বৈচিত্রের জন্মাষ্টমী, যে ভাবে আজও কৃষ্ণপ্রেমে মাতে বৃন্দাবন থেকে বাংলা

Shrabanti Mitra
৩ মিনিট
বৈচিত্রের জন্মাষ্টমী, যে ভাবে আজও কৃষ্ণপ্রেমে মাতে বৃন্দাবন থেকে বাংলা

সকল প্রেমের আধার তিনি, তিনি শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর ভাবধারার লীলা আমাদের বঙ্গদেশে মেঠো পথে, ধুলোতে-বাতাসে মিশে আছে। দ্বাপর যুগে যদি কৃষ্ণলীলার মত্ততায় প্রেমসাধনার সূত্রপাত হয়, তবে কলিযুগে তার বিকাশ ঘটে চৈতন্যদেবের মুক্তিসাধনায়। পৃথিবীর সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বিতরণের এই কর্মকাণ্ড কীভাবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় ব্যঞ্জনার উৎসবে পরিণত হল, তা আমরা জানিনা। তবে আরাধনার মত্ততা থেকে নিজেদের বিযুক্ত করে, অন্তরআত্মার শুদ্ধিকরণের চেষ্টা করি প্রতিবারই।

সম্ভবত শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র, যাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রতিটি মানুষ, নিজেদের ঘরের অন্দরে, আদর-যতনে রেখে পুত্র স্নেহে লালন-পালন করে। তাকে বড় করে তোলার প্রতিটি পর্ব, তার সঙ্গে নিয়ে যাপন করা প্রতিটি দিন; মাতৃ চেতনার প্রকাশ ঘটায় আমাদের মনে। কৃষ্ণ আমাদের ঘরে ঘরে মাতৃ জঠরে জন্ম নেওয়া সন্তান। তাই তাঁর জন্মদিন আমাদের পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যের জন্মদিন পালনের মতোই আড়ম্বরপূর্ণ।

বাংলায় জন্মাষ্টমীর উৎসব ভিন্ন স্থানে ভিন্ন নামে পরিচিত। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রের আবির্ভাব যখন প্রাধান্য পায়, তখনই আমরা পালন করি জন্মাষ্টমী। তাই জন্মাষ্টমীকে 'অষ্টমী রোহিণী'ও বলা হয়। এর পাশাপাশি জন্মাষ্টমী পরিচিত কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী ও শ্রীকৃষ্ণ জয়ন্তী হিসেবেও। শাস্ত্রীয় বিবরণ, জ্যোতিষী গণনা এবং লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ৩২২৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দের ১৮ অথবা ২১শে জুলাই মথুরা নগরীতে কংসের কারাগারে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণের ভূমিষ্ঠ হওয়াকে কেন্দ্র করে, তার পূর্বের ও পরবর্তী সময়ের ইতিহাস এবং পৌরাণিক কাহিনীর কথা আমরা অনেকেই জানি। তাঁর সমগ্র জীবন জুড়ে যে যাতনা, লড়াই, বিপর্যয় ও একাগ্রতার পরিচয় আমরা পাই, তা আমাদের জীবনযাপনের প্রতিটি শূণ্য আধারকে পূর্ণ করে তোলে এবং জীবনদর্শনকে সমৃদ্ধ করে তোলে। আর সে কারণেই আজ শ্রীকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা বৃন্দাবন, মথুরা, গোকুল কিংবা দ্বারকার সীমারেখা পেরিয়ে বিশ্বের মুষ্টিমেয় দেশে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে উত্তর উত্তর।

ঘোর অমানিশার ভেতর দিয়ে যিনি জন্মেছেন, তাঁর গায়ের রং নিয়ে আমাদের অনেকেরই নানা বিতর্কিত মতামত আছে। তবে শ্যাম অর্থে শ্যামলাভ যদি বোঝানো হয়, তবে তা ধূসর, পীত, কালো আর নীলের ঘনসন্নাবস্থান। তবু, কোথাও তাঁকে দেখা যায় কুচকুচে কালচে দেহে বাঁশি হাতে, কোথাও আবার ঘন নীলের মহিমায়। বাংলা ছাড়াও ভারতবর্ষের মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান, ওড়িশা সহ উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে শ্রী কৃষ্ণের আরাধনা করতে দেখা যায়।

বাংলায় যেমন জন্মাষ্টমীকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কিছু আচার-আচরণ মেনে চলা হয়, তেমনই মুম্বই ও নাগপুরে জন্মাষ্টমীর পরের দিন পালন করা হয় 'দহি হান্ডি'। এই রীতি অনুযায়ী প্রথমে ভর্তি হাঁড়ি ফাটানো হয়, তারপর সেই হাঁড়ি থেকে বের করে নেওয়া প্রসাদ, বিতরণ করা হয় সকলের মধ্যে। ভারতের বাইরে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব পালন করা হয় বাংলাদেশ, নেপাল, ফিজি দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি স্থানে এবং পাশ্চাত্য দেশের কয়েকটি অঞ্চলেও।

বঙ্গদেশে জন্মাষ্টমী পালনের বিবিধ রীতিনীতির মধ্যে একপ্রকার পারিবারিক আতিথেয়তার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বলা হয় আজকের দিনে গোপালের বিগ্রহকে নতুন বস্ত্র পরিয়ে মাখন-মিছরি সহযোগে তাঁকে ৫৬ রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। এর মধ্যে উল্লখযোগ্য পদগুলি হলো ননী, মাখন, তালের বড়া, ক্ষীর, মালপোয়া, মোহনভোগ, নারকেল নাড়ু, বাসন্তী পোলা, লুচি এবং সুজি।

সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই অসংখ্য প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে সাড়ম্বরে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। আজ বলব কলকাতার খুব কাছে গঙ্গা তীরবর্তী উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুরের নবাবগঞ্জের গোপীনাথ জিউর মন্দিরের কথা। মন্দিরটি স্থাপন করেন ১৮৪৫ সালে শ্রীধর মন্ডল। এই মন্দিরে রাধাগোবিন্দের সেবার পাশাপাশি ঝুলন, রাস ও দোল উৎসবও উদযাপন করা হয়। ১৯০৬ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি সপরিবারে মন্দিরটি পরিদর্শনে আসেন লর্ড মিন্টো। একসময় এখানে ঝুলনে বিশাল মেলাও বসত। তার পাশাপাশি খেলাধুলা ও যাত্রাপালায় বিশেষ করে, কৃষ্ণনগরের বিশিষ্ট শিল্পীরা এসে তাঁদের ছন্দে, কথায় ও গানে রামায়ণ এবং মহাভারতের বিভিন্ন দৃশ্যাবলী ফুটিয়ে তুলতেন দর্শকদের সামনে। এছাড়া, বৃন্দাবনের আদলে এখানে গোষ্ঠ উৎসবও পালন করা হয়।

এই মন্দিরটির গঠনশৈলীতে এখনও প্রাচীন স্থাপত্যরীতি নজরে পড়বে। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালের উপরিভাগের রঙিন নকশা, উঠোনের সামনে কাঠের শক্ত বেদী, ঠাকুরদালানের চকমেলানো মেঝে, দালানের এক কোণে রাখা পরপর তিনটি সিংহাসন এবং সর্বোপরি মন্দিরের আনাচে-কানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা মাটির তৈরি সং মন্দিরের আভিজাত্য বজায় রেখেছে এখনও।

তাই জন্মাষ্টমী শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে আজও যেমন বেঁচে আছে বাংলার স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি, তেমনই বহু মানুষের অন্নসংস্থানও হয় এই উৎসবের সৌজন্যেই।

লিখেছেন
Shrabanti Mitra
Shrabanti Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।