ভারত এখন ‘জুমলা’বাজির দেশ

Freedom of Speech : আমেরিকায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সার্বভৌম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, আমাদের দেশে তাকে অবোধ্য ‘রিজনেবল রেসট্রিকশন’-এর শৃঙ্খল পরিয়ে রাখা হয়েছে গোড়া থেকেই। কী এই রেস্ট্রিকশন?

Suman Chattopadhyay
৩ মিনিট
ভারত এখন ‘জুমলা’বাজির দেশ

রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে মার্কিন মুলুকে একটি রসিকতা চালু আছে- দে ওনলি স্পিক হাফট্রুথস অ্যান্ড দ্য ইউজুয়াল লাইজ। সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরদের রাজনীতিতে কোনও স্থান হয় না, রাজনীতি এমনই ছলাকলা। উদাহরণ খুঁজলে একবার প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে তাকাতে পারেন। গড়ে দিনে অন্তত তিন-চারটি অর্ধসত্য অথবা ডাহা মিথ্যে কথা বলে তিনি দিব্যি হোয়াইট হাউসে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ বহাল তবিয়তে পূর্ণ করে গেলেন। ওয়াশিংটন পোস্টের দৈনিক ফ্যাক্ট-চেকারে সেই সব মিথ্যা প্রত্যহ ধরা পড়ত, মহামতি ট্রাম্প ভ্রূক্ষেপও করতেন না।

একই কথা আরও বেশি করে সত্য ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে। মিথ্যা বলে বলে তাঁর রাষ্ট্রযন্ত্র রুশি আমজনতার এমনই মগজ ধোলাই করেছে যে তাঁদের অধিকাংশ এমন মর্মান্তিক পরিণতি প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও এমন সর্বক্ষয়ী যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই তুলছেন না। সরলমতি রুশিরা সত্যিই বিশ্বাস করেন নিও-নাৎসিরাই কিয়েভে ক্ষমতাসীন। অতএব তাদের সবক শেখানোতে কোনও অন্যায় নেই। মার্কিন আর রুশি মুলুকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা হলো আমেরিকায় প্রেসিডেন্টকে ছাপা অক্ষরে মিথ্যাচারী, ব্যাভিচারী ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা যায় অনায়াসে, পুতিন-তালুকে বিপক্ষে টুঁ শব্দটি করলে তাকে সোজা কয়েদখানায় চালান করে দেওয়া হয়। আগে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেওয়া হতো, এখন সে সব আছে কিনা জানা নেই।

আমাদের দেশের দিকে চোখ ফিরিয়ে কেবল মরুতীর্থ হিংলাজের ওই মরমী গানের প্রথম দু'টি কলি স্মরণ করুন,

তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ, এ কী অভিশাপ, নাই প্রতিকার/ মিথ্যারই জয় আজ সত্যের নাই তাই অধিকার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আদানি অস্ত্রে কাবু হবেন মোদি? : সুমন চট্টোপাধ্যায়

Bofors scandal vs Adani Scam : পরাধীন দেশে কংগ্রেস দলটাই চলত তৎকালীন ভারতীয় শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীদের টাকায়। এখন আদানির দুর্নীতির কথা এনে নির্বাচনে আদৌ কিস্তিমাৎ করতে পারবেন রাহুল? বিশ্লেষণে সুমন চট্টোপাধ্যায়।

ভারতবর্ষ কালে কালে একদিন আমেরিকার মতো অবাধ, মুক্ত গণতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে, হওয়া সম্ভব, এমনতরো সুখস্বপ্ন দেখার অবকাশ অভাগা দেশবাসী কখনও পায়নি। তার প্রধান কারণ আমাদের স্বনামধন্য, প্রণম্য, দেশবরেণ্য সংবিধান প্রণেতারা তাঁদের দেশবাসী নিরঙ্কুশ বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য বলেই বিবেচনা করেননি। আমেরিকায় যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সার্বভৌম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, আমাদের দেশে তখন তাকে অবোধ্য ‘রিজনেবল রেসট্রিকশন’-এর শৃঙ্খল পরিয়ে রাখা হয়েছে গোড়া থেকেই। অনেকটা দু’পায়ের গোড়ালিতে দড়ি পরিয়ে দিয়ে কাউকে বলা,

এবার জোরে দৌড়াও।

মানে অধিকার কাগজে কলমে আছে, বাস্তবে নেই। দুনিয়াকে বলা হয় এই দ্যাখো, সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে আমরা কেমন নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছি। আর দেশবাসী অন্তরালে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভাবে,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
লেখক কম, প্রকাশকে গিজগিজ করছে বাংলার বইবাজার : সুমন চট্টোপাধ্যায়

Book Publication : বইয়ের বাজারে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর ছলা বই প্রকাশের বাজারে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। লেখে যতজন ছাপে তারও বেশি প্রকাশক? বইবাজারের 'লেখক' হওয়ার নয়া কিসসা লিখলেন সুমন চট্টোপাধ্যায়

এ ব্যথা কী যে ব্যথা

তা কি ‘আনজনের’ পক্ষে বোঝা সম্ভব?

‘রিজনেবল রেস্ট্রিকশন’। কোনটা রিজনেবল আর কোনটা নয় এটা কীভাবে স্থির হবে? কেন, রাষ্ট্র যেভাবে মনে করবে! রাষ্ট্র ঠিক মনে করছে না ভুল সেটার বিচার করবে কে? কেন, আদালত। ব্যস এখানে এসেই অনিশ্চয়তা আর অসহায়তার চোরাবালিতে ডুবতে থাকবেন আপনি। পকেটের জোর থাকলে, ভাগ্যদেবী সহায় হলে হয়তো একদিন আদালত বলে দিতেও পারে আপনি নিরপরাধ। তবে সেটাও নির্ভর করবে হাকিমের মেরুদণ্ডের উপর যা এখন লোপ পেতে পেতে বিপন্ন প্রজাতিতে পর্যবসিত হয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় আপনার কপালে তেমন একজন হাকিমই জুটল, গুমঘরের মস্ত কালো ফাটকের ইয়া বড় তালা খোলার দিন আসতে আসতে আপনি জীবনের সবচেয়ে মহার্ঘ পুঁজিটির অনেকখানি খরচ করে ফেলবেন। সময়। হয়তো কালো দাড়ি নিয়ে ঢুকেছিলেন, সান্টা ক্লজ হয়ে ফিরবেন, হয়তো প্রবেশের সময় আপনার দেহ ছিল নধরকান্তি, বের হলে দেখা গেল আপনাকে দেখে টিবি রোগী ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। জিন্দা হয়ে ঢুকে লাশ হয়ে বেরোনোটাও অসম্ভব নয়। অধুনা এমন ঘটনা আকছার হচ্ছে, আমি নিজেও সেই ভুক্তভোগীর দলে।

শস্যের ভালো ফলনের জন্য যেমন উর্বর জমি লাগে তেমনই মিথ্যার বেসাতিকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজন জীবন্ত গণতন্ত্র, সংবিধানকে গীতা অথবা কোরানের মতো আরাধ্য ভাবার মানসিকতা, নিরপেক্ষ, নির্ভীক বিবিধ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারার হিম্মতওয়ালা গণমাধ্যম এবং গণতন্ত্রকে মৃত্যুঞ্জয়ী মহামন্ত্র জ্ঞান করতে পারার মতো জাগ্রত সমাজ। ভারতবর্ষের সংবিধানে এসবের বন্দোবস্ত করা আছে কেবল দু’টি বিষয় ছাড়া। স্বাধীন গণমাধ্যম আর জাগ্রত সমাজ। দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে ভারতের দিকে তাকিয়ে মনে হতো এদেশে গণতন্ত্র শিকড় গাড়ার সম্ভাবনা অতীব উজ্জ্বল, কেননা যাঁদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ছিল, দুর্বিনীত ঔপনিবেশিক শাসনের রাহুমুক্তির পরে তাঁরা স্বাধীনতার মূল্য বুঝেছিলেন, তাঁদের আচরণে প্রত্যহ গণতান্ত্রিক অনুশীলনের প্রত্যয় প্রতিফলিত হতো। তাঁরা ভাবতে পারেননি কালে কালে দেশটা পিগমিদের হাতে চলে যাবে, সারিসারি বাঁদরের গলায় পরানো হবে মুক্তোর মালা, দেশটা পড়ে থাকবে অশিক্ষা, অপুষ্টি আর অবর্ণনীয় দারিদ্রের অন্ধকারে। ফলে মিথ্যাচারই হয়ে উঠেছে নিয়ম, আসমুদ্র হিমাচলে একটি ভূখণ্ডও অবশিষ্ট নেই যেখানে গণতন্ত্র তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ভারত এখন ‘জুমলা’বাজির দেশ।

বাচ্চা লোগ জোরসে হাততালি বাজাও।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।