কলকাতা নেই কলকাতাতেই, শেষ কুড়ি বছরে কতটা বদলে গেল শহর

কলকাতার চেহারা কতটা পালটাল? কী কী হারাল শহর থেকে?

Sretama Basak
৪ মিনিট
কলকাতা নেই কলকাতাতেই, শেষ কুড়ি বছরে কতটা বদলে গেল শহর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা নিয়ে একটি কবিতা লিখে গিয়েছিলেন, ‘স্বপ্ন’। কবিতাটির সারমর্ম ছিল যে, কবি একদিন স্বপ্নে দেখছেন, আস্ত কলকাতা শহরটা হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন চলেছে। সবাই থামতে বললেও কলকাতার তা শোনার সময় নেই।

লক্ষ

লক্ষ লোক বলে, “থামো, থামো”, কোথা

হতে কোথা যাবে, একী পাগলামো”। কলিকাতা

শোনে নাকো চলার খেয়ালে; নৃত্যের নেশা তার স্তম্ভে দেয়ালে

এখনকার দিনে দাঁড়িয়ে কবিতাটি পড়লে সুন্দর একটি বাস্তবিক মিল আমরা কিন্তু পাই। এবার অনেকেই বলবেন ‘কোথায় কলকাতা হাঁটছে? কলকাতা তো কলকাতাতেই আছে, তাহলে?’ না, সেই ছোটার কোথা হচ্ছে না। এই শহরটা হয়তো আক্ষরিক ছুটছে না, কিন্তু কলকাতাবাসীরা? যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে রিলের রেসে নিজেদের জেতাতে আমরাও তো ছুটছি পাগলের মতো, আর তাই আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে তিলোত্তমাও।

কলকাতা, শহরটার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভালবাসা, সবাইকে আপন করে নেওয়ার এক অসীম ক্ষমতা। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এই শহর, ঘটেছে অনেক পরিবর্তন, এসেছে বিবর্তন। এই শহর দেখেছে স্বাধীনতার সংগ্রাম, দেখেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশভাগের বেদনা, পেয়েছে বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্য, প্রথম মেডিক্যাল কলেজ, লাইব্রেরি, নারী-শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর তো এই তিলোত্তমাতেই। যত দিন যাচ্ছে, হেরিটেজের লিস্ট বাড়ছে। ছোটবেলায় রোজকার জীবনে দেখে আসা কলকাতার অনেককিছুর অনেক স্মৃতি এখন মলিন, আর তাই আজ বরং ঘুরে আসা যাক সেইসব অতীতের চোরাগলিতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কলকাতার বাতাসে বিষ! উদাসীন থেকে কত বড় বিপদ ডেকে আনছে শহরবাসী

বাতাসে PM 2.5 ধূলিকণার নিরিখে কলকাতা গোটা বিশ্বে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। প্রথম স্থানেও কোনও চমক নেই। শিল্ড দেশের বাইরে যায়নি। প্রথম স্থান অধিকার করেছে রাজধানী দিল্লি।

ভারতে প্রথম মেট্রো রেল চালু হয় ১৯৮৪ সালে কলকাতায়, আর সেখান থেকেই কলকাতার ধীরে ধীরে আধুনিকীকরণের শুরু। তবে মেট্রো শুরু হলেও পাতাল রেলের এত রমরমা তখন ছিল না। রমরমা ছিল ট্রামের, গোটা শহরটা দিয়ে এঁকেবেঁকে ছিল শুধু ট্রাম যাওয়ার লাইন আর এখন সেখানে ঠিক দুটোমাত্র ট্রামরুট। আগে সাধারণ মানুষ ট্রামে চড়ত যাতায়াতের জন্য আর এখন ট্রামে চড়ে ভ্লগাররা বা নতুন প্রজন্ম, যারা কেবল যাতায়াতের জন্য, নিত‍্যপ্রয়োজনে কোনওদিন ট্রামে চড়েনি। কিন্তু একবার উঠেই সেলফি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করে তাঁদের ট্রামযাত্রা সম্পূর্ণ হয়। ট্রাম চললেও আজকের যুগের গতির সঙ্গে সে টেক্কা দিতে পারে না। তাই সেরম ভিড় ট্রামে আর হয় না এখন। যেখানে একসময় ভিড়ের চোটে উঠতে পারত না লোক, সেখানে ফাঁকা ট্রাম ছুটে চলে শহরের এই মাথা থেকে অন্য মাথা। তাও তো ট্রাম জেল্লা হারিয়েও এই শহরে এখনও বিরাজ করছে, কিন্তু দোতলা বাস? সে তো কবেই মুছে গেছে। শেষ দোতলা বাস কলকাতায় দেখতে পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে। এই বাসগুলি কলকাতায় প্রথম চালু হয় ১৯২০ সালে, ব্রিটিশদের হাত ধরে। ওই সময় সারা শহরে চলত এই বাস। তাও আজ আর নেই, তখন এই একতলা বাস ছিল, তবে পরিমাণে খুবই কম। এখন তো একতলা বাসেরই রমরমা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী আবার এই হেরিটেজকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু তা শুধুমাত্র শহর ঘোরার জন্য, সেই বাসে চড়তে গেলে আগে থেকে অনলাইনে টিকিট কাটতে হয়, মানে শুধু মনোরঞ্জনের জন্যই এই বাসের ব্যবস্থা করা।

ট্রাম বা দোতলা বাসেই শেষ নয়, ছিল কালো-হলুদ ট্যাক্সি। হলুদ ট্যাক্সিও চলত পাশাপাশি, তবে সংখ্যাটা কম। নয়ের দশকের পর থেকে ধীরে ধীরে কালো-হলুদ ট্যাক্সির দাপট কমতে থাকে, আর বাড়তে থাকে হলুদ ট্যাক্সি। এখন নিয়তির ফেরে হলুদ ট্যাক্সিও শূন্য হওয়ার পথে। কারণ, অ্যাপ ক্যাবের বাড়বাড়ন্ত। তখন রাস্তার কোনায় কোনায় এত গাড়ির লাইন থাকত না, এত ব্যক্তিগত গাড়িও ছিল না সাধারণ মানুষের। থাকার মধ্যে ছিল কিছু প্রাইভেট অ্যাম্বাসাডর, তথাকথিত বড়লোকদের ফিটন গাড়ি আর হাতে টানা রিকশা।এরপর নয়ের দশকে ধীরে ধীরে আসতে থাকে মোটরবাইক, অটোরিকশা, টাটা সুমো ইত্যাদি গাড়ি। আর ততই চাহিদা কমতে থাকে ট্রাম আর ট্যাক্সির।

এখন মুঠোফোনের জমানা। নয়ের দশকে সকলের বাড়িতেই মোটামুটি ল্যান্ডফোন এসে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় তখন ল্যান্ডফোনের বুথ ছিল‌, এসটিডি বুথ নামেই যাকে আমরা চিনতাম। এখনকার মতো ব্যক্তিগতভাবে সবার হাতে যেহেতু ফোন ছিল না, তাই পরিবারের দু'-তিনজনের একসঙ্গে ফোনের দরকার হলে ছুটতে হতো পাড়ার ফোন বুথে। এরপর নয়ের দশকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে আসতে থাকে হ্যান্ড ফোন, যা আগে শুধু কথা বলায় সীমাবদ্ধ ছিল, তার প্রসার বেড়ে হয় এসএমএস পর্যন্ত। এরপরের ইতিহাস তো সবাই জানে, টাচ স্ক্রিনের আগমন, ইন্টারনেটের বিস্তার আর সূচনা এক নতুন যুগের।

উত্তর কলকাতায় ক্ষেত্রবিশেষে ব্রিটিশ ছাপ আজও স্পষ্ট, সেখানকার বাড়িগুলোতে ছিল ইংরেজি আদলের ছোঁয়া। বদলের ঢেউ সেখানেও লেগেছে, তবে অতটা নয়। আজও উত্তর কলকাতার বেশ কিছু বাড়ি ঐতিহ্যের প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে নয়ের দশকের শেষের দিক থেকে দক্ষিণ কলকাতায় শুরু হয় ফ্ল্যাটবাড়ির রাজত্ব, যা আজকের কলকাতায় চরম আকার নিয়েছে। যে ক'টা ঐতিহ্যশালী বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তাও প্রোমোটারদের নজরে পড়ে ফ্ল্যাট হওয়ার পথে। নেই খোলা ছাদ, বারান্দা, চিলেকোঠার ঘর, ঘুলঘুলি, আর সেই বিখ্যাত কাঠের খড়খড়ি দেওয়া ঝিলিমিলি জানলা। তার বদলে জায়গা করেছে দশ বাই দশ ফুটের ঘর।

পাড়ায় পাড়ায় অনেক বেশি বন্ধন ছিল, ছিল পাড়ার মোরের রক, রকের আড্ডা। ছিল পাড়ায় পাড়ায় নাটকের দল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্বভাবতই সেইসব অনুষ্ঠান ছিল নিতান্তই সাধারণ, কিন্তু আবেগ ছিল ভরপুর। ক্লাব সংস্কৃতি অবশ্য তখনও ছিল, এখনও আছে। তথাকথিত বড়লোকদের জায়গা ছিল তা, এখন সেই ভেদাভেদটা কমে আসছে। পুজো নিয়ে ছিল না এত ব্যবসা, এত থিম-স্পনসরের আড়ম্বর ছিল না, বিশ শতকের গোড়া থেকে এই থিম প্যান্ডেলের প্রচলন শুরু হয়। তখন রেস্তোরাঁ বলতে ছিল রয়্যাল, নিরঞ্জন আগার, নিজাম, গোলবাড়ির কষা মাংস, ফ্লুরিজ ইত্যাদি বিখ্যাত কিছু রেস্টুরেন্ট।

শহর তিলোত্তমা বরাবরই পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে। এই চার দশকে ঘটা যুগের পরিবর্তনের সাক্ষী সে। সবকিছুই কি বদলেছে? না, কিছু জিনিস আজও অমলিন। তার মধ্যে অন্যতম ঘটি-বাঙাল লড়াই, ইলিশ-চিংড়ি, রাজনীতি আর ফুটবলের প্রতি এই শহরের ভালবাসা। চায়ের কাপের ধোঁয়ায় আজও জোরকদমে আলোচনা চলে। চটের থলে নিয়ে বাজারে গিয়ে দরদাম করা থেকে আজকের অনলাইন ডেলিভারি, পাড়ায় পাড়ায় চায়ের দোকান থেকে গলিতে গলিতে একটা করে ক্যাফেটেরিয়া, এতকিছুর মাঝেও শহরটা যেটুকু নস্টালজিয়া নিয়ে বেঁচে আছে, সেইটুকু বহন করে ‘City of Joy’ স্বাতন্ত্র‍্য বজায় রাখুক, এটাই চাওয়ার।

লিখেছেন
Sretama Basak
Sretama Basak
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।