তুবড়ি থেকে ফানুস, আতসবাজির সেই উন্মাদনা হারিয়েছে কালীপুজোর কলকাতা?

Kalipuja 2023: কোম্পানির আমল থেকেই বলতে গেলে দীপাবলীর উৎসবের সমারোহে যোগ হল আতসবাজি। তখন অবশ্য বাংলায় তেমন বাজি তৈরির চল ছিল না।

Sohini Das
৩ মিনিট
তুবড়ি থেকে ফানুস, আতসবাজির সেই উন্মাদনা হারিয়েছে কালীপুজোর কলকাতা?

"ফুটফাট দুমদাম শুনে লাগে খটকা"- পরিবেশ দূষণের এমন ভ্রূকূটি তো আর বরাবর ছিল না। সে সময় কালীপুজোর রাত মানেই পটকা ফাটার শব্দ, ফুলঝুড়ির জ্বলন্ত তারা কিংবা রংমশালের রশনাই। তার দিন কয়েক আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। বাজি কেনা, সেসব বাজি রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া, উল্টে পাল্টে দেওয়া, বিস্তর কাজ। কেউ কেউ আবার পছন্দ করতেন নিজে হাতে বাজি বানাতে। বাজির মশলা তৈরি, সেইসব খোলে ভরে দুর্ধর্ষ তুবড়ি বানানো, তার উত্তেজনাই আলাদা।

কালীপুজোর সঙ্গে আলোর সম্পর্ক চিরকালীন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে আসার আগে পর্যন্ত মাটির প্রদীপ দিয়ে ঘর আলোকিত করা। সেই মাটির প্রদীপে কখনও ব্যবহার করা হত কখনও সরষের তেল তো কখনও রেড়ির তেল, কখনও আবার ঘি। ক্রমে সেই মাটির প্রদীপের জায়গা নিল গ্যাসের বাতি। তখনকার অভিজাতপনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল কে কত আলোয় বাড়ি সাজাতে পারে। আলোকসজ্জার সমারোহে কে কত টাকা ব্যয় করলেন, এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জলসাঘর গল্পে শুকতারার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা হালের বড়লোক গাঙ্গুলীবাবুদের বাড়ির সেই বহুশক্তিবিশিষ্ট বিজলি বাতিটিকে নিশ্চয়ই ভুলিনি আমরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেবীর স্বপ্নাদেশ! গ্রামের বিলে সালঙ্কারা ভাসান যান ঋষিপুরের ডাকাতকালী

Kalipuja 2023: মানতের সোনা বা রূপোর গয়না সমেতই দেবী বিসর্জন যান সোজা নদীতে। শোনা যায়, এমন নির্দেশ নাকি দিয়েছিলেন ইসলামপুরের ডাকাতকালী স্বয়ং।

তবে ব্রিটিশ আমলের আগে এই মাটির প্রদীপ দিয়ে ঘর সাজিয়ে তোলা, ঘরকে আলোকিত করে তোলাই ছিল দীপাবলীর একমাত্র শর্ত। ক্রমে তার সঙ্গে এসে মিশল আতসবাজির দ্যুতি। প্রথমদিকে অবশ্য ভদ্রবাড়িতে তেমন বাজি পোড়ানোর প্রথা ছিল না। কলকাতার তেমন পয়সাওয়ালা বাবুরা বারবনিতাদের বাড়িতে গিয়ে শখ করে বাজি পোড়াতেন। পতিতাপল্লীর অন্য বাবুদের সঙ্গে রেষারেষি চলত তুবড়ি জ্বালিয়ে। যাঁর তুবড়িতে যত মশলা, যাঁর তুবড়ি যত আকাশছোঁয়া, তিনি ততই ধনীতম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাড়তে চলছে চকলেট বোমার রমরমা, বঙ্গবাজারে এই কালীপুজোয় পাওয়া যাবে যে যে বাজি

Firecrackers in Diwali 2023: এ রাজ্যেও বাজি পোড়ানো নিয়ে জারি হয়েছে একাধিক নিষেধাজ্ঞা। তবে বাজি পোড়ানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয় বাংলায়।

কোম্পানির আমল থেকেই বলতে গেলে দীপাবলীর উৎসবের সমারোহে যোগ হল আতসবাজি। তখন অবশ্য বাংলায় তেমন বাজি তৈরির চল ছিল না। বাজি আসত বাংলার বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকে। বাজি আমদানি সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল তখন লখনউ। পলাশি যুদ্ধ মানে ১৭৫৭ সালের পরবর্তী সময়ের কথা। মইনুদ্দি নামে এক বাজিওয়ালা কোম্পানিক কাছ থেকে বাজি তৈরির লাইসেন্স আদায় করেন। কালীচরণ সিংব নামেও এক প্রসিদ্ধ বাজিওয়ালার কথা শোনা যায় সে সময়। তখনকার বেশিরভাগ বাজিকারিগররাইাউ নাকি ছিলেন মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। শুধু কি দীপাবলী, সেসময় কলকাতার দেশিবিদেশি বিভিন্ন ভোজসভা থেকে অনুষ্ঠানে, বিনোদনের জন্য আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানোর রীতি ছিল।

পুরনো কলকাতার ইতিহাস খুঁটিয়ে ঘাটলে জানা যায়, মেনউইক নামে এক সাহেবের বাগানবাড়ি ছিল সে সময় গার্ডেনরিচে। তাঁর সেই বাগানবাড়িতে বসত বিরাট মেলা। আর সেই মেলার প্রধান আকর্ষনই ছিল হরেক রকম আতসবাজির কসরত ও প্রদর্শনী। পলাশির যুদ্ধের পর থেকে বাজি তো এল কলকাতায়। কিন্তু সে সময়ে তুবড়ির যত রমরমা ছিল, ততটা হাউই বাজির রমরমা ছিল না। কারণ সে সময়ে কলকাতার বেশিরভাগ বাড়িতেই ছিল খড়ের ছাউনি। হাউই বাজির দৌলতে যে কোনও সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, তাই হাউই ছিল নিষিদ্ধ। শিমুলিয়ায় চড়কের মাঠে বিক্রি হত তুবড়ির খোল। কালীপুজোয় কয়েকদিন আগে থেকেই ওই মাঠে শুরু হত বাজি পোড়ানো। তার সঙ্গে ওড়ানো হত ফানুস। হরেক রঙের হরেক আকারের ফানুস। সে কারিগরদের হাতের গুণ ছিল এমনই যে রাতের আকাশে বিভিন্ন জীবজন্তুর চেহারা নিত ওই ফানুস। কখনও বা আলোর লেখনীতে আকাশের গায়ে লেখা হত নানা কথা। পরে অবশ্য সেই তালিকায় ঢুকে পড়ত হাউইও। রীতিমতো প্রতিযোগিতাও শুরু হয়।

সে ছিল এক উৎসব। অভিজাত পরিবারগুলির তরফে রীতিমতো অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হত নানা ধরনের বাজি। মফস্সল থেকে ছুটে আসতেন মানুষ শুধু ওই বাজি পোড়ানো দেখতে। আসলে বাজি পোড়ানোর এই চল কিন্তু বাংলা রপ্ত করেছে উত্তর ভারত থেকে। উত্তর ভারতের দেওয়ালির উন্মাদনাকে মাত দেওয়া কঠিন এ রাজ্যের কালীপুজোর। ১৯৪০-র দশকে রমরমিয়ে উঠেছিল শিবকাশীর বাজির কারবার। সেই বাজির বাজার অবশ্য এখনও বিখ্যাত। বাংলায় বাজির এই যে ছোঁয়াচে চল, তার পিছনে কিন্তু বড় হাত ওই শিবকাশী বাজির বাজারের। দিনে দিনে বাড়তে থাকে বাজির অত্যাচার। কালীপটকা থেকে চকলেট বোম, শব্দবাজির অত্যাচারে ভিরমি খেতে শুরু করে কলকাতা। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দূষণের প্রকোপ। ক্রমে বাজি পোড়ানোর উপর চড়তে থাকে নানা ধরনের নিয়মকানুন, নিষেধাজ্ঞা। বাজির থেকে মন কিছুটা হলেও উঠে যায় আমবাঙালির। আজও কালীপুজো জুড়ে বাজির দাপট রয়েছে। তবে সেই উন্মাদনা কিছুটা যেন কমেছে। বাচ্চারা যেন আতসবাজিতে আর তেমন মজা পায় না। অন্তত সুপ্রিম কোর্ট তো তেমনই বলছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই! পরিবেশের খাতিরে হোক বা আকাশছোঁয়া দাম, সত্যিই কি আতসবাজির নস্টালজিয়া থেকে সরে আসছে বাংলা? উত্তরটা অবশ্য সন্ধ্যে থেকে বাইরে কান পাতলেই পেয়ে যাবেন।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।