সবুজ রামের পুজো হয় এই জেলাতে! বাংলার রামবিজয়ার যে ঐতিহ্য অনেকেরই অজানা

Howrah Ramrajatala Mandir: রামের গায়ের রং সবুজ, যা পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব ভারতের অনেক অংশেই দেখা যায়।

Rajarshi Dhara
৪ মিনিট
সবুজ রামের পুজো হয় এই জেলাতে! বাংলার রামবিজয়ার যে ঐতিহ্য অনেকেরই অজানা

বাংলা ক্যালেন্ডার থেকে শ্রাবণ বিদায় নিয়েছে সদ্য। আর দু'মাসের মাথায় দুর্গাপুজো। অত্যুৎসাহী অনেকেই কাউন্ট ডাউন শুরু করে দিয়েছেন। তবে দুর্গোৎসব ছাড়াও রয়েছে বিবিধ উৎসব যা বহরে এবং ঐতিহ্যে দুর্গাপুজোর মতোই বিশেষ। এই রাজ্যেই হাওড়ার মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার হতে চলা হাওড়ার স্থানীয় কার্নিভাল ‘রাম বিজয়া’-র। যদিও তথাকথিত উৎসবের খবরে এই অদ্ভুত শোভাযাত্রা নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয়। সারা দেশে রামের তৈরি করা নয়া প্রতিচ্ছবির ভিড়ে হাওড়ার রাম, বাঙালির নিজস্ব রাম। পেশিহীন, উগ্রতাহীন একেবারে নিখাদ বাঙালি পুরুষ রাম। রামনবমী থেকেই শুরু হয় হাওড়ার রামরাজাতলায় অবস্থিত রাম মন্দিরে রামের পুজো। বিশাল আকৃতির মৃন্ময় প্রতিমায় পূজিত হন রাজারাম। তবে এই মূর্তির বেশ কিছু বিশেষত্ব আছে, প্রথমত রামের গায়ের রং সবুজ, যা পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব ভারতের অনেক অংশেই দেখা যায়। মনে করা হয়, রাম কামদেবের মতোই আকর্ষণীর ছিলেন, কামদেবের গাত্রবর্ণ যেহেতু সবুজ, সেই জন্য রামও সবুজ। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৩০ টির কাছাকাছি ছোট বড় প্রতিমা থাকে মূল কাঠামোয়। মূল কাঠামোকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়। উপরের সিঁড়ির ধাপের মতো একটি অংশ, মাঝে তিনটি মূল প্যানেল এবং একদম নীচে আরও একটি অংশ। একদম উপরে থাকেন বসুদেব, তারপরে পঞ্চ সরস্বতী ও দু'টি সিংহবাহিনীর মূর্তি। মাঝের মূল প্যানেলে থাকেন রাম ও সীতা। রামের ডানদিকের অংশে থাকেন শিব এবং বাঁ দিকের অংশে থাকেন ব্রহ্মা। কাঠামোর নীচের অংশে থাকে বিশ্বামিত্র, বাল্মীকি, জাম্বুবান, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, লব, কুশ প্রমুখের মূর্তি। আলাদা করে একই মন্দিরের অন্য মণ্ডপে পূজিত হন হনুমান, বামন অবতার, সাবিত্রী ও সত্যবান এবং যমরাজ। শ্রাবণের শেষ রবিবার অন্যান্য ছোট মূর্তিগুলি সমেত মূল বড় কাঠামোটি বিসর্জনের পথে অগ্রসর হয়। তবে একমাত্র রাম মন্দিরের প্রতিমা নয়, আরও তিনটি বৃহৎ প্রতিমা ও তার আনুসঙ্গিক অন্যান্য প্রতিমাও নিরঞ্জন হয়, ইছাপুরের শমীচণ্ডী, পুরোনো নবনারীকুঞ্জের প্রতিমা এবং নতুন নবনারীকুঞ্জের প্রতিমা।

আসা যাক শমীচণ্ডীর কথায়। এ এক অদ্ভুত ইতিহাস। হাওড়ার ইছাপুর অঞ্চলে পানের চাষ হতো। সেই পানের বরজে একসময় শমী পোকার আক্রমণ হয়। শমী পোকার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য শুরু হয় শমীচণ্ডীর পুজো। শমীচণ্ডীর মূর্তির মূল কাঠামোটিও তিনটি মূল প্যানেলে বিভক্ত। মাঝে থাকেন চতুর্ভুজা চণ্ডী। চণ্ডীমূর্তির ডানদিকে শিব এবং বাঁদিকে পুরন্দর ইন্দ্র। তাছাড়া রামচন্দ্রর প্রতিমার মতো অনেক মাঝারি ও ছোট প্রতিমাও থাকে কাঠামোয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পাহাড়ের কোলে রয়েছে বিশাল মনসা মন্দির, ২০০ বছরের এই ঐতিহ্য অনেকেরই অজানা

Oldest Manasa Mandir: পাহাড়ের কোলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝেই, মণিমাজরার জমির মালিক রাজা গোপাল সিং এই মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ করেন।

পুরোনো এবং নতুন নবনারীকুঞ্জের প্রতিমা দু'টি সবথেকে আকর্ষণীয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে নবরসের ভাবনা। প্রাচীন ভারতীয় মন্দির ভাস্কর্যে এবং মিনিয়েচার পেইন্টিং ধারার বেশ কিছু ছবিতে এইরকম চিত্র দেখা যায় যে ন’টি নারীশরীর মিলে একটি হাতির গড়ন তৈরি করেছে এবং তার পিঠে বসে আছেন রাম বা কৃষ্ণ। হাওড়ার নবনারী মূর্তি অনেকটা এইরকম। তবে এখানে একা শ্রীকৃষ্ণ থাকেন না, তাঁর সঙ্গে থাকেন রাধারানী। এই পুরোনো আর নতুন দু'টি মূর্তিই আপাতভাবে অনেকটা কাছাকাছি, তবে এই দু'টির মধ্যে মূল পার্থক্য পুরোনো নবনারীরকুঞ্জের প্রতিমাগুলির ধাঁচ মানুষের কাছাকাছি এবং নতুন নবনারীরকুঞ্জের প্রতিমাগুলির ধাঁচ বাংলা ঘরানার।

শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার এই চারটি মূল প্রতিমা এবং তার সঙ্গে অজস্র ছোট বড় পার্শ্বপ্রতিমা নিজ নিজ মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে কিছুটা রাস্তা অতিক্রম করে আসার পর সাঁতরাগাছি মোড় থেকে হাওড়া চিন্তামণি ঘাটের দিকে রওনা হয়। এখানে বলে রাখার, এই সাঁতরাগাছি কিন্তু রেলস্টেশন বা ঝিলের জন্য বিখ্যাত সাঁতরাগাছি নয়। এটি ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’র লেখক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি সংলগ্ন সাঁতরাগাছি মোড়। মূল প্রতিমাগুলি যেহেতু আকারে অনেকটাই বড়, সেই জন্য মূল প্রতিমাগুলিকে ট্রলির উপরে বসিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়। একসময় হাওড়া ময়দান এলাকায় ট্রাম চলাচল করত। জনশ্রুতি আছে, রাম বিসর্জনের সময় ট্রামের তার ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য ইংরেজ সরকার এই শোভাযাত্রার রাস্তা পরিবর্তনের কথা বলে, তবে জনতা তা কোনওভাবেই তা মেনে না নেওয়ায় ইংরেজ সরকার সেই তার খুলে ফেলতে বাধ্য হয়।

এই শোভাযাত্রার আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইংলিশ ব্যান্ড। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে কলেজস্ট্রিটে যাওয়ার রাস্তায় যে ধুঁকতে থাকা ইংলিশ ব্যান্ডের দোকানগুলো দেখা যায়, তারা নিজেদের সব স্বপ্ন ও আশা নিয়ে বাজাতে আসেন এই রামবিজয়াতে। নিরঞ্জন শোভাযাত্রার মরশুমের প্রথম শোভাযাত্রা যেহেতু রামবিজয়া, সেইজন্য অনেক বাজনদাররা এই উপলক্ষ্যে বাজাতে কোনও পারিশ্রমিক নেন না। এই শোভাযাত্রায় আরও দু'টি জিনিস দেখা যায়। প্রথমটি হলো লুপ্তপ্রায় কিছু হস্তশিল্প, যেমন ট্যামটেমি, তালপাতার সেপাই, কাগজের চরকি, সবুজ ফোম দিয়ে তৈরি টিয়াপাখি প্রভৃতি এবং দ্বিতীয়টি সং ও বহুরূপী, যাদের এখন প্রায় দেখাই যায় না সেভাবে।

আজকের ‘মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে’ আর ‘আদিপুরুষ’-এর বাজারেও হাওড়ার রামরাজাতলা এক বিকল্প রামের খোঁজ দেয়। রামনবমীর মিছিলে প্রতিবার যে হিংসা-দ্বেষের চিত্র দেখা যাচ্ছে হাল আমলে, তেমন কোনও ছবিই কিন্তু এই শোভাযাত্রায় দেখা যায়নি কোনওদিন। অযোধ্যারাম চৌধুরীর হাত ধরে যে রামপুজোর সূচনা হয়, যে প্রতিমা দর্শন করতে আসতেন স্বয়ং মা সারদা সেই ঐতিহ্য বাংলার নিজস্ব রামের। শ্রাবণের বৃষ্টি মেখে রাম বিদায় নিলেন, না সরযু তে নয়, গঙ্গাতেই। রাম বিদায় নিলেই দুর্গা চলে আসেন। বাংলার স্থানীয় ঐতিহ্যে কোনও উগ্রতা নেই, বৈচিত্র্য আছে। এই বৈচিত্র্যেরই ঐক্য হয়ে ওঠার কথা ছিল।

লিখেছেন
Rajarshi Dhara
Rajarshi Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?