গালিবকে শূন্য হাতেই ফিরিয়েছিল পুরোনো কলকাতা, কেমন ছিল সেই শহর

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
গালিবকে শূন্য হাতেই ফিরিয়েছিল পুরোনো কলকাতা, কেমন ছিল সেই শহর

কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় পথ হাঁটছেন এক নিঃসঙ্গ কবি। চোখে ভরে দেখছেন তিলোত্তমা কলকাতাকে। কোলাহল মুখর কলকাতার সেই ছবি তিনি ধরে রাখছেন তাঁর শায়েরমালা 'সফর-এ- কলকাত্তাহ'-তে। হেদুয়া শহর কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা। তার উল্টো পারেই বেথুন কলেজ। ঠিক তার পিছনদিকে যে রাস্তা ঘুরে গিয়ে মিশেছে রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে সেই জায়গাটিরই তখন স্থানীয় পরিচিতি শিমলে বাজার নামে। ওই রাস্তার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এক মহামহিম কবির করুণ নিঃসঙ্গ কাহিনি। নাম, মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান। গোটা দুনিয়া অবশ্য চেনে মির্জা গালিব নামে। বর্তমানের বেথুন রো-র ১৩৩ নম্বর হাভেলিতে উঠেছিলেন মির্জা গালিব। মাত্র ১৮ মাস কলকাতায় ছিলেন গালিব। কেমন কেটেছে সেই দেড়টা বছর?

১৮২৮ সাল। দিল্লি থেকে কলকাতায় আসছেন গালিব। কখনও পায়ে হেঁটে কখনও বা ঘোড়ায় চড়ে আবার কখনও বজরা বা নৌকায়। তাঁর অভিপ্রায়, ইংরেজ বড়লাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ। কারণ ততদিনে মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত। দিল্লির বাদশা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের সঙ্গেও ইংরেজদের সম্পর্ক ভালো নয়। কিন্তু বাদশা গুণী মানুষের কদর করতেন। তাঁর সভা আলো করে থাকতেন গালিব। কিন্তু একসময় ইংরেজদের সন্দেহের তালিকায় উঠে এল তাঁর নাম। বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে বন্ধ হল তাঁর পেনশন। কিছুই করতে পারলেন না দিল্লির বাদশা তাঁর প্রিয় কবির জন্যে। কারণ তিনিও ততদিনে ইংরেজ সরকারেরই আরেক পেনশনভোগীতে পরিণত হয়েছেন। গালিব পড়লেন চূড়ান্ত অর্থকষ্টে। পেনশনের বিষয়ে কথা বলতেই গালিবের কলকাতাযাত্রা।

তখন কলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দপ্তর। বড়োলাট হলেন লর্ড আমহার্স্ট। গালিবের পিতামহ ছিলেন সইনিক।গালিবের বাবা চাকরি করতেন লখনউ এর নবাব আসফ-উদ- দুল্লার দরবারে। পাঁচ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর গালিবের পরিবারের দায়িত্ব নেন কাকা নাসরুল্লাহ বেগ। তাঁর মৃত্যুর পর গালিবের পরিবারের জন্য সরকার দশ হাজার টাকার ভাতার ব্যবস্থা করে যদি ও পরে তা কমে দাঁড়ায় পাঁচ হাজারে।

কেমন ছিল পুরনো কলকাতা? সফর-এ-কলকাত্তাহ তে বিষদে কলকাতার বর্ণনা করছেন গালিব। তাঁর বিখ্যাত আলফাজে লিখছেন, “কলকাত্তেকা জো জিকর কিয়া তুনে হম নশি/এক তীর মেরে সিনে মে মারা কে হায় হায়!” কলকাতা তাঁর মন জয় করে নিয়েছে ততদিনে। তাঁর লেখায় গালিব উল্লেখ করছেন এক বিরাট গোল তালাও এর কথা। আজকের মানচিত্র মেলালে দেখা যাবে সেই বিরাট তালাই হল হেদুয়ার পুকুরটি যার আজকের নাম আজাদ-হিন্দ-বাগ। গালিবের লেখায় উঠে আসে কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন রাস্তা চিতপুরের কথাও।

শুধু কলকাতার বিবরণ নয়, কলকাতার কাব্যসমাজের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলেন গালিব।কলকাতার তৎকালীন কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন গালিব। যদিও সেই আলাপ গালিবকে খুব খুশি করেনি।এক তর্ক সভায় গালিব উর্দু ও ফার্সি ভাষায় কিছু শায়রি পাঠ করেন।সেখানে একটি শায়রি নিয়েই তর্ক শুরু হয় গালিব ও মির্জা কাতিলের শিষ্যদের মধ্যে।হাফিজের কবিতার অনুষঙ্গ টেনে গালিব সেদিন বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁর শায়রি ব্যাকরণের নিয়ম ভাঙেনি। আঘাত পেয়েছিলেন গালিব। তাও অকুণ্ঠ চিত্তে কলকাতার জয়গান করেছেন মহাকবি। গালিবের কথায় কলকাতার মত মন জয় করা জমিন তামাম দুনিয়ায় নেই।

কলকাতার মানুষও আপন করে নিয়েছিলেন কবিকে। শিমলেপাড়ার মানুষ তাঁকে ডাকতেন বাবা বলে।কলকাতার তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের একাংশের সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল গালিবের। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল বিশেষ সখ্য।মিত্র বাড়িতে আজ ও সযত্নে রক্ষিত হয়েছে গালিব-রাজেন্দ্রলালের বন্ধুত্বের স্মৃতি।

যদি ও কলকাতা গালিবকে খালি হাতেই ফিরিয়েছিল। পেনশন তো দূরে থাক, দেখা মেলেনি বড়লাটের। হতভাগ্য মনে গালিব ফিরে গিয়েছিলেন দিল্লি। কিন্তু তাঁর শায়েরমালা আজও পুরনো কলকাতার সেই গল্প বুকে ধরে রেখেছে পরম মমতায়।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?