জঙ্গল পরিষ্কার করে শুরু দুর্গাপ্রতিমা বানানো, যেভাবে গড়ে উঠেছে আজকের কুমোরটুলি

কুমোরটুলির যোগাযোগ সরাসরি দুর্গাপুজোর সঙ্গে হলেও সেই জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাকে আজকের কুমোরটুলি করে তোলার পিছনে যাঁদের অবদান, তাঁদের কথা বেশিরভাগ মানুষ জানেন না।

Raktim Dey
৩ মিনিট
জঙ্গল পরিষ্কার করে শুরু দুর্গাপ্রতিমা বানানো, যেভাবে গড়ে উঠেছে আজকের কুমোরটুলি

কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি

বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি

কলকাতার কাছেও রয়েছে তার নিজের কুমোরপাড়া, যাকে মানুষ কুমারটুলি নামেই চেনে। উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি ছাড়া কলকাতার দুর্গাপুজো আজও অসম্ভব বলে মনে হয়। সরস্বতী পুজো থেকেই বিভিন্ন কাজ শুরু হলেও মহালয়া থেকে দুর্গাপুজো অবধি কুমারটুলির ব্যস্ততা এক অন্য মাত্রা পায়। কুমোরটুলির বিচিত্র ইতিহাস, সারাদিনের বিভিন্ন সময় তার বিভিন্ন রূপ, কুমোরটুলিতে বসবাসকারী মৃৎশিল্পীদের জীবনের গল্প মিলিয়ে সে যেন পরিচিত জগতের মধ্যে অন্য এক জগৎ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে গলিতে কয়লার উনুনের ধোঁয়া, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, কোথাও রেডিওতে বেজে চলা আকাশবাণী কলকাতার সম্প্রচার, মাটির গন্ধ, অল্প একটু জায়গায় একমনে কাজ করে চলা বয়স্ক মৃৎশিল্পী, ঘিঞ্জি গলির মধ্য দিয়ে কাঁধে করে মূর্তি নিয়ে যাওয়া মজুর এক ঝটকায় মানুষকে সেই জগতে টেনে নিতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২,৫০০ টাকার দুর্গাপুজোর জাঁকজমক চোখ ধাঁধিয়ে দিত, সেই কলকাতা ধরা আছে প্রবাদে

বাঙালির দুর্গাপুজোর মধ্যে বনেদি এবং সার্বজনীন পুজো নিজেদের বিশেষত্ব নিয়ে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। কলকাতা তার ব্যতিক্রম নয়, যেখানে মানুষ কয়েকটা দিন উৎসবের আনন্দে মেতে উঠবে বলে একটা গোটা বছর প্রতীক্ষা এবং প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে দেয়।

পলাশির যুদ্ধের সময় সুতানুটি এবং তার আশপাশের এলাকায় কলকাতার বেশিরভাগ জমিদার এবং বাবুরা বসবাস শুরু করেছিলেন। সেই সময় কলকাতায় বারোইয়ারি দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল না। শুধুমাত্র বাড়িতেই দুর্গাপুজোর আয়োজন হতো। দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে নদিয়া জেলা থেকে মৃৎশিল্পীরা আসতেন। তারা সেইসব বাড়িতে গিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতেন এবং পুজো শেষ হলে নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতেন। সেই মৃৎশিল্পীদের মধ্যে কয়েকজন কাজের সুবিধের জন্য এই এলাকার একটা ছোট অংশে জঙ্গল পরিষ্কার করে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। দুর্গাপুজোর সময় ছাড়া প্রতিমা তৈরির কাজ না থাকার কারণে তারা প্রথমে মাটির তৈরি বাজি বানাতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা পুজোর প্রচলন হয়। পুজোর প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে কুমোরটুলির জনপ্রিয়তাও বাড়তে শুরু করে। মৃৎশিল্পীদের বসবাস এবং কাজের জায়গা হওয়ার কারণে এই এলাকা সাধারণ মানুষের কাছে কুমোরটুলি নামে পরিচিত হয়। কুমোরটুলির প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ নদিয়া থেকে এলেও পরবর্তীকালে শেওড়াফুলি, ঢাকা থেকেও মৃৎশিল্পীরা আসতে শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে বহু মৃৎশিল্পীর বংশধররা আজও কুমোরটুলিতে মূর্তি তৈরি করেন।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের জীবনের বিভিন্ন গল্প জানা যায়। তাদের মধ্যে কারও জন্ম কুমোরটুলিতেই, অনেকে কুমোরটুলির নাম শুনে কাজের খোঁজে এসেছিলেন। বর্তমানে বহু বয়স্ক মৃৎশিল্পী বলেন যে, তাঁদের অনেকেই অল্প বয়সে লম্ফের আলোয় দীর্ঘদিন প্রতিমা তৈরির কাজ করতেন। বহু বছর কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের এলাকায় শুধুমাত্র একটাই জলের কল ছিল। সেই কারণে স্নান এবং পানীয় জলের একটা সমস্যা ছিল। ঘিঞ্জি গলি, কাজ করার জন্য ছোট জায়গা, জলের অভাব, বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবের মধ্যে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন এই মাটির জগৎ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু সুবিধের পাশাপাশি বহু অসুবিধেরও সম্মুখীন হয়েছেন তাঁরা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিল্পী নানা সম্মান পেয়েছেন। তাঁদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জল, বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হওয়ার পর কাজের কিছুটা সুবিধে হলেও বাঁশ, খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেও শিল্পীদের খরচ বাড়ছে। বাসস্থান এবং কাজের জায়গার পরিসর একই থাকার কারণে সব সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। বর্তমানে কুমোরটুলিতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিনহাজার কারিগর থাকেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেক শিল্পী দুর্গাপুজোর সময় অন্য রাজ্যে কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। ভিনরাজ্যের বিভিন্ন পুজোর আয়োজকরা কুমোরটুলিতে মূর্তি গড়ে নিজেদের রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার থেকে শিল্পীদের নিয়ে গিয়ে নিজেদের সময় এবং পছন্দমতো মূর্তি তৈরি করা শ্রেয় মনে করছেন। তাই কিছু শিল্পী বাড়তি আয়ের চেষ্টায় পুজোর সময় ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে থিমপুজোর চাহিদা বাড়ছে। তার ফলে সাবেকি ধরনের প্রতিমা বানানোর পরিবর্তে শিল্পীরা নিজেদের কাজের ধরনের পরিবর্তন করছেন। পুরুষ মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে মহিলা মৃৎশিল্পীরা পাল্লা দিয়ে প্রতিমা তৈরি করছেন। যদিও বহু মহিলা মৃৎশিল্পী তাঁদের কাজ শুরুর দিনে সমাজের কিছু মানুষের ব্যঙ্গ শুনতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। তাঁদের নাম তাঁদের কাজের সঙ্গেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।

কুমোরটুলির যোগাযোগ সরাসরি দুর্গাপুজোর সঙ্গে হলেও সেই জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাকে আজকের কুমোরটুলি করে তোলার পিছনে যাঁদের অবদান, তাঁদের কথা বেশিরভাগ মানুষ জানেন না। বহু সুবিধে, অসুবিধেকে সঙ্গী করেই তাঁদের সংসার। তাঁদের নিজেদের আনন্দ, দুঃখ, গল্প, ঝগড়া সবকিছুর খবর এই ঘিঞ্জি গলিরা রাখে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।