দিনের পর দিন বিনিদ্র ডিউটি! চালক নাকি রেলকর্তৃপক্ষ, দুর্ঘটনার আসল দায় কার?

Kanchenjunga Express Tragedy: অনেকেই দুর্ঘটনার দায় ঠেলেছেন চালকের ঘাড়ে। কিন্তু সত্যিই কি দোষ দেওয়া যায় তাঁদের। সিগন্যালজনীত ত্রুটি, আনুষাঙ্গিক ভুল-ভ্রান্তির সঙ্গে যে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়টি বারবার উঠে আসছে, তা হল লোকো পাইলটদের শারীরিক ক্লান্তি।

Sohini Das
৩ মিনিট
দিনের পর দিন বিনিদ্র ডিউটি! চালক নাকি রেলকর্তৃপক্ষ, দুর্ঘটনার আসল দায় কার?

কখনও করমণ্ডল তো কখনও লোকমান্য তিলক জ্ঞানেশ্বরী, কখনও বা গাইসাল। বারবার ভয়াল বিভীষিকাময় ট্রেন দুর্ঘটনা এসে কেড়েছে অসংখ্য প্রাণ। সেই তালিকায় দু'দিন আগেই নাম লিখিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। কার্যত গ্যাঁটের টাকা খরচ করে মৃত্যু কিনছেন যাত্রীরা, ভারতীয় রেলের পরিকাঠামো নিয়ে উঠে গিয়েছে তেমন অভিযোগও। ঠিক কী কারণে দুর্ঘটনা। কেন শিয়ালদহগামী কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে এসে ধাক্কা মারল মালগাড়িটি। সিগন্যালের গণ্ডগোল নাকি চালকের গাফিলতি, দুর্ঘটনার নেপথ্যে আসলে রয়েছে কোন সত্য?

ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনা নিয়ে একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। রেলকর্মীদের একাংশের মতে, দুর্ঘটনার কবলে পড়া মালগাড়িটির চালক সিগন্যাল মানেননি। সেই কারণেই কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের লাইনে চলে এসেছিল মালগাড়িটি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে তবে কি সিগন্যাল বিভ্রাটেই এত বড় দুর্যোগ?

কিন্তু রেলের একটি সূত্রের দাবি, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে রাঙাপানি এবং চটের হাট অংশের স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল অকেজো ছিল। যার ফলে ওই অংশে খুবই ধীর গতিতে ট্রেন চলাচল করছিল। বহু সময় ট্রেন থামিয়ে দেওয়াও হয় বলে খবর। সোমবার সকাল ৮টা ২৭ মিনিট নাগাদ শিয়ালদহগামী কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস রাঙাপানি স্টেশন ছেড়ে এগোনোর পরই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বন্ধ থাকায় খুব ধীর গতিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস চলছিল। ওই ট্রেনের জন্য ছিল বিশেষ কাগুজে ছাড়পত্র। রেলের পরিভাষায় যাকে ‘পেপার লাইন ক্লিয়ার টিকিট’(পিএলসিটি) বলে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এনডিআরএফ আসতে ১ ঘণ্টারও বেশি দেরি! ইদ ফেলে উদ্ধারে ছুটে এসেছিলেন স্থানীয়রাই

Kanchenjunga Express Tragedy: ছ' বছরের শিশু স্নেহা মণ্ডলের প্রাণ গিয়েছে এই দুর্ঘটনায়। তাঁর মাও ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে।

রেলের ওই সূত্রের দাবি, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসকে রাঙাপানি স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ‘টিএ ৯১২’ ফর্ম দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের ভিত্তিতেই কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস চালাচ্ছিলেন চালক। কী এই ‘টিএ ৯১২’? স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা খারাপ হয়ে গেলে ওই নির্দেশের ভিত্তিতেই ট্রেন চালিয়ে থাকেন চালক। সিগন্যাল লাল থাকলেও যার ফলে নিয়ন্ত্রিত গতিতে ট্রেন চালাতে পারবেন চালক। সকাল ৮টা ৪২ মিনিট নাগাদ রাঙাপানি স্টেশন থেকে ছাড়ে মালগাড়িটি। তার পরই কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের পিছনে সজোরে ধাক্কা মারে। খেলনাগাড়ির মতো মালগাড়ির উপর উঠে পড়ে এক্সপ্রেসের পিছনের দিকের একাধিক বগি। লাইনচ্যুত হয় মালগাড়িও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রিল তৈরিতেই ব্যস্ত! রেলের কবচের ব্যবস্থা কেন করতে পারলেন না রেলমন্ত্রী অশ্বিনী?

Kanchanjunga Express Accident Kavach: মানুষের প্রাণের মূল্য নেই অথচ স্টেশনগুলিকে প্রায় শপিংমল করে তোলার যুক্তি কোথায়?

প্রশ্ন উঠছে, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসকে যখন ম্যানুয়াল মেমো দেওয়া হল, তখন মালগাড়ি কী ভাবে এগিয়ে গেল? তাকেও কি ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল? রেলের একটি সূত্রের ব্যাখ্যা, ধরা যাক দু’টি ট্রেনের চালককেই ম্যানুয়াল মেমো দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, ওই ছাড়পত্র থাকলে চালক ট্রেন ধীরে ধীরে চালাবেন। ট্রেনের গতি কখনওই ঘণ্টা প্রতি ১০ কিলোমিটারের বেশি থাকবে না। তা হলে কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং মালগাড়ির মধ্যে ১৫ মিনিটের ব্যবধান থাকার পরেও কেন একই লাইনে কাছাকাছি চলে এল দু’টি ট্রেন? উঠেছে সেই প্রশ্নও।

শুধু কাগুজে সিগন্যালের ব্যাপারটিই নয়। উঠেছে আরও একাধিক প্রশ্ন। অনেকেই দুর্ঘটনার দায় ঠেলেছেন চালকের ঘাড়ে। কিন্তু সত্যিই কি দোষ দেওয়া যায় তাঁদের। সিগন্যালজনীত ত্রুটি, আনুষাঙ্গিক ভুল-ভ্রান্তির সঙ্গে যে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়টি বারবার উঠে আসছে, তা হল লোকো পাইলটদের শারীরিক ক্লান্তি। নিয়ম অনুযায়ী, ৮-১০ ঘণ্টা মালগাড়ির লোকো পাইলট পরিষেবা দিতে পারেন। অর্থাৎ একটানা গাড়ি চালাতে পারেন। কিন্তু রেল দফতরে কর্মীর অভাব। ফলে একজন লোকো পাইলটকে বাধ্য করা হচ্ছে ১৬-১৭ ঘণ্টা একটানা রেক চালাতে। শীতের সময়ে শারীরিক ক্লান্তি সামলানো তবু খানিকটা সম্ভব। কিন্তু এই গরমের দিনে তা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে তাদের পক্ষে। ফলে যা ঘটবার তা-ই ঘটছে। বহু সময়ই চোখ লেগে যাচ্ছে তাদের। শরীর খারাপ হওয়ার ফলে বহু সময়েই দায়িত্ব ঠিকমতো সামলাতে পারছেন না তাঁরা। আর তার ফলে যা হওয়ার তা-ই ঘটছে। তার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের, যাঁরা ভারতীয় রেলকে ভরসা করে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠেছেন।

এমন নয়, এ সবকিছু হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষের চোখের আড়ালে। এ বিষয়টি রেল মন্ত্রক এবং রেল বোর্ডের কাছে বারবার উত্থাপন করা হলেও, লোকো পাইলট নিয়োগের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ। ফলে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। রেলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, মালগাড়ির গতিবেগ ছিল ১০০-১১০ কিলোমিটার। ক্রসিং পেরিয়ে গিয়ে ধাক্কা মেরেছে মালগাড়িটি। তখনও গতিবেগ ১১০ কিলোমিটার ছিল বলেই জানা গিয়েছে। কিন্তু কীভাবে সিগন্যাল ফেল করলেন চালক? আর সেই প্রশ্নের উত্তরটা বুঝতে বোধহয় তেমন অসুবিধা হয় না। সোমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের ওই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০। আহত অন্তত ৪০। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন রেলের দুই কর্মীও। এই দুর্ঘটনার অভিশাপ আর কদ্দিন। একদিকে প্রধানমন্ত্রী যখন বন্দে ভারত থেকে শুরু করে বুলেট ট্রেনের উপর জোর দিয়ে চলেছেন, ততই খারাপ হচ্ছে সাধারণ ট্রেনের পরিকাঠামো। এই নিয়ে কবে নড়েচড়ে বসবেন কর্তৃপক্ষ? কবে ফিরবে যাত্রীসুরক্ষা? প্রশ্ন বোধহয় থেকেই যায়!

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।