‘লুচি’ নামের আসল রহস্য কী? জানেন কীভাবে জন্ম হল এই জনপ্রিয় খাবারের?

Bengali Food Luchi : জলখাবার অথবা পেটচুক্তি আহার, লুচির প্রতি টান আজও অটুট, জানেন কবে কথায় প্রথম হদিশ মেলে এই পদের?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
‘লুচি’ নামের আসল রহস্য কী? জানেন কীভাবে জন্ম হল এই জনপ্রিয় খাবারের?

ফুলকো লুচি আর সাদা আলুর তরকারি, কালো জিরে দিয়ে; চিরাচরিত এ বাঙালি পদের আজও তুলনা মেলে না সহজে। আজকের পিৎজা, পাস্তা কিংবা বর্গারের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লুচির মাহাত্ম্য কমে না এক রত্তিও। বহু যুগ আগে থেকেই লুচির সঙ্গে সঙ্গত করে আরও বেশ কিছু পদ যেমন আলুরদম, ঘুগনি, মাংস অথবা সুজির হালুয়া। শুধু জলখাবার বলেই নয়, এমনকী পেটচুক্তি আহারেও জবাব নেই লুচির। ছাঁকা তেলে ভাজা ময়দার লুচি, ফলে আজকের সময়ের ডায়েটের সঙ্গে অবশ্য একেবারেই খাপ খায় না এই পদ। যদিও তাতে বাঙালির বিশেষ কিছুই যায় আসে না। আজও হেঁশেল থেকে ঘিয়ে ভাজা লুচির গন্ধ পেলে কোন এক অজানা কারণে মনটা কেমন করে ওঠে।

বাংলার প্রিয় পদ হলেও এই নামটি মোটেই কোনও বাংলা শব্দ নয়। এমনকী প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথিতেও কোথাও উল্লেখ মেলে না লুচি নামের কোনও পদের। অথচ বাংলার সঙ্গে কিভাবে এমন অটুট বন্ধন গড়ে উঠলো এই খাবারের, তা যেন সত্যিই রহস্য। আসলে সুস্বাদু এই জলখাবারের নামটি একটি হিন্দি শব্দ। ঘি-তে ভাজা লুচি হাতে নিলে তার মধ্যে লেগে থাকা ময়ানের জন্য পিছলে যায়। এই পিচ্ছিল হয়ে যাওয়াকে হিন্দিতে 'লুচ' বলা হয়, আর সেখান থেকেই থাকি এই খাবারের নাম হয়েছে লুচি।

যদিও এই হিন্দির সঙ্গে যোগকে এক কথায় মেনে নেয়নি সকলেই। এ নিয়ে ভিন্ন মতেরও খোঁজ পাওয়া যায়। অনেকের মত, সংস্কৃত শব্দ লোচক থেকে এসেছে লুচি শব্দটি, বাংলায় যার অর্থ হল চোখের মনি। আসলে লুচি যেহেতু চোখের মনির মত গোল, তাই এহেন নামকরণ। যদিও এই দুই মোট ছাড়া আরও বেশ কিছুই মতের কথা শোনা যায় ইতিউতি। কিন্তু কোনওটা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেলে না। তবে সংস্কৃত লোচক অথবা হিন্দি লুচ শব্দ দুটির দিকে পাল্লা ভারী থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলায় দেদার চল কচুরি, লুচি এবং পুরির, জানেন আসলে কী তফাৎ এই তিনটি খাবারের?

Interesting Facts About Luchi : বাহ্যিক দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে অবশ্য লুচি, পুরী আর কচুরী তিনটে প্রায় একই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে ভিন্ন ভিন্ন

এ দেশে প্রথম লুচির হদিশ মেলে আজ থেকে বহু বছর আগে, পাল যুগে। সেইসময়কার বিখ্যাত চিকিৎসক চক্রপাণি দত্তের লেখা 'দ্রব্যগুন' গ্রন্থে উল্লেখ ছিল লুচির। সেখান থেকেই জানা যায় এ8 লুচিও বাকি তিন প্রকারে খেত ভারতীয়রা। যথাক্রমে - খাস্তা, সাপ্তা ও পুরি। বেশি ময়ান দিয়ে তৈরি লুচি হল খাস্তা লুচি। ময়ান ছাড়া ময়দা দিয়ে তৈরি লুচি ছিল সাপ্তা লুচি। আর ময়দার পরিবর্তে আটা দিয়ে যে লুচি তৈরি হত তা ছিল পুরি। তবে পাল যুগে মূলত খাস্তা লুচিই বেশি খাওয়া হতো। চিরন্তন সেই ঐতিহ্য মেনে আজও বাঙালির কাছে লুচি নামক পদটির বিশেষত্ব কমেনি একটুও।

আজকাল আটা ময়দা মিশিয়ে লুচি করা হলেও বাঙালি বাড়িতে ধবধবে সাদা লুচির প্রতি টানই সব চাইতে বেশি। অর্থাৎ শুধু ময়দার লুচি। আর যদি আটা দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে রঙ হয় লালচে, যদিও সেটা তখন আর লুচি থাকে না, হয়ে যায় পুরি। আজকাল পথ চলতি বহু দোকানেই এই খাবার পাওয়া যায়।

শুধু স্বাদ অথবা উপকরণ নয় বাংলার নানা প্রান্তে লুচির আয়তনও ভিন্ন ভিন্ন। গ্রাম বাংলা থেকে যত কলকাতার দিকে যাওয়া যাবে লুচির আয়তন তত কমতে কমতে ছোট হতে থাকে। যেখানে গ্রামের দিকে একটি লুচির ব্যাস মোটামুটি ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি, সেখানে কলকাতার দিকে তা কমতে কমতে ৩-৪ ইঞ্চিতে ঠেকে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, এর নেপথ্যেও রয়েছে লুকনো শ্রেণী বৈষম্য। শিক্ষিত উন্নত শ্রেনী নিজেদের বাবুয়ানার নিদর্শন হিসেবে ছোট আকারের লুচি খাওয়া পছন্দ করেন।

জানা যায় একসময় সবচেয়ে বড় আকারের লুচি পাওয়া যেত এই বাংলায়। দিনাজপুরের কান্তনগরের কান্তজিউ মন্দিরের ঠাকুরবাড়িতে ভোগ দেওয়া হয়তো সেই বৃহৎ লুচির। একেকটা লুচির একার আস্ত একটা থালার মতো। বর্তমানে মালদহ জেলার ইংরেজবাজারের সাদল্লাপুর শ্মশানের কাছে হাতির পায়ের মতো বড় লুচি পাওয়া যায়, যার ব্যাস প্রায় ১০ ইঞ্চির কাছাকাছি। যদিও এর বিপরীতে এবার সবচেয়ে ছোট লুচির চলও রয়েছে এই বাংলায়। মেদিনীপুরের রাধামোহনপুরের পলাশী গ্রামের নন্দী পরিবারের ঠাকুরবাড়িতে ভোগ হিসেবে যে লুচি দেওয়া হয় তার ব্যাস ১-১.৫ ইঞ্চির মত। মনে করা হয় এটিই বাংলার সবচেয়ে ছোট লুচি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে লুচির স্বাদ বাঙালির এই হালফিলের ডায়েট যুগকেও রীতিমতো টেক্কা দিতে সক্ষম।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।