছু দূরে পড়ে দেউলের বিগ্রহ। বর্তমানে তেলকূপি বলতে কেবল এটুকুই। জল কম থাকলে হয়তো আরেকটা মাথা দেখা যায় কখনওসখনও। অথচ একটা সময় ছিল, যখন এই তেলকূপি ছিল এক প্রাচীন শহরের প্রাণকেন্দ্র। এই অঞ্চল ছিল শিখর রাজাদের রাজধানী ‘তৈলকম্পি’। ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস রাজন্য কাণ্ড’-তে নগেন্দ্রনাথ বসু লিখছেন, এই অঞ্চলকে এককালে শিখরভূম বলা হতো। একাদশ শতকে এই অঞ্চলে এক স্থানীয় রাজার খোঁজ পাওয়া যায়, তাঁর নাম রুদ্রশিখর। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ও রুদ্রশিখরের উল্লেখ করেছেন। তাঁর রাজত্ব ছিল আনুমানিক ১০৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। প্রায় সমসাময়িক কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর (১০৮৪-১১৫৫) ‘রামচরিত’-এও এই রুদ্রশিখরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় আসেন মার্কিন-ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার জোসেফ ডেভিড বেগলার। সেসময় এইসব মন্দির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন সাহেব। ১৯৭৮-এ যখন ‘রিপোর্ট অফ এ ট‍্যুর থ্রু দ্য বেঙ্গল প্রভিন্সেস’-এর আট নম্বর খণ্ড বেরোল, দেখা গেল সেই খণ্ডে সাহেব ‘তৈলকম্পি’-র উল্লেখ করেছেন। তিনি এর ওর কাছ থেকে শুনেছিলেন, বিক্রমাদিত্য নামে এক স্থানীয় রাজা এখানে এসে গায়ে ভাল করে তেল ডলতেন, তারপর ডালমির ছাতা পুকুরে স্নান করতে যেতেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জ্বরের জন্য ১৪ দিনের নিভৃতবাসে থাকতে হয় জগন্নাথকেও! জেনে নিন পৌরাণিক কোয়ারেন্টাইনের গল্প

ভারতে কোয়ারেন্টাইনের ইতিহাস অনেক অনেকদিনের পুরনো। এমনকী, পুরীর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে পর্যন্ত প্রতি বছর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। আজ সেই ইতিহাসের গল্প করি চলুন।

এখন ডালমি থেকে তেলকূপির দূরত্ব প্রায় আশি কিলোমিটার। কাজেই এই থিওরি বাতিল করাই মঙ্গল। ঐতিহাসিক সুভাষ রায় পুরুলিয়ার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। সুভাষ বললেন, ‘তৈল’ এখানে তেল নয়, এ হল এক ধরনের কর, আর ‘কম্প’ এসেছে খুব সম্ভবত ‘কম্পন’, অর্থাৎ পরগনা থেকে। মানে তৈলকম্পি অর্থে কর প্রদানকারী স্থানীয় ছোট রাজ্য। এখন প্রশ্ন হল, এই ‘ছোট’ অঞ্চলে এতগুলি মন্দির বানাল কে?

দেবলা মিত্র ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সার্ভে বিভাগের ভূতপূর্ব ডিরেক্টর জেনারেল, নিজে একজন প্রত্নতাত্ত্বিকও বটে। ১৯৫৯ সালে তিনি নিজের গবেষণা লব্ধ তথ্য একত্র করে একটি বই লেখেন, 'তেলকূপি—আ সাবমার্জড টেম্পল-সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল'। তিনি মনে করেন, শিখর রাজাদের বংশধর পাঞ্চেৎ ও কাশীপুরের রাজারাই এই মন্দিরগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেবলা মিত্র লিখেছেন, স্থানীয় লোকজন তেলপকুপির একটি অংশকে ‘মহল’ নামে ডাকে। এই অংশে প্রচুর ইট ও পাথরের স্থাপত্যও রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেসবের কোনও চিহ্নও আর পাওয়া যায় না। অপরদিকে বেগলার এই নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে মন্দিরগুলির প্রতিষ্ঠাতা রাজারা নয়, মূলত মহাজন এবং বণিকদের হাতেই তৈরি এ সমস্ত মন্দির। একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক পথ ও সেই পথের অন্যতম বাধা দামোদরের সঙ্গমস্থল হিসেবেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে এই অঞ্চল। কিন্তু মিত্র এবং বেগলার– দু'জনেই একজায়গায় একমত। উভয়ের মতেই তেলকূপি দামোদরের তীরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে এর গুরুত্ব কমে আসে। একসময় নদীর পেটের ভেতর তলিয়ে যায় সমস্ত অঞ্চলই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজও দু'চাকাতেই গড়াচ্ছে দেশ, গরিব ভারত ভোটে জেতাল স্কুটারকে

National Family Health Survey: ২০২২ সালের 'ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে' অনুসারে, ৮ শতাংশ ভারতীয় পরিবারের নিজস্ব চারচাকা গাড়ি রয়েছে।

১৮৭২-'৭৩ সাল নাগাদ বেগলার প্রথম আসেন তেলকূপিতে। বেগলার তিন ধরনের মন্দির দেখেছিলেন। প্রথম মন্দিরমালাটিই সবথেকে বড়। তাতে ১৩খানি মন্দির ছিল দামোদরের গা ঘেঁষে। দ্বিতীয় দলে ছিল ছ'খানি মন্দির, এবং প্রচুর পাথরের বিগ্রহ, তাদের মধ্যে কেবল চারটিকেই উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছিল বেগলারের। তৃতীয় দলে বেগলার তিনটে মন্দির এবং একটি ইটের ভগ্নস্তূপ আবিষ্কার করেন। ভগ্নস্তূপটি কোনও মনাস্ট্রির ধ্বংসাবশেষ বলেই মনে হয়েছিল তাঁর। মন্দিরগুলির ন'টি ছবি তোলেন সাহেব। এইগুলিই তেলকূপির সবথেকে প্রাচীন ফোটো ডকুমেন্টেশন। বেগলার ‘বিরূপ’ নামে একটি বিগ্রহের কথা বলেন, স্থানীয় লোকেরা যার পুজো করত, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন, সেটি ২৪তম তীর্থঙ্কর বীর বা মহাবীরের বিগ্রহ।

১৮৯৬ সালে বাংলার প্রাচীন সৌধগুলির কথা একসঙ্গে ছেপে বের করছে পাবলিক ওয়ার্ক্স ডিপার্টমেন্ট অফ বেঙ্গল। তাতে দেখা যাচ্ছে, বেগলার-উল্লিখিত তেলকূপির মন্দিরগুলির মধ্যে কেবলমাত্র প্রথম তেরোটিরই উল্লেখ রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে মন্দিরগুলির স্থাপত্যরীতির কথা, একটি বড় পাথর কুঁদে এইসব স্থাপত্যের অংশগুলি নির্মাণ করা হয়েছে, এবং তা জোড়া হয়েছে পরম যত্নের সঙ্গে। মনে করা হয় শৈব এবং বৈষ্ণব উভয় ধর্মের মানুষই এখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল। কারণ শিবলিঙ্গ, গণেশমূর্তি, বিষ্ণূমূর্তি– উদ্ধৃত হয় অনেক বিগ্রহই। নথিটি বলছে, সমগ্র মানভূমের কোথাও তেলকূপির মতো এমন এতগুলি মন্দির একসঙ্গে নেই। নথিটি এও জানায়, দামোদর ধীরে ধীরে মন্দিরগুলির দিকে এগোচ্ছে। একটির পর একটি মন্দির ক্রমে চলে যাচ্ছে জলের অতলে।

১৯০৩ সালের গোড়ার দিকে বেঙ্গল সার্কেল আর্কেওলজিক্যাল সার্ভেয়ার টি ব্লক তেলকূপি আসেন। ১৩টির মধ্যে মাত্র দশটি মন্দির তাঁর নজরে পড়ে। তিনিও প্রথম মন্দিরমালার বাইরে খুব একটা নজর করেননি আর কিছু। এর মধ্যে দু'টি মন্দির দেখে ব্লকের মনে হয়েছিল, তাদের স্থাপত্যরীতি অত্যন্ত আধুনিক। এই দু'টি মন্দিরে তখনও রোজ পুজো হতো। একটি ভৈরবনাথের মন্দির, অপরটি মা কালীর। ব্লকের বয়ান অনুযায়ী বেশিরভাগ মন্দিরেই বিগ্রহ হিসেবে ছিল শিবলিঙ্গ, আবার কয়েকটিতে সূর্যদেবের পুজোও হত।

গত শতাব্দীতেই শেষ মন্দিরগুলিও ডুবে গিয়েছে। দেবলা মিত্র যখন দেখেছেন, তখন মোটে পাঁচটি মন্দির বেঁচে রয়েছে। হয়তো এই শতকেও দু'-একটি মন্দির আরও বেশিই বেঁচে থাকত। কিন্তু '৫৭ সালে দামোদরের ওপরে দেওয়া হল বাঁধ। পাঞ্চেৎ থেকে তেলকূপির দূরত্ব মাইল নয়েক। তেলকূপির জলের উচ্চতা বাড়তে লাগল হু হু করে। বাঁধের কাজ কদিন স্থগিত রাখার জন্য আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু সেই খবর পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কয়েক শতকের ইতিহাস চলে গেল জলের তলায়। এখন তেলকূপি ব্রাত্য। কেউই আর চেনেন না তেমন। অথচ সেই তিন দেউল সাক্ষী, একদিন তার যশ ছিল, ছিল যথেষ্ট প্রতিপত্তিও।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।