কেমন আছেন 'পথের পাঁচালী'-র অপু ও দুর্গার অভিনেতারা?

অপু এবং দুর্গা, দুই চরিত্রাভিনেতা আজও সব আলোর ঝলকানি থেকে দূরেই রয়েছেন।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কেমন আছেন 'পথের পাঁচালী'-র অপু ও দুর্গার অভিনেতারা?

২৬ অগাস্ট, ১৯৫৫। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো, ঐতিহাসিক দিন। এই দিন মুক্তি পেয়েছিল 'পথের পাঁচালী'। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এই সিনেমা সমগ্র বিশ্বের সামনে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার এক নতুন রূপ তুলে ধরেছিল। সময়ের সঙ্গে বহু সম্মান এবং সুখ্যাতি এই সিনেমা অর্জন করেছে। ৬৭ বছর পার করেও বর্তমানে এই সিনেমার জনপ্রিয়তা প্রায় একইরকম রয়েছে। 'পথের পাঁচালী'-র নাম শুনলেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তীর নাম আমাদের মনে আসে। এই মহীরুহদের ছায়ায় তিন বছর ধরে তৈরি হওয়া 'পথের পাঁচালী'-র সঙ্গে যুক্ত আরও অনেকেই ঢাকা পড়ে যান। এই বিখ্যাত সিনেমার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ এবং স্থানের নাম সাধারণ মানুষ ভুলতে বসেছে। তাঁদের খবর কেউ খুব একটা রাখে না। যদিও তাঁদের অভিনীত চরিত্র অথবা কিছু সিনেমার কিছু দৃশ্য আজও মানুষের মনে জলের মতো স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।

'পথের পাঁচালী'-র নাম উঠলেই যে দু'টি চরিত্রের নাম প্রায় সকলেই বলতে পারে, তারা হলো দুর্গা এবং অপু। সত্যজিৎ রায় ১৯৫০ সাল থেকে ছোট্ট অপুর চরিত্রের জন্য অভিনেতা খুঁজছিলেন। শোনা যায় যে, সেই সময় একদিন সত্যজিৎ রায়ের লেক অ্যাভিনিউয়ের বাড়ির সামনে কয়েকটা ছোট ছেলে খেলা করছিল। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে অপুর চরিত্রের জন্য উপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়ের। তিনি সত্যজিৎ রায়কে বিষয়টি জানানোর পরেই লেক অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে ছেলেটির ডাক পড়েছিল। এই ছেলেটির নাম সুবীর বন্দ্যোপাধ‍্যায়। দাদার সঙ্গে লেক অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে আসা ছেলেটিকে দেখে সত্যজিৎ রায় প্রশ্ন করেছিলেন, "বায়োস্কোপ করবে?" সুবীরবাবু শুধু ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলেছিলেন। তাঁকে নিয়ে বাড়ির ছাদে গিয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর কয়েকটা ছবি তুলেছিলেন। তারপরই তিনি ঠিক করেছিলেন যে, সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ই অপুর ভূমিকায় অভিনয় করবেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র কয়েক ঘণ্টায় 'পথের পাঁচালি'-র সুর সৃষ্টি করেছিলেন রবিশঙ্কর!

Pather Panchali: দুর্গার সঙ্গে যে আহির ভৈরবকে অবলীলায় মিলিয়ে দেওয়া যায়, তা তো ‘পথের পাঁচালি’ই শিখিয়েছে আমাদের।

যদিও ছেলের অভিনয়ের কথা শুনে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা শুরুতে ঘোরতর আপত্তি করেছিলেন। তিনি ছেলের মাথা ন‍্যাড়া করিয়ে নিজের বাপের বাড়ি গিরিডিতে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বহুবার বোঝানোর ফলে তিনি রাজি হয়েছিলেন। এই সিনেমার শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে শিশুশিল্পীদের শুটিংয়ের শুরুতে একটা আড়ষ্ট ভাব থাকলেও পরে তা কেটে গিয়েছিল। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া 'পথের পাঁচালী'-র অপুকে সবাই মনে রেখেছে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ সুবীর ব্যানার্জিকে ভুলে গিয়েছেন। 'পথের পাঁচালী'-র পরে আর কোনও সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন নি। ফ‍্যাক্টরির মিলহ‍্যান্ড থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী হয়ে চাকরিজীবন কাটিয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন। গত দশকে তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে 'অপুর পাঁচালী' নামে একটি সিনেমা তৈরি হয়েছিল। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত এবং পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনীত 'অপুর পাঁচালী' সিনেমায় পর্দা এবং বাস্তবের অপুর জীবনের বহু মিল দেখানো হয়েছিল।

'অপুর পাঁচালী'-র একটি দৃশ্যে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও পার্নো মিত্র

'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে ও সিনেমায় অপুর দিদি দুর্গাকে পাঠক ও দর্শকমাত্রেই রেখে দেন মনের মণিকোঠায়। বিভিন্ন বয়সি দুর্গার চরিত্রে বিভিন্ন অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন। এই সিনেমায় অভিনয়ের পরেও মানুষের কাছে অপরিচিত হয়ে রয়ে গিয়েছেন উমা দাশগুপ্ত। ছোট দুর্গার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রুণকি বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুই অভিনেত্রী শুধুমাত্র 'পথের পাঁচালী' সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। যে দুই অভিনেত্রী দুর্গার মতো জনপ্রিয় একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তাঁরা কেউই পরবর্তীকালে কোনও সিনেমায় অভিনয় করেননি। তা শুনলে মানুষের অবিশ্বাস হয়। যদিও ফোন অথবা কম্পিউটারে কয়েকটা খুটখাট করলেই গুগল আমাদের সামনে তথ্যের ডালা তুলে ধরে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সে অপারগ। রুণকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাপারে খুব মামুলি কিছু তথ্য ছাড়া তার সঞ্চয়ে রয়েছে। উমা দাশগুপ্ত সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে তার ভাঁড়ার প্রায় শূন্য। অবশ্য এই ক্ষেত্রে নির্জীব মাধ্যমকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাঙালি কতটা খোঁজ রাখে তার অপু-দুর্গার? মানুষ 'পথের পাঁচালী'-র দুর্গাদের মনে রেখেছে, কিন্তু সেই চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীদের ব্যাপারে খুব একটা জানার আগ্রহ কেউ বোধ করেনি। তাঁদের অভিনীত চরিত্রই তাঁদের পরিচিতি তৈরি করেছে।

অসংখ্য পুরস্কার, সম্মান, স্বীকৃতি- সবকিছুর পরেও অপু এবং দুর্গা, দু'টি চরিত্রের অভিনেতারা আজও সব আলোর ঝলকানি থেকে দূরেই রয়েছেন। তাঁরা মানুষের কাছে শুধু অপু আর দুর্গা হয়ে বেঁচে আছেন।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।