পিৎজা-পুরাণ, কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই জনপ্রিয় খাবার?

নিজেদের খাবারের রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক-এক দেশ নিজেদের মতো পিৎজা করে নিয়েছে।

Sindhu Som
৪ মিনিট
পিৎজা-পুরাণ, কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই জনপ্রিয় খাবার?

আজকাল পিৎজায় মধ্যবিত্ত বাঙালি বেশ অভ্যস্ত। ভারতে এই খাবারটি এসেছে বেশ কিছুদিন আগেই। মূলত উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তের খাবার ছিল তখন পিৎজা। দামের দিক দিয়ে দেখলে এখনও তাই। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি সাধ্যের বাইরে গিয়েও পিৎজা খেতে ভালোবাসে। পিৎজা খাওয়ার মধ্যে এক ধরনের স্ট্যাটাস বোধ রয়েছে। কিন্তু জানলে আশ্চর্য হবেন, পিৎজা কোনওদিনই বড়লোকদের খাবার ছিল না। এক এক দেশে পিৎজার স্বাদ এক-একরকম। নিজেদের খাবারের রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক-এক দেশ নিজেদের মতো পিৎজা করে নিয়েছে। তবে সাধারণত ভারতে যে পিৎজা আমরা খাই, আসল পিৎজার ধারেকাছেও যায় না সেই স্বাদ। আসুন, আজকে পিৎজা-পুরাণ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

চলতি ধারণা পিৎজা ইতালিয়ান ডিশ। কিন্তু ঐতিহাসিকরা বলছেন, অন্য কথা। এই খাবারের ইতিহাস অনেক অনেক পুরনো। কত পুরনো? ধরুন যদি বলি, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক? চমকে উঠলেন? সত্যিই তাই। দেখা গিয়েছে, প্রাচীন গ্রিস, রোম এবং ইজিপ্টের লোকেরাও এই ধরনের গোল রুটি নানারকম তেলমশলা এবং টপিংস দিয়ে খেতেন। এমনকী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পার্সিয়ানরাও এই ধরনের চিজে ঢাকা চ্যাপটা রুটি খেতেন। তবে আজকে যে ধরনের পিৎজা আমরা খাই, তার উৎপত্তি ইতালির নেপলসে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যেমন রসালো, তেমনই প্যাঁচালো! বাঙালির প্রিয় জিলিপিও মুঘল আমলের সৃষ্টি!

যতই দারসান, পেস্ট্রি কিংবা ব্রাউনির আগমন ঘটুক না কেন, বাঙালির মনে জিলিপির আবেদন কোনওদিনই ম্লান হবে না।

যদিও এই আধুনিক পিৎজার উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে, গবেষকরা তা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি, তবু মোটামুটি একটা সময়কাল খুঁজে পাওয়া যায়। টমেটো পশ্চিমের ফসল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর আগে ইউরোপে তার আমদানি হয়নি। প্রথম প্রথম লোকে টমেটোকে বিষফল মনে করত। ফলে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ষোড়শ শতকের আগে আধুনিক পিৎজার জন্ম হয়নি। ১৭৯৯ সালে প্রকাশিত একটি বইতে পিৎজাকে টমেটো সস এবং চিজ দিয়ে খাওয়ার ডো বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। এর থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়, এই বই লেখার আগেই আধুনিক পিৎজা এসে গিয়েছে। আবার অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইতালির আদমশুমারিতে দেখতে পাচ্ছি নেপলসের কয়েকজনকে 'পিজোলা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 'পিজোলা' বলা হত পিৎজা প্রস্তুতকারকদের। এর থেকে ধারণা করা যায়, পিৎজা সেসময়ে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, কারিগরদেরও এই খাবারের নামেই চিহ্নিত করা হত।

মার্গারিটা পিৎজার নাম মোটামুটি সকলেই জানেন। কীভাবে তৈরি হল এই মার্গারিটা পিৎজা? এই নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত। শোনা যায়, ১৮৮৯ সালে নেপলস ভ্রমণে এসেছিলেন ইতালির হবু রাজা ও রানি। পিৎজা সেসময় ছিল নিতান্ত গরিবের খাবার। 'জনতার রানি' হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে গিয়েই পিৎজা খেতে চান ইতালির হবু রানি। ফলে স্যাভয়ের কন্যা মার্গারিটা ডেকে পাঠান রাফায়েল এস্পোসিতোকে। নেপলসের রাফায়েল তখন ইতালির নামকরা পিৎজা-কারিগর। রাফায়েলের নানা ধরনের পিৎজা চেখে দেখেন রানি। রসুন ছড়ানো পিৎজা, অ্যাংকোভি (হেরিং জাতীয় ছোট মাছ) ছড়ানো পিৎজা, টমেটো সসে ঢাকা মোজারেলা চিজ দেওয়া পিৎজা। শেষেরটি বেশ পছন্দ হল রানির। দেখতেও কেমন ইতালির পতাকার মতো। হবু রানি মার্গারিটার পছন্দের পিৎজাকে এস্পোসিতো নাম দিলেন 'মার্গারিটা'। তবে অন্যরকম গল্পও শোনা যায়। অনেকে বলেন, রানি হওয়ার পরে নাকি মার্গারিটা পিৎজা চেখে দেখেন। ফরাসি খাবার খেতে খেতে অরুচি ধরে গিয়েছিল তাঁর। তাই মুখবদলের জন্য এই ব্যবস্থা। যেখানে রানি প্রথম পিৎজা খান, সেই স্থানটিতে এখনও একটি ফলক টাঙানো রয়েছে। এই ফলকে পিজেরিয়া ব্র্যান্ডিকেই মার্গারিটা পিৎজার জন্মস্থল বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

আধুনিক পিৎজার উদ্ভব ইতালিতে হলেও অন্যতম জনপ্রিয় পেপেরোনি পিৎজার জন্ম কিন্তু অনেকটাই দূরে। ইতালীয়রা পেপেরোনি একেবারেই পছন্দ করে না। সুতরাং, পিৎজার টপিংস হিসেবে তা ব্যবহার করবে, তা ভাবার বাইরে। সূত্রানুযায়ী নিউ ইয়র্কের ক্যানাসোটায় ১৯০৬ নাগাদ এজো পরিবার সসেজ বানাতে শুরু করেন এবং সম্ভবত গোল গোল চাকতির আকারের কাটা সসেজ বিক্রিও তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয়। খাদ্য-ইতিহাসের গবেষকরা বলছেন ১৯৫০-এর আগে এই পেপেরোনি পিৎজার ওপর ছড়ানো হত না। পঞ্চাশের দশকে হঠাৎ করেই নিউ হেভেনের একটি দোকানে কেউ পিৎজার ওপর পেপেরোনি দিয়ে ফেলে। এই করেই প্রচণ্ড জনপ্রিয় পেপেরোনি পিৎজার জন্ম। তখনও পৃথিবীজুড়ে এই পিৎজা ছড়িয়ে পড়েনি। সমস্ত বিশ্বে একে জনপ্রিয় করে তোলে ডোমিনোজ। আমেরিকাতে ডোমিনোজের পিৎজা লোকে খুব একটা পছন্দ করেন না। এখানেও অনেকেই করেন না। স্বাদ বা দামের জন্য পছন্দ নাইই হতে পারে, তবে পিৎজার ইতিহাসে ডোমিনোজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আশির দশকে সেই এজো পরিবারই ডোমিনোজের জন্য পেপেরোনি পিৎজা বানাতে শুরু করে। ডোমিনোজ তখন ছোট্ট একটি চেইন, টিনএজ মিউট্যান্ট নিঞ্জা টার্টলস্‌ কার্টুনটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে হু হু করে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাদের। কয়েক বছরে পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় পিৎজায় পরিণত হয় পেপেরোনি পিৎজা। বর্তমানে গোটা আমেরিকায় যা পিৎজা বিক্রি হয়, তার ৫০ শতাংশই পেপেরোনি পিৎজা।

হাওয়াইয়ান পিৎজা নিয়ে অবশ্য একটু বিতর্ক রয়েছে। স্বাদ নিয়ে তো বটেই, এই পিৎজার উৎস নিয়েও বিতর্ক। ইতালি থেকে যে এই পিৎজা আসেনি, তা বলাই বাহুল্য। তবে এই আনারস বা হ্যাম, বা মরিচ, বেকন, মাশরুম টপিংসে ব্যবহার করা পিৎজার উৎপত্তি হাওয়াইয়েও হয়নি। এই মশলাদার মিষ্টি পিঠে তৈরি হয়েছে ক্যানাডায়। আশ্চর্য হলেন? মর্ডানিস্ট পিৎজার বই থেকে জানতে পারা যায়, ১৯৬২ সালে ফ্রেঞ্চ ক্যানাডিয়ান স্যাম প্যানোপলাস সর্বপ্রথম এই পিৎজাটি বানান। কিন্তু তা সঠিক নয়। ১৯৫৭ সালে অরেগনের ফ্র্যাঞ্চাইস পিৎজা জাঙ্গল একটি হাওয়াইয়ান পিৎজার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, যাতে আনারস, পেঁপে ও সবুজ মরিচের টপিংস দেখা যাচ্ছে। যদিও তাতে হ্যাম ছিল না। হতে পারে, বর্তমানে আমরা যে বস্তুটিকে হাওয়াইয়ান পিৎজা বলে চিনি, তা প্যানোপলাসেরই সৃষ্টি।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।