বাংলা ভাগের ক্ষত কীভাবে বিষিয়ে দিল মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলকে?

East Bengal Mohun Bagan Rivalry : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ময়দানের শ্বেতাঙ্গ দলগুলি দুর্বল হতে লাগল মহামেডান স্পোর্টিংয়ের দাপটে।

বাঙালির প্রতি ইংরেজদের প্রোপাগান্ডা অতি তীব্র ঊনবিংশ শতক থেকে। 'বাঙালি জাতি বহুৎ দুর্বল হ্যায়' জাতীয় বক্তব্য প্রায়শই উঠে আসত তাদের কর্মকাণ্ডে। একটি জাতিকে শাসন করার মূলমন্ত্র তাদের আত্মবিশ্বাসকে পঙ্গু করা, ব্রিটিশ শাসকরা তা বেশ ভালোই বুঝেছিল। ধীরে ধীরে এই ধারণার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠতে শুরু করে বাংলায়। ১৮৭০-৮০-র দশক নাগাদ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি এই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করে। শারীরিক সক্ষমতা দেখানোর তাগিদ তখন ইতিউতি দেখা যেতে শুরু করে। সার্কাস, কুস্তি, লাঠি খেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সরকারের বক্তব্যের বিপক্ষে পাল্টা ধারণা গড়ে তোলা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এসময়েই বিভিন্ন কুস্তির আখড়া শুরু হতে থাকে কলকাতায়। প্রথম এশিয়ান কুস্তি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গোবর গুহের পিতামহদের আখড়া, যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ ক্ষেতুবাবুর কাছে তালিম নিতেন, সেই আখড়াও মসজিদ বাড়ি স্ট্রিটে এসময়েই গড়ে ওঠে। যাই হোক, তখনও কিন্তু বাংলায় ফুটবল জনপ্রিয় হয়নি। বাঙালির ফুটবলে হাতেখড়ি নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর হাত ধরে। ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবে ব্রিটিশ সৈন্যদের ফুটবল খেলতে দেখে নিজের হেয়ার স্কুলের বন্ধুদের প্রথম ফুটবল খেলা শেখাতে শুরু করেন বালক নগেন, ১৮৭৭ নাগাদ। তারপর ১৮৮০, ১৮৯০-এর দশকে তাঁর অনুপ্রেরণায় অনেকগুলি স্পোর্টিং ক্লাব গড়ে উঠতে থাকে কলকাতা অঞ্চলে। ভারতবর্ষের প্রথম ফুটবল কোচ দুখিরাম মজুমদারও তাঁর তৈরি করা ওয়েলিংটন ক্লাবে খেলতেন। তাঁর তৈরি শোভাবাজার ক্লাব প্রথম দেশিয় ক্লাব হিসেবে সাহেবদের খেলায় সাহেবদেরই হারিয়েছিল এবং সাহেবরা তা ভালো ভাবে নেননি - বলাই বাহুল্য। ইস্ট সারেকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছিল সেবার শোভাবাজার, সাল ১৮৯২। ১৮৯২ সালেই ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন IFA গড়ে ওঠার পেছনেও নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর ভূমিকা আছে। IFA-তে তিনি ছাড়া আর কোনও ভারতীয় প্রথম কমিটিতে জায়গা পাননি।

এদিকে ১৮৮০-র দশকে শ্যামবাজার ফড়িয়াপুকুর অঞ্চলে একটা ফুটবল ক্লাব কোথায় খোলা হতে পারে সেই নিয়ে সাজো সাজো রব পড়ছে। পাড়ার ছেলে ছোকরারা অনেক খুঁজে একটা মার্বেল পাথরের তৈরি ভিলা স্থির করল যেখানে ক্লাব গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিপত্তিশালী পাট ব্যবসায়ী কীর্তিচন্দ্র মিত্রের সেই বাগানবাড়ির নাম, 'মোহনবাগান ভিলা'। উত্তর কলকাতার তিন বনেদি পরিবার- মিত্র পরিবার, বসু পরিবার এবং সেন পরিবারের মিলিত উদ্যোগে ১৮৮৯ সালের ১৫ অগাস্ট তৈরি হলো মোহনবাগান ক্লাব। শোভাবাজারের রাজাদের কাছ থেকে কেনা সেই বাগানে (যে বাগানে ওই বাগানবাড়িটি অবস্থিত) প্রথম প্র্যাকটিস শুরু করল মোহনবাগান দলের খেলোয়াড়রা। সূচনার প্রথম দশকে ক্লাবের পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো হলো না। ব্রিটিশ ক্লাব, কুমোরটুলি, পরবর্তী শতকের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ এরিয়ান, নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর শোভাবাজার ক্লাব, টাউন ক্লাব প্রভৃতি দলের সঙ্গে খুব একটা পেরে উঠত না নবজাতক মোহনবাগান। ১৯০০ সালের পর পর সুবেদার মেজর শৈলেন বসুর আমলে ক্লাবের খেলার ধরন ইউরোপিয় ঘরানাকে আশ্রয় করল। অন্য ক্লাব থেকে খেলোয়াড় নেওয়াও শুরু হলো। ধীরে ধীরে খেলার মান ভালো হতে শুরু করল মোহনবাগানের। কলকাতার আকাশে সবুজ-মেরুন রং প্রায় বিকেলেই দেখা যেতে লাগল তখন। আর এই যাত্রাপথেই এল ১৯০৪ সালে প্রথম সাফল্য। কুচবিহার কাপ জিতল মোহনবাগান, বাঙালির গর্ব মোহনবাগান। এরপর লক্ষ্মীবিলাস কাপ জয়। সাহেবদের ডালহৌসির দ্বিতীয় সারির টিমকে হারিয়ে মোহনবাগান জিতল লাস্টন কাপ। তারপর, অবশেষে ঐতিহাসিক ১৯১১- IFA শিল্ড জয়। লিগ থেকে ফাইনাল অবধি প্রতিটি ম্যাচেই শ্বেতাঙ্গ ক্লাবকে হারিয়ে মোহনবাগান ভারতের ইতিহাসে মাইলফলক স্থাপন করল। এই জয় উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা বেরিয়েছিল তদানীন্তন ধর্মতলা থেকে ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি পর্যন্ত। মূলত হিন্দুদের এই শোভাযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন মুসলমান ক্লাবগুলির সমর্থকরাও। গল্প শোনা যায়, এই শোভাযাত্রা চলাকালীন এক ব্রাহ্মণ ১৯১১-র মোহনবাগান দলের একমাত্র বুট পরে খেলা খেলোয়াড় রেভারেন্ড সুধীর চট্টোপাধ্যায়কে ফোর্ট উইলিয়ামের ইউনিয়ন জ্যাক ব্রিটিশ পতাকার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন- এই পতাকার পতন হবে কবে? এই গল্পের নিরিখেই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এই বছরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, ১৯১১। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল এই সালেই।

আরও পড়ুন- এক ম্যাচে ৪৪ টা পেনাল্টি! ফুটবলের ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে যে ম্যাচ…

বাঙালির প্রিয় ফুটবল তখন অতি সরল খেলা। এখনকার মতো জটিল নিয়মকানুন ছিল না তখন। ক্রিকেট বা হকির মতো পোশাকের উপর এত নিয়ন্ত্রণও ছিল না ফুটবলে। অত খরচসাপেক্ষও ছিল না। বাঙালি ধুতি পরে ক্রিকেট খেলার একটা রেওয়াজ চালু করতে চেয়েছিল বটে। ফুটবল গবেষক দেবাশীষ মজুমদারের থেকে জেনেছি, বিধুভূষণ মুখোপাধ্যায় ধুতি পরে ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের বিরুদ্ধে দু' ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটের 'ভদ্রলোকি' এবং 'অভিজাত' ইমেজ বাঙালিকে নিজস্ব রীতি গড়ে তুলতে দেয়নি। অনেক প্রতিরোধ আসে ইংরেজেদের তরফে। কিন্তু ফুটবলে তা হয়নি। বাঙালি নিয়ে এল খালি পায়ে ফুটবল। 'ওদের মতো বুট পরে খেলব না - আমাদের মতো খেলব'। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সমাজ এবং রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেটমেন্ট, বাঙালি শারীরিকভাবে দুর্বল নয়।

ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে IFA শিল্ড, কলকাতা লিগ ইত্যাদি। সেখানে সাধারণত সাহেবদের নিজেদের মধ্যে খেলা চলত। সাহেব মিলিটারি টিম এবং সাহেব সিভিলিয়ান টিমদের একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ ছিল সেই টুর্নামেন্টগুলি। মিলিটারি দলগুলি মূলত একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলির চাকরি করত বলে ইতিহাসে দেখা যায় স্থানীয় লিগগুলিতে সিভিলিয়ান দলগুলির রেকর্ড অনেক ভালো। যেমন ঔপনিবেশিক পর্বে কলকাতা ফুটবলের সফলতম দল ছিল ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব এবং ডালহৌসি ক্লাব, দু'টিই সিভিলিয়ান দল। তবে মিলিটারি দলগুলির সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বেশ মারাত্মকরকম। এই কারণেই সিভিলিয়ান দল ডালহৌসি এবং মিলিটারি ক্লাব রেঞ্জার্সের রেষারেষি কলকাতা ফুটবলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আসলে শুধু ফুটবল নয়, ভারতবর্ষে প্রথম নানা খেলা এই মিলিটারি দলগুলিই নানা শহরে ছড়িয়ে দেয় এবং সেই খেলা নানা ক্লাব গঠন করে নিয়মিত খেলতে শুরু করে স্থানীয় সিভিলিয়ান দলগুলি। কলকাতা ফুটবলও এই পরম্পরার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার নিজস্ব দলগুলি ইতিমধ্যে যখন নিজেদের খেলার মান ভালো করতে আরম্ভ করল, তারা কলকাতা লিগের প্রথম ডিভিশনে সাহেব দলগুলির সঙ্গে খেলার সুযোগ পেল। প্রথম এই সুযোগ অর্জন করলো দু'টি দল- শোভাবাজার ক্লাব এবং মোহনবাগান।

এবার একটু ফিরে যাওয়া যাক ঊনবিংশ শতকে। তখনও দ্বিজাতি তত্ত্ব মাথা চাড়া দেয়নি বটে কিন্তু ভারতবর্ষে আলিগড় আন্দোলন চলছে। সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজের ভেতর স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের নেতৃত্বে পশ্চিমি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১৮৭৫-এ তৈরি হচ্ছে অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ। এইরকম সময় থেকে ওই শতাব্দীর বাকি সময়টা জুড়ে বাংলার মুসলমান ইন্টেলেকচুয়ালরাও নতুনভাবে গড়ে উঠতে থাকা ক্রীড়া সংস্কৃতিতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব চাইলেন। ১৮৮৬-তে গড়ে উঠলো মুসলমানদের ক্লাব জুবিলি ক্লাব, পরবর্তীতে যার নাম হয় মহামেডান স্পোর্টিং। ওইসময় অন্যান্য দেশিয় ক্লাবে সম্ভবত মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ছিল কিন্তু তা হাতে গোনা। যেমন এরিয়ান ক্লাবের মহম্মদ সেলিম ১৯৩০-এর দশকে স্কটল্যান্ডের সেল্টিক ক্লাবের হয়ে খেলতে যান। কিন্তু, মূলত মোহনবাগান বা এরিয়ান বা কুমোরটুলির মতো দলগুলি ছিল শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের দল। সেই সমাজে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ছিল হাতে গোনা। সেইজন্যই এই মহামেডান ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং তার বেড়ে ওঠা কলকাতা ময়দানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই মহামেডান ক্লাব ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮- টানা পাঁচবার কলকাতা লিগ জয় করে ময়দানের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য একেবারে শেষ করে দিয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল ১৯৩৬-এর IFA শিল্ড। ১৯৪১, ১৯৪২-এ আবার IFA শিল্ড। সেই উত্তাল রাজনীতির দশকে কলকাতার পাশাপাশি ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তে- করাচি, কোটা, হায়দরাবাদে, বেঙ্গালুরুতে ফুটবল জনপ্রিয় হচ্ছিল। ডুরান্ড জয়ী প্রথম ভারতীয় দল 'ব্যাঙ্গালোর মুসলিম'। নাম 'মুসলিম' হলেও এই দলটি ছিল অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু মহামেডান তার মুসলিম পরিচয় তখনও ধরে রেখেছিল ভালো মতোই। স্বাধীনতার পরে ৬০-এর দশক নাগাদ এসে অবশেষে ফুটবল হয়েছিল তাদের মূল অগ্রাধিকার, ধর্ম নয়। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয় বাঁধন আলগা হলো। যদিও এই মহামেডান সমর্থকরা কিন্তু ১৯১১ সালে শিল্ড জয়ী মোহনবাগানিদের শোভাযাত্রায় সামিল হয়েছিল, যেমনটা আগে বলেছিলাম।

২৮ জুলাই ১৯২০। জোড়াবাগান বনাম মোহনবাগান খেলা। কুচবিহার কাপে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচ। কোনও এক অজানা কারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার শৈলেশ বসু প্রথম দলে সুযোগ পেলেন না। দলে জায়গা পাননি আরেক খেলোয়াড়- নশা সেনও। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হলেন জোড়াবাগান ক্লাবের সহ সভাপতি সুরেশচন্দ্র চৌধুরী। তিনি চেষ্টা করলেন শৈলেশ এবং নশাকে দলে ঢোকানোর। তাঁর অনুরোধে খেলানো হয় এই দুই খেলোয়াড়কে। জোড়াবাগান হেরে যায় ২-০ গোলে। চারিদিকে সবাই বলতে থাকে এই দুই খেলোয়াড়ের জন্য জোড়াবাগান হেরেছে, ওরাই দায়ী। আর দায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরেশচন্দ্র। এই অপমান সহ্য হলো না সুরেশচন্দ্রের। অগত্যা জোড়াবাগান ছাড়লেন সুরেশ। তাঁর সঙ্গী হলেন মন্মথ রায় চৌধুরী, রমেশ চন্দ্র সেন এবং অরবিন্দ ঘোষ। ১ আগস্ট ১৯২০। প্রতিষ্ঠিত হলো পূর্ববঙ্গীয় প্রতিষ্ঠাতাদের ক্লাব- ইস্টবেঙ্গল। অর্থাৎ লক্ষণীয়, এই ক্লাবের জন্মের মূলে এবং বেড়ে ওঠার যাত্রাপথেও একটা সাংস্কৃতিক রেষারেষির জায়গা আছে।

আরও পড়ুন- ফুটবলার না হোর্ডিং! জুতোর ফিতে বাঁধার নামে আসলে ব্র্যান্ড দেখাতেই চান খেলোয়াড়রা?

কলকাতা যেহেতু প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল তাই অনেক পূর্ববঙ্গীয় এখানে আসতেন কর্মসূত্রে। তাদের বিরুদ্ধে এই দেশিয়দের একটা রেষারেষির আবহ, তাদের ভেতরে জমতে থাকা ক্ষোভ আমরা এই গল্পের মধ্য দিয়ে কিছুটা বুঝতে পারি। যদিও দেশভাগ তখনও হয়নি, কিন্তু বাংলা ভাগের মাধ্যমে এই রেষারেষির বীজ কিন্তু ব্রিটিশরা ইতিমধ্যেই রোপণ করেছিল বলে আমার ধারণা। ইস্টবেঙ্গলে শুরুর দিকে শুধু পূর্ব বঙ্গীয় খেলোয়াড়রাই খেলতেন, এ দেশিয়রা নয়। যাইহোক, প্রতিষ্ঠার পর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম সভাপতি হলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর দাদা সারদারঞ্জন রায় যিনি বাংলার ক্রিকেটের ইতিহাসেও খুব গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রতিষ্ঠার প্রথম মাসেই সেভেন সাইড টুর্নামেন্ট জিতল ইস্টবেঙ্গল। তারপর তারা জিতল খগেন্দ্র শিল্ড, ১৯২১-এ। মোহনবাগানের সঙ্গে তাদের প্রথম খেলা ১৯২১ সালের ৮ অগাস্ট, কুচবিহার কাপে। গোলশূন্য ড্র হলো সেই ম্যাচ। ইস্টবেঙ্গল IFA-র সেকেন্ড ডিভিশনে ১৯২৪ সালে শেষ করল রানার্স আপ হিসেবে। ক্যামেরুন বি টিমের পেছনে শেষ করেছিল তারা। যেহেতু সেই সময় ফার্স্ট ডিভিশনে ক্যামেরুন এ টিম খেলত তাই ক্যামেরুন বি টিম ফার্স্ট ডিভিশন খেলার অধিকার পায়নি। তাই রানার্স আপ ইস্টবেঙ্গল ফার্স্ট ডিভিশনে প্রোমোশনের দাবিদার ছিল। তখনও পর্যন্ত ফার্স্ট ডিভিশনে শুধুই দু'টি ভারতীয় দল খেলার সুযোগ পেতো। এই নিয়মের অজুহাতে এর আগেও কুমোরটুলি এবং টাউন ক্লাব প্রোমোশন পায়নি। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। দুই ভারতীয় ফার্স্ট ডিভিশন ক্লাব মোহনবাগান এবং এরিয়ানের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ইস্টবেঙ্গল প্রোমোশন পেল। প্রথম নিয়ম ভাঙল শ্বেতাঙ্গ শিবির। এরপর ১৯২৫ সালের ২৮ মে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলল ইস্টবেঙ্গল। নেপাল চক্রবর্তীর একমাত্র গোলে জয়লাভও করল তারা। কলকাতার আকাশ দেখতে শুরু করল লাল-হলুদ রঙ, আমাদের প্রিয় লাল হলুদ রঙ।

তবু লাল হলুদ বড় মঞ্চে সাফল্য পাচ্ছিল না। শুধুই পূর্ববঙ্গীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে সাফল্য মিলছিল না বলে ধীরে ধীরে তারা পশ্চিমবঙ্গীয় এবং ভিন রাজ্যের খেলোয়াড়দেরও নিতে আরম্ভ করল। কলকাতা ময়দানের শ্বেতাঙ্গ দলের সঙ্গে বাংলার দলের লড়াই ১৯৩০-এর দশকের থেকে স্তিমিত হতে শুরু করল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ময়দানের শ্বেতাঙ্গ দলগুলি দুর্বল হতে লাগল মহামেডান স্পোর্টিংয়ের দাপটে। ফুটবল মানচিত্রে তখন অন্যান্য দেশিয় দলগুলিও জায়গা করে নিতে থাকল, প্রতিপত্তি বাড়তে শুরু করল তাদের। এইরকম সময়ে, প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ বছর পর ১৯৪২-এ প্রথম ইস্টবেঙ্গল IFA ফার্স্ট ডিভিশন জিতল। ১৯৪৩-এ প্রথম IFA শিল্ড। ১৯৪৫-এ কলকাতা লিগ এবং আবার IFA শিল্ড। এতদিনে লাল-হলুদ ময়দানে ফুল ফোটাতে শুরু করল। যদিও দেশ এবং রাজনীতি তখন ফুল ফোটানোর ময়দান ছিল না। স্বাধীনতার আগে কুখ্যাত তেতাল্লিশের মন্বন্তর, স্বাধীনতার সময়ে রক্তক্ষয়ী দেশভাগ। ভারত স্বাধীন হলো, বাংলার ফুটবল নতুন ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখল।

দেশ ভাগের ফলে প্রচুর পূর্ববঙ্গীয় মানুষ ভারতবর্ষে আসতে বাধ্য হলেন। তাঁদের জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাঁদের পূর্ব পরিচয় আঁকড়ে ধরার অবলম্বন হয়ে উঠল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। তাঁরা নিজেদের এই ক্লাবের সঙ্গে একাত্ম করে ফেললেন আর্থ সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে। ইস্টবেঙ্গল দলও ১৯৪৯ সালে এই বিপুল সমর্থন নিয়ে ট্রেবল জিতল। কলকাতা লিগ, IFA শিল্ড এবং রোভার্স কাপ। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩-এর মধ্যে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করল। ময়দানে এদের প্রধান শত্রু হয়ে উঠল মহামেডান স্পোর্টিং। মহামেডান স্পোর্টিং দলও কিন্তু দেশভাগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাদের অনেক খেলোয়াড় পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। যদিও স্বাধীনতার পর প্রথম কলকাতা লিগ ১৯৪৮ সালে মহামেডানই জিতেছিল কিন্তু তাদের ফুটবল প্রতিপত্তি সার্বিকভাবে দেশভাগের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তারাও পূর্ববঙ্গীয় হিন্দুদের সমর্থন করা দল ইস্টবেঙ্গলকে প্রধান প্রতিপক্ষ ভেবে ফেলল। আর এইদিকে মোহনবাগানের সঙ্গে এরিয়ান ক্লাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলই। এ দেশিয় দল হিসেবে এই দু'টি দল নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের এখনকার এই ডার্বির উত্তেজনা তখনও শুরু হয়নি। তখন কলকাতা ময়দানে প্রতিযোগিতা ছিল বহুমুখী। রেলের দল, রাজস্থান ক্লাব শক্তিশালী ছিল ষাটের দশক অবধি। তারপর ধীরে ধীরে ময়দানের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল মতি নন্দীর ভাষায় 'তিন প্রধান'। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মহামেডান।

সমসাময়িক প্রেক্ষিতে স্বাধীনতা পরবর্তী কালে ভারতীয় ফুটবলের অবস্থানটাও একবার চোখ বোলানো দরকার এই ফাঁকে। হায়দরাবাদ সিটি পুলিশ কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিমের কোচিংয়ে এই সময়ে ভারতের আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য চোখ ধাঁধানো। ১৯৫১ থেকে ১৯৬৪- এই সময়কাল ছিল ভারতের ফুটবলের স্বর্ণযুগ। ১৯৫১-তে এশিয়ান গেমসে ভারত জিতেছিল সোনা, ফাইনালে ইরানকে ১-০ গোলে হারিয়ে। ১৯৫৬ অলিম্পিকে চতুর্থ স্থানে শেষ করেছিল ভারত। ১৯৬২-র এশিয়ান গেমসে আবার সোনা। ১৯৬৪-র AFC এশিয়ান কাপে রানার্স আপ। ইতিমধ্যে ১৯৫০ সালে ভারত ব্রাজিল বিশ্বকাপে স্থান পেয়েছিল। তখন বিশ্বকাপ অলিম্পিকের মতো বড় ঘটনা নয়। খালি পায়ে খেলা ভারতীয় দলকে বিশ্বকাপ খেলার অনুমতি দেয়নি ফিফা। তাই খেলা হলো না প্রথম বিশ্বকাপ। এই খালি পায়ে ফুটবল খেলা যাবে না বিষয়টা ভারতীয়রা প্রথম উপলব্ধি করে ১৯৫২ সালের হেলসিংকি অলিম্পিকে। ঠান্ডায় কাবু হয়ে খালি পায়ে খেলা ভারত যুগোশ্লোভিয়ার কাছে ১০-১ গোলে পরাজিত হয়। AIFF তারপরেই বুট পরে খেলা বাধ্যতামূলক করে। রোমানিয়ায় যুব কাপে সেবার, ১৯৫২ সালেই খেলার আমন্ত্রণ পায় ইস্টবেঙ্গল, রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের সুপারিশে।

তখন নিয়ম ছিল, কোনও ভারতীয় ক্লাবও যদি বিদেশে খেলে- ভারতীয় জার্সি পরে খেলবে। কিন্তু AIFF ইস্টবেঙ্গলকে ভারতীয় জার্সি পরার অনুমতি দিল না। ইস্টবেঙ্গলের ম্যানেজার জ্যোতিষ গুহ বললেন- 'কোনও পরোয়া নেই। আমরা লাল-হলুদেই খেলব। আমাদের জার্সি খেলে দেবে।' সেই প্রথম ময়দানি ভাষার আমদানি, "জার্সি খেলে দেবে"। এই জ্যোতিষ গুহ তিরিশের দশকে গোলকিপার হিসেবে খেলতেন। লন্ডনে আর্সেনাল ক্লাবের হয়ে ট্রায়ালও দিয়েছিলেন তিনি, যদিও ব্যর্থ হয়েছিলেন। মোদ্দা কথা, ভারতীয় ফুটবল সেইসময়ে বেশ ভালোই অবস্থানে এবং এর নেপথ্যে বহু বাঙালি ফুটবলার। শৈলেন মান্না থেকে শুরু করে পিকে ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামী। সঙ্গে মহামেডান, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলে দাপিয়ে খেলা ময়দানি গোলকিপার পিটার থঙ্গরাজ, জার্নাল সিংরা। উল্লেখ্য পিকে ব্যানার্জি তাঁর কেরিয়ার শুরু করেন একদা মোহনবাগানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এরিয়ান ক্লাবের হয়ে। ষাটের দশক থেকে ভারতীয় ফুটবল ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। ১৯৫০-এ বিশ্বকাপ বয়কট করার পর ফিফা ১৯৫৪-তে ভারতকে নিষিদ্ধ করে দেয় এবং তারপরে প্রায় ৩০ বছর ভারত আর বিশ্বকাপের যোগ্যতাবাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করেনি। আবার তারা বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসে ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার খেলতে। কিন্তু ততদিনে স্বর্ণযুগের প্রায় কুড়ি বছর অতিক্রান্ত। বিশ্ব ফুটবলের নিরিখে ভারতীয় ফুটবল কয়েক যোজন পিছিয়ে গিয়েছে ততদিনে।

কলকাতা ময়দানে এদিকে, ষাটের দশক হচ্ছে মোহনবাগানের দশক। ধীরে ধীরে মোহনবাগান এইসময়ে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে বেশ অপ্রতিরোধ্য। শৈলেন মান্না, থঙ্গরাজ, জার্নাল সিংরা তখন ময়দানের রাজা। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯-এর মধ্যে পাঁচবার কলকাতা লিগ জিতল মোহনবাগান। ১৯৬৮ সালে মোহনবাগানের চ্যাম্পিয়নশিপ কলকাতা হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছিল। সেটি ধরলে ছ'টি লিগ জিতেছিল মোহনবাগান সেই সময়ে। আক্ষরিক অর্থেই কলকাতার সূর্য তখন সবুজ মেরুন। ফের ধীরে ধীরে ভারতের রাজনীতি জটিল হতে থাকে। সত্তরের দশক নিকটবর্তী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হলো ৭১ সালে। আবার পূর্ববঙ্গীয়রা পশ্চিমবঙ্গ অভিমুখী হলেন, হতে বাধ্য হলেন। আবার ইস্টবেঙ্গল হয়ে উঠল ভারতে আসা বাংলাদেশিদের আঁকড়ে ধরার জায়গা। আবার জ্বলে উঠল ইস্টবেঙ্গল। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫- টানা ছ'বার কলকাতা লিগ জয়। এইরকম সময় থেকেই মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল হয়ে উঠল চির প্রতিদ্বন্দ্বী। পশ্চিমবঙ্গীয় দলের মধ্যে মোহনবাগানের উচ্চতা আর কোনও দল ধরে রাখতে পারল না। একদা রাজত্ব করা এরিয়ানস পিছিয়ে পড়ল। আর পূর্ববঙ্গীয় 'বাঙাল' দলের ভরসার জায়গা হয়ে উঠল ইস্টবেঙ্গল। অগত্যা এরা হয়ে উঠল প্রতিদ্বন্দ্বী। বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে গেল বাঙাল-ঘটির লড়াই। ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান হয়ে উঠল বাঙালির ইমোশন, বাংলার গর্ব।

আরও পড়ুন- ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করে ভারত! নেপথ্যে যে কারণ

এই আবেগ প্রথম ধাক্কা খেল ১৯৮০ সালের ১৬ অগাস্ট । ডার্বি খেলা উপলক্ষ্যে ব্যাপক মারপিট গ্যালারিতে। ১৬ জন দর্শক মারা গেলেন। বাঙালি ভয় পেল প্রথমবার, তবু খেলা দেখা ছাড়ল না। উন্মাদনা ধীরে ধীরে ফিরে এল। এরই ভেতর ১৯৮৩ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতল ভারত। ১৯৮৫ সালে জিতল ক্রিকেটে বেনসন হেজেস কাপ। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হল। রঙিন জার্সি পরে খেলা শুরু হলো একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ভারতবর্ষ ক্রিকেটে টুর্নামেন্ট জিততে লাগল। সচিন তেন্ডুলকরের আবেগ ঢুকতে শুরু করলো ভারতের শিরায়। পেপসি কোকাকোলা ক্রিকেটের বিপণনের ভার নিতে শুরু করল। বলিউডের গ্ল্যামার আমদানি হলো খেলার মাঠে। অবশেষে বাঙালি পেল, নিজস্ব অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে। ইতিমধ্যে, ১৯৮৬ থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার শুরু হলো। বাঙালি প্রথমবার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত হয়ে পড়ল। ভারতের সাফল্যের আনন্দ তারা ক্রিকেটে খুঁজে পেল আর আন্তর্জাতিক ফুটবলের খেলার দেখে তারা হয়ে উঠল মুগ্ধ। ফুটবলের আকাশে তখন দিয়েগো মারাদোনা এবং কলকাতার ময়দানের আকাশে জমেছে মেঘ। মুক্ত অর্থনীতির যুগে ভারতবর্ষে সম্প্রচার হতে শুরু করল ইউরোপিয়ান লিগ। অনেক বাঙালিই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান সম্পর্কে উদাসীন হয়ে উঠল। হলো যথার্থ কারণেই। তাদের বিনোদন হয়ে উঠল অন্য মাধ্যম। ভারতীয় ফুটবলের উন্মাদনা অনেকটা কমল।

এরকম সময়েই আমাদের প্রজন্ম (১৯৯০-এর দশকে জন্ম যাদের) ছোটবেলায় ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের আবেগের খানিকটা উত্তাপ পেল। আমাদের আগের প্রজন্ম, আমাদের শুনিয়ে গেল সেই ট্র্যাডিশনের গল্প। আমরা অবাক হলাম, তবে পুরোটা উপলব্ধি করলাম কি? এর মধ্যে ভারতে চেষ্টা হলো লিগ স্ট্রাকচারকে উন্নত করার। জাতীয় লিগ হলো, আই লিগ হলো। তারপর তারকা খচিত ISL এসেছে। ১৭৩ rank থেকে ভারত আবার উঠে এসেছে বিশ্বের প্রথম একশোয়। আমাদের ছোটবেলায় ২০০০ এর প্রথম দশকে হাড্ডাহাড্ডি সমর হতো দুই প্রধানের। ততদিনে মহামেডান স্পোর্টিং আর সামনের সারির দল নেই। গোয়ার সালগাঁওকার, ডেম্পো ইত্যাদি দল ছিল বাংলার দুই প্রধানের প্রধান প্রতিপক্ষ। তবে সাম্প্রতিক অতীতে দুই প্রধানের মধ্যে মোহনবাগানের পাল্লা অনেক ভারী। আশার খবর, ভারতের ফুটবল আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। সুনীল ছেত্রী হয়ে উঠছেন আশার আলো। ইস্টবেঙ্গলের ইলিশ আর মোহনবাগানের চিংড়ির লড়াই কর্পোরেট যুগে বেশ খানিকটা স্তিমিত যদিও। মোহনবাগানের সমর্থকরা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের 'লোটা' বলেন, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা মোহনবাগানিদের 'মাচা' বলেন। তাতে আসল লড়াইয়ের গন্ধ নেই। আমাদের প্রজন্মে এই একদা মজাদার অথচ এখন নোংরা মানসিকতার কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়ি। এই দুই ক্লাবের ঐতিহ্য ধুলোয় গড়াগড়ি যায়।

আমি ফুটবল গবেষক নই। তবে যে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান নিয়ে আমরা ঝগড়া করি, চোখের জল ফেলি, এত বছরের উন্মাদনা, সারা পশ্চিমবঙ্গের শিরায় শিরায় যে লড়াই- তার গোড়ার দিক, বড় হওয়ার দিকটা জানতেই হবে। ইতিহাস জানলেই মানুষ শ্রদ্ধা শেখে, ভালোবাসতে শেখে। ইতিহাস জানলেই মানুষ বুঝতে পারে ফুটবল নিছক খেলা নয়, বাংলার ফুটবল একটি জীবনশৈলী। তার নিজস্ব জগৎ আছে, তার নিজস্ব প্রতিরোধ আছে ব্রিটিশদের বিপক্ষে,  সমাজের বিপক্ষে। বাংলার ফুটবল, ভারতের ফুটবল আবার উঠুক জেগে। এই শতাব্দী হোক ভারতের ফুটবলের শতাব্দী। এই ময়দান হোক বাংলার ফুটবলের ময়দান। আমাদের জীবদ্দশায়, আরেকটিবার!

More Articles