বাঙালির প্রিয় এই সন্দেশের সৃষ্টি জামাই ঠকাতে! বাড়িতেও বানাতে পারেন এই মিষ্টি

চন্দননগরের সূর্য মোদকের হাতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল জলভরা সন্দেশ। তাও কিনা জামাই ঠকাতে! কী আজব কাণ্ড ভাবুন!

tiasa gupta
৪ মিনিট
বাঙালির প্রিয় এই সন্দেশের সৃষ্টি জামাই ঠকাতে! বাড়িতেও বানাতে পারেন এই মিষ্টি

দুই বছর পর এবার জামাই-আদরের সুযোগ পেয়েছেন শাশুড়িরা। সেই সুযোগ যে তাঁরা কাজে লাগাবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাই এবার জামাইয়ের পাতে কী মিষ্টি উঠবে, তা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে গবেষণা। ফিউশনের পাশাপাশি সাবেক মিষ্টিতে জামাইয়ের মন ভোলানোর চেষ্টা করা হবে। তবে সব মিষ্টিকে কিস্তিমাত করতে তৈরি জামাই-ঠকানো জলভরা সন্দেশ। বাংলার মিষ্টির ঐতিহ্য নিয়ে লেখা হলে তাতে হুগলি যে এগিয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

ভাঁড়ে কেশর ভাপা, ক্ষীর-চকোলেটের মনোহরা, হিমসাগর আম, পেয়ারা সন্দেশ, ক্যাডবেরি সন্দেশ- এসবের পাশাপাশি পাল্লা দিচ্ছে সাবেক মিষ্টি। জনাইয়ের মনোহরা, কামারপুকুরের সাদা বোঁদে, রিষড়ার ফেলু মোদকের ছানার মুড়কি, লবঙ্গলতিকার স্বাদ যিনি একবার পেয়েছেন, তিনি যে সারাজীবন ভুলতে পারবেন না, তা বলাই বাহুল্য। সূর্য মোদকের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ হুগলির আর একটা বিশেষ সম্পদ। এই মিষ্টি পাওয়া যায় চন্দননগর শহরে।

বর্ধমানের নাম বললে চোখের সামনে যেমন মিহিদানা-সীতাভোগ ভেসে ওঠে, তেমন হুগলির চন্দননগরের নাম বললেই জিভে জল আসে জলভরা সন্দেশের কথা ভেবে। চন্দননগরে পৌঁছলে সব মিষ্টির দোকানে জলভরা পাবেন। কিন্তু চন্দননগরের সূর্য মোদকের হাতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল জলভরা সন্দেশ। তাও কিনা জামাই ঠকাতে! কী আজব কাণ্ড ভাবুন!

জামাই ঠকানোর ইতিহাস

ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদারবাড়ি থেকে হঠাৎ নির্দেশ আসে, এমন মিষ্টি বানাতে হবে, যাতে জামাই ঠকানো যায়। বাড়ির নতুন জামাইকে প্রথম ষষ্ঠীতে ঠকানোর জন্য ময়রার সঙ্গে রীতিমতো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন জমিদারের পরিবারের মেয়ে-বউরা। জমিদার বাড়ির মান ও মন রাখতে ষড়যন্ত্র করলেন যে ময়রা, তার নাম সূর্য মোদক। জমিদারবাড়ির মেয়েরা বললেন, এমন মিষ্টি বানান, যাতে মিষ্টি মুখে দিয়ে একদম হাঁদাগঙ্গারাম হয়ে যান জামাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সন্তানলাভের সঙ্গে জড়িত জামাইষষ্ঠীর আচার, পার্বণের আড়ালে রয়েছে যে কাহিনি

বধূর বাবা-মা একদিন ষষ্ঠী পুজো আয়োজন করেন। সেদিন আমন্ত্রণ করেন জামাই ও মেয়েকে। শোনা যায়, এই পুজোয় ষষ্ঠীদেবী খুশি হন।

সময়টা ১৮১৮ সাল। জামাইষষ্ঠীর দিনে বাড়ির নতুন জামাইরা বাবু হয়ে পাত পেড়ে বসতেই থালায় চলে এল প্রকাণ্ড একটা ক্ষীরের তালশাঁস সন্দেশ। জৈষ্ঠ মাসের দুপুর, আম, কাঁঠালের গন্ধে ম ম করছে জমিদারবাড়ির অন্দরের হেঁশেল। থালা থালা ফল-মিষ্টি কেমন সাবড়ে দিচ্ছেন জামাইরা। তারই মধ্যে কড়াপাকের তালশাঁস, আহা! ভেবে কামড় বসাতেই ঘটল বিপত্তি। প্ল্যান সাকসেস, তালশাঁসের ভেতর থেকে গরদের ধুতি, পাঞ্জাবি ভাসিয়ে দিল লুকিয়ে থাকা গোলাপ জল। সে একেবারে মাখামাখি কাণ্ড! সেই থেকেই ভরা জৈষ্ঠে জামাই ঠকাতে তালশাঁসের জন্ম।

বানানোর প্রক্রিয়া

এই সন্দেশ বানানোর মূল উপাদান ছানা, চিনি, গোলাপ জল ও শীতকালে নলেন গুড়। সূর্য মোদকের দোকানে গোলাপ জল আসে নিয়ম মেনে কনৌজ থেকে। কিছুটা সন্দেশে প্রথমে ছাঁচের মধ্য দিয়ে আঙুলের চাপে একটা গর্ত করে নেওয়া হয়। সেই গর্তে গোলাপ জল ঢেলে আবার সন্দেশ দিয়ে বাকিটা ঢেকে ছাঁচের মুখ বন্ধ করে দিতে হয়। এভাবেই জলভরা সন্দেশ তৈরি করা হয়।

রবীন্দ্রনাথও সন্দেশের ভক্ত ছিলেন

জলভরা সন্দেশে মন মজেনি, এমন মানুষ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরাও এই মিষ্টিতে মজেছেন যুগ যুগ ধরে। অনেক গল্পই শোনা যায় এই মিষ্টি ঘিরে। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ নাকি সূর্য মোদকের মতিচুর ও জলভরা সন্দেশ খেয়ে তারিফ করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় নাকি চন্দননগরের ওপর দিয়ে কোথাও গেলেই এই দোকানে দাঁড়িয়ে মিষ্টি কিনে নিয়ে যেতেন। এরকমই নাকি একবার বোলপুরে শুটিংয়ে যাওয়ার পথে সূর্য মোদকের দোকানে সন্দেশ খেয়ে তিনি অগ্রিম ১০ টাকা জমা রেখে যান ফেরার পথে সন্দেশ নিয়ে যাবেন বলে। কিন্তু ফেরার পথে অন্য রাস্তা দিয়ে যাওয়ায় আর মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হয়নি। সেই দশ টাকা নাকি আজও জমা রাখা আছে সত্যজিৎ রায়ের নামে।

কে এই সূর্য মোদক

চন্দননগর নামটা শুনলে ২টো জ-এর কথা মনে আসে, জগদ্ধাত্রী আর জলভরা সন্দেশ। আর জলভরা সন্দেশ বলতে একটাই নাম, সূর্য মোদক, যে মিষ্টান্ন-কারিগরের হাতে এই রহস্যময় সন্দেশের সৃষ্টি ও জনপ্রিয়তার শুরু। তবে জলভরার সঙ্গে আজকের চন্দননগরের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেও সূর্যকুমার মোদক ও তাঁর পরিবার কিন্তু এখানকার আদি বাসিন্দা নন। এঁরা ছিলেন মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুখচর অঞ্চলের বাসিন্দা। পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের মুখ থেকে শোনা যায় সূর্যকুমার মোদকের পিতা মাধবচন্দ্র মোদক সম্ভবত উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নিজের পরিবার নিয়ে সুখচর থেকে গঙ্গা পেরিয়ে ফরাসডাঙার পাশে বারাসাত (২৪ পরগণার বারাসাত নয়, ভদ্রেশ্বরের বারাসাত) অঞ্চলে চলে আসেন। সূর্যকুমার তখন সবেমাত্র বালক। তখনও তাঁদের মিষ্টির দোকান হয়নি। আর আজকের মতো এতরকম মিষ্টিরও সেকালে এত চল ছিল না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির পুজো-পার্বণ বা উৎসব-অনুষ্ঠানে মণ্ডা, মিঠাই, বরফি, মোরব্বা ইত্যাদি সাধারণ কিছু মিষ্টান্নই প্রচলিত ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মিষ্টির দোকানে ছাঁচের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন ডিজাইনের সন্দেশের প্রচলন হয়। জলভরা তালশাঁসের সন্দেশ আসে তার কিছু পর। সূর্যকুমার মোদক কেবল একজন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তাঁর ভেতরে শিল্পবোধের সহজাত প্রতিভা ছিল। তাঁর হাতের আঁকাও নাকি ছিল চমৎকার। মাটি ও কাঠের ছাঁচও তিনি নিজে হাতেই বানাতেন বলে শোনা যায়। ক্ষীরপুলি, মতিচুর ইত্যাদি সন্দেশ তিনিই প্রথম তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠতম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আজকের জলভরা সন্দেশ।

আড়ম্বরের ভেতর দিয়ে রঙ্গ-তামাশা প্রবেশ করবে না, তা হয় নাকি? কাজেই আপনার পাতে যদি জামাইষষ্ঠীতে এই মিষ্টি পড়ে, ঘাবড়াবেন না। আগে থেকে জলভরা তালশাঁসের গুপ্তকথা জানলে আপনিও শ্বশুরবাড়িকে বোল্ড আউট করতে পারেন। এক্ষেত্রে কিস্তিমাত!

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।