বিড়ালের চোখ হয়ে উঠল চশমা! যেভাবে জন্ম নিল ক্যাট আই গ্লাসেস

Cat Eye Glasses History: শিনাসির নকশা দেখে নাক সিঁটকোলেন অনেকেই। বিশ্ববিখ্যাত সব চশমা নির্মাতারা (যেমন রে ব্যান) এই নকশার চশমা বানাতেই চাইলেন না।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
বিড়ালের চোখ হয়ে উঠল চশমা! যেভাবে জন্ম নিল ক্যাট আই গ্লাসেস

বিড়াল চক্ষু চশমা। বিড়ালের মতো রহস্যময়, আদুরে অথচ ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা এক প্রাণী কমই আছে। ঠিক এই গুণ বা বৈশিষ্ট্যটিই কীভাবে যেন জুড়ে গিয়েছে মহিলাদের আকর্ষণে আর তার থেকেই মহিলাদের চশমাতেও! হালে ফের বাজার মাত করেছে ক্যাটস আই সানগ্লাস, সাধারণ চশমাতেও ক্যাট আই ধরন পছন্দ করছেন মহিলারা। মহিলাদের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা নিছক কম হয়নি, কম হবেও না। তবে বিড়াল কীভাবে হয়ে উঠল চশমার অনুপ্রেরণা? এই বিশেষ চশমার নেপথ্যে থাকা শিল্পীকেই শ্রদ্ধা জানিয়েছে গুগল ডুডল, ৪ অগাস্ট তাঁর জন্মদিনে।

ক্যাট-আই ছিল ইতিহাসে প্রথম মেয়েদের চশমার স্টাইল। ১৯২০-র দশকের শেষের দিকে আলটিনা শিনাসি মিরান্ডা প্রথম এই ক্যাট আই চশমার উদ্ভাবন করেন। বলা যায়, মূলত পুরুষ-চালিত চশমা শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনিই। হলিউডের কিংবদন্তী অড্রে হেপবার্ন এবং মেরিলিন মনরোর পরা সানগ্লাস হোক, বা সদ্য কলেজে পা রাখা ছাত্রীর নতুন চশমা বাছাই, ক্যাট আই এখনও রয়েছে পছন্দের শীর্ষে।

মেড ইন ম্যানহাটন : ক্যাট আই চশমা জন্ম নিল কীভাবে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ছিল ধনীদের বিলাস! কীভাবে মধ্যবিত্ত মহিলাদের 'জাতীয় পোশাক' হয়ে উঠল নাইটি?

Evolution of Nightie: বেবিডল তো আর আপামর জনজাতির চাহিদা নয়, চাহিদা হচ্ছে পাতলা সুতির নরম নাইটির।

আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ডিজাইনার আলটিনা শিনাসি মিরান্ডা না থাকলে এই বিড়াল চোখের গল্প শুরুই হতো না। একদিন নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউতে একজন চোখের ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় শোকেসের দিকে চোখ গেল মিরান্ডার। ইউনিসেক্স ফ্রেম রাখা রয়েছে সেখানে। ডরোথি পার্কারের একটি লাইন মাথায় খেলে গেল হঠাৎ—“Men seldom make passes at girls that wear glasses”! ব্যাস, বিপ্লবের এই ছিল বুনিয়াদ। শিনাসি মিরান্ডা এমন এক জোড়া চশমা তৈরির কথা ভাবলেন যাতে একজন মহিলাকে আরও আকর্ষণীয় দেখাবে। ভেনিসের হার্লেকুইন মুখোশ নিয়ে নাড়াঘাঁটা করলেন। এই হার্লেকুইন মুখোশ থেকেই জন্ম নিল হারলেকুইন চশমা, যা পরে বিখ্যাত হয়ে গেল ক্যাট-আই নামে।

১৯০৭ সালের ৪ অগাস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে জন্ম শিনাসির। স্নাতকস্তরের পাঠ শেষ করার পরে প্যারিসে চিত্রকলা বিষয়ে পড়ার সময়ই শিনাসির এই শিল্প প্রেমের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পরই নিউ ইয়র্কের আর্ট স্টুডেন্টস লিগে নিজের শৈল্পিক ক্ষমতাকে শান দিতে থাকেন তিনি। তাঁর এই হার্লেকুইন চশমা তৈরি চশমা শিল্পে এক মোড় বদলানো ঘটনা বলা যায়। ১৯৩১ সালে, আমেরিকান অপটিক্যাল ফাল-ভ্যু প্রবর্তন করে- এটিই প্রথম প্যান্টোস্কোপিক ফ্রেম। এই প্রথম ফ্রেমের উপরের অংশে কব্জাগুলি বসানো হয় যাতে, যিনি চশমা পরে আছেন চশমার কাঁচটি তাঁর দিকে হেলে থাকবে। এই প্রযুক্তিগত উন্নতি চশমার নতুন আকারের দরজা খুলে দেয়। মুখের সঙ্গে আরও ভালো ফিট করবে এমন ফ্রেমের কদর বাড়তে থাকে।

সেই পথ ধরেই আলটিনা শিনাসি নানা রকম চশমার নকশা আঁকার পরে অবশেষে এই ক্যাট আই আবিষ্কার করেন। এই প্রথম পুরুষ এবং মহিলাদের চশমা আলাদা করে শ্রেণিবদ্ধ হলো আর রোজের দরকারের পাশাপাশি ফ্যাশনের এক চরম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল ক্যাট আই। তবে অত সহজ তো নয় কিছুই! শিনাসির নকশা দেখে নাক সিঁটকোলেন অনেকেই। বিশ্ববিখ্যাত সব চশমা নির্মাতারা (যেমন রে ব্যান) এই নকশার চশমা বানাতেই চাইলেন না। ম্যাডিসন অ্যাভিনিউতে একটি বুটিক অপটিক্যাল দোকানে একজন সহযোগীকে খুঁজে পেলেন শিনাসি মিরান্ডা। তাঁর এই নয়া ক্যাট আই ডিজাইনগুলি আমেরিকান লেখক ক্লেয়ার বুথ লুস এবং অভিনেত্রী ক্যাথারিন কর্নেলের মতো হাই-প্রোফাইল মহিলাদের কাছে বিক্রি করলেন সেই ব্যক্তি। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে, হার্লেকুইন চশমা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে সেগুলি বিক্রির জন্য শিনাসি তাঁর নিজস্ব কোম্পানি শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে, চশমা শিল্পে বিপ্লব ঘটানো এবং অপটিক্যাল চশমাকে ফ্যাশনে রূপান্তরিত করার জন্য লর্ড এবং টেলরের কাছ থেকে আমেরিকান ডিজাইন পুরস্কার লাভ করেন শিনাসি।

১৯৪৭ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর পরেই, ক্রিশ্চিয়ান ডিওর নয়া ক্যাট আই লুক নিয়ে আসেন। বাইরের প্রান্তটি আরও সরু, একজন মহিলার মুখের গঠনকে আরও নিখুঁতভাবে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে হলিউডের ফ্যাশনে অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হয়ে যায় ক্যাটস আই গ্লাসেস। মেরিলিন মনরো ক্যাটস আইকে নিজের সিগনেচার লুক করে তুলেছিলেন। গ্রেস কেলি এবং এলিজাবেথ টেলরের বিশেষ পছন্দ ছিল এই বিড়াল চক্ষু। তারপর, ১৯৬১ সালে, অড্রে হেপবার্ন অলিভার গোল্ডস্মিথ 'ম্যানহাটান' সানগ্লাস পরে ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফনি'-তে অভিনয় করলেন। বড় আকারের ক্যাট-আই সানগ্লাস সেই থেকে হয়ে উঠল বিখ্যাত। ইতালিতে, আনুক আইমি এবং সোফিয়া লরেনের মতো সেই সময়ের চলচ্চিত্র তারকারাও অন-স্ক্রিন এবং অফ-স্ক্রিন দুই ক্ষেত্রেই ক্যাট-আই পরতে শুরু করলেন। এরপর থেকে বিশ্বজুড়েই কদর বাড়ে ক্যাট আই সানগ্লাসের। এদেশে রেখা থেকে শুরু করে বর্তমানের সমস্ত অভিনেত্রীই ক্যাট আই চশমাকে করে তুলেছেন নিজেদের আকর্ষণের অন্যতম উপাদান। ফ্যাশনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সাধারণ জীবনেও ক্যাট আই চশমা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। আর এই সবের নেপথ্যে রয়েছেন শিনাসি। তাঁর ১১৬ তম জন্মদিনে গুগল ডুডল তাঁকে সম্মান জানিয়েছে। চশমার প্রয়োজনকে বিলাসের সোহাগে ডুবিয়েছিলেন তো তিনিই, সেই কোন কালে!

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।