দেবদেবী নয়, পুজো করা হয় ব্যাঙকে! রহস্য-মিথে ভরা ভারতের ২০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দির

Frog Temple of India : যেখানে দেবদেবী নন, প্রাধান্য পায় ব্যাঙ! বলা ভালো, ভারতের একমাত্র ব্যাঙের মন্দির!

Aritra Som
৩ মিনিট
দেবদেবী নয়, পুজো করা হয় ব্যাঙকে! রহস্য-মিথে ভরা ভারতের ২০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দির

হাজার হাজার বছর ধরে গঙ্গা দিয়ে কত জল বয়ে গিয়েছে। অনেক ঝড়, ধ্বংসলীলা, ভাঙন, দুঃখ দেখেছে পৃথিবী। তারপরও সভ্যতা নিজের গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর ভারত? সে তো বহমান অজস্র সভ্যতার এক মেলবন্ধন। হাজার হাজার বছর ধরে এই দেশের মাটি দেখেছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। গোটা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন স্থাপত্য, মন্দির, মসজিদ আরও কত পীঠস্থান। সেখানেই জড়িয়ে রয়েছে নানা মিথ, রহস্য। জড়িয়ে রয়েছে অদ্ভুত সব আচার। রয়েছে অদ্ভুত ইতিহাসও। সেরকমই এক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের লখিমপুরে। যেখানে দেবদেবী নন, প্রাধান্য পায় ব্যাঙ! বলা ভালো, ভারতের একমাত্র ব্যাঙের মন্দির!

উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে লখিমপুর খেরি জেলা। সেখানেই ওয়েল শহরের মধ্যে রয়েছে মাণ্ডুক মন্দির। স্থানীয় মানুষেরা এই নামেই পীঠস্থানটিকে ডাকেন। এই মন্দিরটিই হল আমাদের গন্তব্য, ভারতের ইতিহাসের একমাত্র ব্যাঙ মন্দির। হিন্দিতে ব্যাঙকে বলা হয় ‘মেন্ডক’,সেখান থেকেই সম্ভবত এসেছে এই ‘মাণ্ডুক’ শব্দটি। ১০০ ফুট উঁচু এই মন্দিরটির প্রধান আরাধ্য দেবতা আসলে শিব। ভেতরে সেই নর্মদেশ্বর শিবের লিঙ্গও রয়েছে। তবে পুরো স্থাপত্যটি ঘিরেই রয়েছে অদ্ভুত কিছু রহস্য। রয়েছে অদ্ভুত কিছু মিথ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'আত্মা' এখনও আসে ফিরে? পর্যটকদের কেন টানে ভৌতিক রহস্যে মোড়া সিকিমের বাবা মন্দির!

Baba Mandir Sikkim: সেনাবাহিনীর অনেকেই নাকি এখনও হরভজনের বিছানার চাদরে ভাঁজ দেখতে পান। তাঁদের বিশ্বাস, হরভজন এখনও আছেন।

প্রথম দর্শনে মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে খানিক ঘাবড়ে যেতে বাধ্য। গোটা স্থাপত্যটিরই অপূর্ব সব কারুকাজ, ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো দেওয়ালের রং বেশ খানিকটা ফিকে হয়েছে। কিন্তু মন্দিরে ঢোকার মুখেই অদ্ভুত দর্শন একটি মূর্তি আপনাকে স্বাগত জানাবে। দুটো হাত বাড়িয়ে রাখা, মুখ এগিয়ে কিছু একটা যেন বসে আছে। দৈত্য নাকি! না, দানব বা রাক্ষস নয়। এটি সেই বিশাল ব্যাঙের মূর্তি। আর এই ব্যাঙটিই গোটা মন্দিরের প্রাণভোমরা। এমনভাবে এই মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছে, যেন দেখে মনে হয়, ব্যাঙটিই গোটা মন্দিরটির ভার নিজের পিঠে বহন করছে। আর ব্যাঙের পিঠের ওপরই মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ।

ঐতিহাসিকদের মতে, লখিমপুরের এই অঞ্চলে একসময় চাহমান বংশের শাসকরা রাজত্ব করতেন। ১৯ শতক পর্যন্তও তাদের দহরম মহরম ছিল। সেই বংশেরই এক রাজা ভখত সিং এই মন্দির তৈরি করেছিলেন। তার পেছনে রয়েছে একটি কাহিনিও। শোনা যায়, রাজার জীবনে সৌভাগ্যের জন্য ব্যাঙের অবদান ছিল। ব্যাঙের পুজোও নাকি করতেন তিনি। আর সেই পুজোর ফলেই নাকি প্রচুর ধনসম্পত্তি লাভ করেন, সন্তানের শরীরও ঠিক হয়ে যায়। তারপরই এই ব্যাঙের মন্দির তৈরি করেন ভখত সিং।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শ্মশান থেকে মৃতদেহ তুলে আনা হতো পুজোয়, চমকে দেয় উত্তর কলকাতার কালী মন্দিরের ইতিহাস

History of Thanthania Kalibari : ট্রাম রাস্তার ওপরেই মন্দির। চারিদিকে ঘিঞ্জি বসতি। ব্যস্ত বাস রাস্তা। সামনেই স্কুল কলেজের ভিড়। মন্দিরের ওপর ফলক করে লেখা রয়েছে ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির নাম।

তবে মন্দিরের আরও একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। সমসাময়িক অন্যান্য হিন্দু মন্দিরের গঠনরীতির তুলনায় এই মন্দিরের স্থাপত্য একটু আলাদা। তার ওপর মন্দিরের সামনে বিশাল ব্যাঙের মূর্তিটিও একটি আলাদা রূপ দিয়েছে। এমন কেন? গবেষকদের মতে, মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতাতেই। সেই সময়ের এক নামী তান্ত্রিক এই মাণ্ডুক মন্দিরের নকশা তৈরি করেছিলেন। তাই গোটা স্থাপত্যরীতির মূল ভিত্তি হল তন্ত্রশাস্ত্র। এমনকী মূল গর্ভগৃহের ভেতরের দেওয়ালে তন্ত্রের অনেক দেবদেবীর ছবিও পাওয়া যায়। অনেক মূর্তি খোদাইও করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে নন্দীর মূর্তিও। শিব আর তন্ত্র এখানে মিলেমিশে গিয়েছে।

এত পুরনো আর ব্যতিক্রমী একটি মন্দির, নিশ্চয়ই কোনও মিথ জড়িয়ে রয়েছে এর সঙ্গে! স্থানীয় লোককথা বলে, এই মন্দির যতই তন্ত্র আর শিবের জন্য হোক না কেন, আসল আকর্ষণ হল ব্যাঙ। তার জন্যই এলাকার শ্রীবৃদ্ধি, মন্দিরও বহাল তবিয়তে রয়েছে। এছাড়াও শোনা যায়, ব্যাঙের ‘অলৌকিক’ ক্ষমতায় নাকি এখানকার শিবলিঙ্গ রংও বদলায়! একবার নয়, তিন তিনবার রং বদল হয়!

এরকমই মিথ আর ইতিহাসের মোড়কে মোড়া লখিমপুরের মাণ্ডুক মন্দির। শিবরাত্রি, দীপাবলিতে ভিড় উপচে পড়ে আজও। সেইসঙ্গে থাকে ব্যাঙের পুজোও। একমাত্র এই মন্দিরেই নিষ্ঠাভরে ব্যাঙকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করা হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ব্যাঙ হল সৌভাগ্য, উর্বরতা, সমৃদ্ধির প্রতীক। যে এই মন্দিরে পুজো দেবে, তার ধনসম্পদ বাড়বে, সন্তানলাভ হবে, পরিবারে সৌভাগ্য নেমে আসবে। তাই আজও এই বিশ্বাসে ভর করে প্রচুর মানুষ এই ঐতিহ্যশালী মন্দিরে আসেন।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।